বকরিদ ২০২৬: নান্দেড়ের মুসলিম সমাজের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, গবাদি পশু কোরবানি নিষিদ্ধ

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 5 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
ভক্তি চালক

বকরিদ (ঈদ-উল-আযহা) সামনে রেখে মহারাষ্ট্রের নান্দেড় জেলার মুসলিম সমাজ এক নজিরবিহীন ও তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। শান্তি, সম্প্রীতি এবং আইনের প্রতি পূর্ণ সম্মান বজায় রেখে এ বছর কোনও গবাদি পশু, বিশেষত গরু বা ষাঁড়, কোরবানি না দেওয়ার ব্যাপারে সমাজের সব স্তরের প্রতিনিধিরা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। মহারাষ্ট্রে প্রচলিত গবাদি পশু জবাই নিষিদ্ধ আইন মেনেই উৎসব পালনের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
 
নান্দেড়ের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ

মহারাষ্ট্রে গবাদি পশু জবাই নিষিদ্ধ করার কঠোর আইন কার্যকর রয়েছে। প্রায়ই বকরিদের সময় মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে গবাদি পশু জবাইয়ের অভিযোগ ওঠে। এই ধরনের ঘটনা শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, সামাজিক পরিবেশও দূষিত করে। উৎসবের সময় সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক মুসলিম সমাজের ধর্মীয় উদযাপনকে কলঙ্কিত করে এবং সমাজের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই এ বার নান্দেড়ের মুসলিম সমাজ সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে।
 
 
সমাজ দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, কোনও অবৈধ পশু জবাই করা হবে না এবং সম্পূর্ণভাবে আইন মেনে চলা হবে। শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েই থেমে না থেকে বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা প্রচারও চালানো হচ্ছে, যাতে এই বার্তা সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
 
ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক সংগঠনগুলির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত
 
এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় নান্দেড়ের ওয়াজিরাবাদ মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি আয়ুব কাসমি বলেন, “আমরা শুধুমাত্র মহারাষ্ট্র সরকারের আইনে অনুমোদিত পশুই কোরবানি করব। গরু বা ষাঁড়ের মতো কোনও গবাদি পশু আমরা কোরবানি করব না। নান্দেড়বাসী হিসেবে আমরা সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
 
তিনি আরও বলেন, “ধর্মীয় উৎসবগুলি যাতে শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়, সেই উদ্দেশ্যে গত কয়েকদিন ধরে সমাজের বুদ্ধিজীবী, আলেম-ওলামা এবং আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনার পরই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সমাজের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছি। কুরেশি সমাজও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা কোনও গবাদি পশু কোরবানি করবে না।”
 
এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে নান্দেড়ের সমাজকর্মী ও ধর্মীয় নেতারা স্পষ্ট করে বলেন, “মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে কোনও গবাদি পশু কোরবানি করা হবে না। আমাদের ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক প্রতিনিধি, আইন বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী এবং সমস্ত সংগঠন একযোগে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
 
উল্লেখযোগ্যভাবে, কোরবানির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কুরেশি সমাজ এবং তাদের বিভিন্ন সংগঠনও এই সিদ্ধান্তে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। তারা সম্মত হয়েছে যে কোনও গবাদি পশু জবাই করার জন্য তারা উপস্থিত হবে না। এই উদ্দেশ্যে শহর ও জেলার বিভিন্ন জায়গায় একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সব সংগঠনের প্রতিনিধিরা সেই বৈঠকে অংশ নিয়ে নিজেদের সম্মতি জানান।
 
কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ?
 
নান্দেড়বাসীদের এই সিদ্ধান্ত বহু দিক থেকে যুগান্তকারী প্রমাণিত হতে পারে:
 
* সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: উৎসবের সময় আইন মেনে চললে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা কমবে। এর ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হবে।
 
* আইনের প্রতি সম্মান: গবাদি পশু জবাই নিষিদ্ধকরণ আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। মুসলিম সমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।
 
* গুজব রোধ: বকরিদের সময় পশু পরিবহণ বা কোরবানি নিয়ে নানা গুজব ছড়ানো হয়। সমাজের এই স্পষ্ট সিদ্ধান্ত গুজব ছড়ানোকারীদের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবেই উপযুক্ত জবাব হয়ে উঠবে।
 
* ভাবমূর্তি উন্নয়ন: অবৈধ কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকলে উৎসবের পবিত্রতা বজায় থাকবে এবং সমাজের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও ইতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হবে।
 
* প্রশাসনের উপর চাপ কমবে: এই ধরনের স্বপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত পুলিশ ও প্রশাসনের নিরাপত্তা ও মোতায়েনের চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
 
সচেতনতা ও বাস্তবায়ন
 
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য নান্দেড়ের মসজিদ ও মহল্লাভিত্তিক বৈঠক থেকে আবেদন জানানো হচ্ছে। তরুণ স্বেচ্ছাসেবকেরা ব্যক্তিগতভাবে নজর রাখছেন যাতে কোনও অবৈধ জবাই না হয়। যুবসমাজের মধ্যে একটাই বার্তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, “আমরা আনন্দের সঙ্গে আমাদের উৎসব পালন করব, তবে আইন ভঙ্গ না হয়, সেই দায়িত্বও আমরা সম্পূর্ণভাবে নেব।”
 
সব মিলিয়ে, নান্দেড়ের মুসলিম সমাজের এই সিদ্ধান্ত মহারাষ্ট্রের জন্য এক নতুন আদর্শ হয়ে উঠতে চলেছে। এই পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে, ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করেও আইনের সীমারেখা বজায় রাখা সম্ভব।
 
ঈদ-উল-আযহা কী?
 
রমজান ঈদের দুই মাস দশ দিন পর, অর্থাৎ জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে ঈদ-উল-আযহা বা বকরিদ উদযাপিত হয়। এই উৎসবের তাৎপর্য তিনটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের মনে ত্যাগের মূল্যবোধ গড়ে তোলা, বছরে অন্তত একবার সবাইকে একত্রিত করে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করা এবং সমাজের বঞ্চিত ও অসহায় মানুষদের আনন্দে সামিল করা।
 
হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগ ও ঈমানের স্মৃতিতে বকরিদ উদযাপিত হয়। এই দিনে আইনসম্মতভাবে অনুমোদিত পশু কোরবানি করার রীতি প্রচলিত রয়েছে।