বুদ্ধ পূর্ণিমা: আত্মজ্ঞান, সহনশীলতা ও মানবতার উৎসব
স্বপ্না দাস
“ধর্মের সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা, আমাদের কারণে যেন কোনো প্রাণীর কোনো ধরনের কষ্ট না হয়, এইটিই প্রকৃত ধর্ম।” এই গভীর উপলব্ধিই মানবজাতিকে উপহার দিয়েছিলেন গৌতম বুদ্ধ। তাঁর প্রদত্ত ‘পঞ্চশীল’-এর প্রথম নীতিতেই এই মানবিক চেতনার প্রতিফলন দেখা যায়। পালি ভাষায় উক্ত “পাণাতিপাতা বিরমণী সিক্খাপদং সমাদিয়ামি”, এর মাধ্যমে সকল জীবের প্রতি অহিংসা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। শান্তি, করুণা ও প্রজ্ঞার এই মর্মবাণী যুগে যুগে মানুষকে সত্য ও সৎপথে চলার প্রেরণা জুগিয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা মানুষকে আত্মিক উন্নতি, মানসিক প্রশান্তি এবং নৈতিক জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করে।
প্রাচীন ভারতের অন্যতম প্রধান ধর্ম হিসেবে বৌদ্ধ ধর্মকে অনেকেই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে মনে করেন। ভারত ছাড়াও ভুটান, চীন, কোরিয়া, জাপান, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশে এই ধর্ম ব্যাপকভাবে প্রচলিত। প্রায় ২৬০০ বছর আগে বুদ্ধদেব তাঁর গভীর দার্শনিক চিন্তা ও উপলব্ধির মাধ্যমে জীবন ও জগতের অর্থ ব্যাখ্যা করেছিলেন, যা ধীরে ধীরে এক ধর্মীয় দর্শনে পরিণত হয়। তাঁর এই বাণীতে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু মানুষ বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন।
বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপনের একটি দৃশ্য (ফাইল)
বর্তমানে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিপুল সংখ্যক মানুষ এই ধর্মের অনুসারী। বৌদ্ধ ধর্মের মূল গ্রন্থ ‘ত্রিপিটক’-এ এই শিক্ষাগুলি সংকলিত রয়েছে। পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের নৈতিক ও সুস্থ জীবনযাপনের জন্য বুদ্ধদেব ‘পঞ্চশীল’ নামে পাঁচটি মূল নীতি প্রচার করেন। এই নীতিগুলি হলো, প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকা, চুরি না করা, অসৎ যৌন আচরণ পরিহার করা, মিথ্যা কথা না বলা এবং মাদক দ্রব্য থেকে দূরে থাকা। এই নীতিগুলি মানবজীবনের শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বজায় রাখার মূল ভিত্তি।
বৌদ্ধ ধর্ম কেবল পঞ্চশীলেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আরও চারটি মৌলিক সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই চারটি সত্য, দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখের নিরোধ এবং দুঃখ নিরোধের পথ, মানবজীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। বুদ্ধদেব বলেছেন, লোভ ও অজ্ঞানতাই মানুষের দুঃখের মূল কারণ। তবে তিনি এও বলেছেন যে এই দুঃখ থেকে মুক্তি সম্ভব। সেই মুক্তির পথ হিসেবে তিনি ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ বা ‘অষ্টপথ’-এর কথা উল্লেখ করেছেন। এই পথের মধ্যে রয়েছে, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, সঠিক সংকল্প, সঠিক বাক্য, সঠিক কর্ম, সঠিক জীবিকা, সঠিক প্রচেষ্টা, সঠিক মনোযোগ এবং সঠিক ধ্যান। এই আটটি উপাদান মানুষের জীবনকে শুদ্ধ ও শান্তির পথে পরিচালিত করে।
বৌদ্ধ ধর্মে ধ্যান ও আত্মজ্ঞান অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধ্যান মানুষের মনকে শান্ত করে এবং আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে মানুষ নিজের অস্তিত্ব ও জীবনের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পারে। পাশাপাশি, করুণা ও ভালোবাসা বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম ভিত্তি। বুদ্ধদেব তাঁর অনুসারীদের সকল জীবের প্রতি মমতা ও সহানুভূতি প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছিলেন। এই মানবিক অনুভূতি সমাজে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তুলতে সাহায্য করে। বৌদ্ধ ধর্মের মূল বার্তাই হলো, হিংসা ও ক্রোধ থেকে দূরে থেকে শান্তি ও সহমর্মিতার পথে চলা। বুদ্ধদেব নিজেই ছিলেন শান্তির দূত, যিনি তাঁর জীবন ও শিক্ষার মাধ্যমে বিশ্বে মানবতার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন।
বিশ্বে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এই মহাপুরুষের জন্ম বর্তমান নেপালের লুম্বিনিতে, বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে। একই দিনে তিনি বোধিলাভ করেন এবং উত্তর প্রদেশের কুশীনগরে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই একই তিথিতে সংঘটিত হওয়ায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্র। তাই বৈশাখ পূর্ণিমা ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’ বা ‘বুদ্ধ জয়ন্তী’ নামে পালিত হয়। এই দিনে ভিক্ষু ও সাধারণ মানুষ বুদ্ধদেবের বাণী স্মরণ করে, ধ্যান ও চিন্তনের মাধ্যমে অন্তরের শান্তি ও করুণার চর্চা করেন এবং সেই আদর্শ সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
পৃথিবীতে নানা ধর্মের মানুষ বাস করে, এবং প্রত্যেকের উপাসনার পদ্ধতি আলাদা হলেও সব ধর্মের মূল উদ্দেশ্য এক, শান্তি, সহনশীলতা ও মানবতা প্রতিষ্ঠা। কোনো ধর্মই অন্য ধর্মকে অবজ্ঞা করতে শেখায় না। তবুও সমাজে মাঝে মাঝে হিংসা ও বিভেদের সৃষ্টি হয়, যা মানুষের অজ্ঞতা ও সংকীর্ণতার ফল। প্রকৃত ধর্ম হলো এমন জীবনযাপন, যেখানে নিজের সুখের জন্য অন্যের কষ্টের কারণ হওয়া যায় না। জ্ঞান অর্জনের কোনো বাধা নেই, বরং তা মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই শুধু ধর্মীয় আচার পালন নয়, তার অন্তর্নিহিত শিক্ষাকে জীবনে প্রয়োগ করাই আসল। বুদ্ধদেবের সেই বাণী আজও সমান প্রাসঙ্গিক, “যতই পবিত্র কথা পড়ো বা বলো, যদি তা জীবনে প্রয়োগ না করো, তবে তার কোনো মূল্য নেই।”
তাঁর আরেকটি বিখ্যাত মন্ত্র-“বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধর্মং শরণং গচ্ছামি, সংঘং শরণং গচ্ছামি”, মানবতা, ঐক্য ও জ্ঞানের পথে চলার আহ্বান জানায়। এই আদর্শেই গড়ে উঠতে পারে এক শান্তিপূর্ণ, সহমর্মিতাপূর্ণ সমাজ।