সাকিব সেলিম
ষাটের দশক ছিল ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই সময়ে ভারত শুধুমাত্র রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়নি, বরং সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে নিজের আত্মপরিচয়ের খোঁজও চালাচ্ছিল। এই দশকে ভারত পণ্ডিত নেহরুর মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতাকে হারিয়েছে, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্মুখীন হয়েছে, গোয়া মুক্ত হয়েছে, সিকিম ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে এবং ইন্দিরা গান্ধীর মতো নেত্রীর উত্থান ঘটেছে। কিন্তু এইসব ঘটনার পাশাপাশি একটি অন্য বিপ্লবও চলছিল সেটি ছিল যুব আদর্শের বিপ্লব।
এই সময় কিছু ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব আত্মপ্রকাশ করেন, যাঁরা দেশের যুব সমাজকে পথ দেখিয়েছেন ও অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁরা ভারতের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় চেতনায় এক অমলিন ছাপ ফেলে গেছেন। এই বীরদের শুধু তাঁদের সাফল্যের জন্য নয়,তাঁদের চিন্তাভাবনা, সাহস, সংগ্রাম ও মূল্যবোধের জন্যও স্মরণ করা হয়। ষাটের দশকে ভারতের তরুণ প্রজন্মের আদর্শ হয়ে ওঠা এমনই পাঁচজন যুব-আইকন সম্পর্কে আজ আমরা জানব।
হাবিলদার আব্দুল হামিদ
হাবিলদার আব্দুল হামিদঃ সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক
একজন জাতীয় নায়ককে তাঁর পদবির কারণে নয়, বরং তাঁর কর্ম ও সাহসিকতার কারণে চেনা যায়। এই কথাটি হাবিলদার আব্দুল হামিদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে প্রযোজ্য। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়, যখন পাকিস্তান তাদের ‘অজেয় পেটন’ ট্যাঙ্ক নিয়ে ভারতের উপর আক্রমণ করে, তখন আব্দুল হামিদ RCL গান ও একটি জিপ-এর সাহায্যে শত্রুর মোকাবেলায় বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
আখ ক্ষেতের আড়ালে লুকিয়ে, তিনি ৮ই সেপ্টেম্বর প্রথম একটি পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করেন। সেই দিনই তিনি মোট তিনটি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করেন এবং আরও দুটি ট্যাঙ্ক দখলে নেন। এটি ছিল একজন সৈনিকের চালাক কৌশল, গভীর উপলব্ধি ও অতুল সাহসিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
পরদিন, অর্থাৎ ১০ই সেপ্টেম্বর, তিনি শহিদ হন। কিন্তু তার আগেই তিনি ৯টিরও বেশি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করে যুদ্ধের গতিপথ ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর বীরত্ব শুধুমাত্র যুদ্ধে ভারতকে সুবিধা এনে দেয়নি, পাকিস্তান যেটা দাবি করত ভারত মুসলিম নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করে, এই প্রোপাগান্ডাকেও একেবারে ভুল প্রমাণ করে দেয়।
একজন সত্যিকার ভারতীয় মুসলমান হিসেবে, আব্দুল হামিদ শুধু দেশকে রক্ষা করেননি, ভারতীয় সেনাবাহিনীর বৈচিত্র্য, ঐক্য ও নিষ্ঠা কত গভীর তাও বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর এই অসামান্য আত্মত্যাগের জন্য তাঁকে মরণোত্তর পরম বীর চক্র সম্মানে ভূষিত করা হয়।
মনসুর আলি খান পতৌদি
মনসুর আলি খান পতৌদিঃ ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাসের বিপ্লব
১৯৬০ সালের শুরুর দিকে, ক্রিকেটকে এক অভিজাত খেলা হিসেবে দেখা হতো, এবং ভারতীয় দল প্রায়ই এই খেলায় পরাজিত হতো। কিন্তু ১৯৬১ সালে, এক তরুণ খেলোয়াড়, মনসুর আলি খান পতৌদি মাঠে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই এই ধারাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিলেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে, তিনি ভারতীয় টেস্ট দলের সবচেয়ে কনিষ্ঠ অধিনায়ক হন। কিন্তু এর কিছুদিন আগেই, এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় তিনি তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। তবুও তিনি ক্রিকেট খেলা ছাড়েননি।
পতৌদির অধিনায়কত্বের মাধ্যমে ভারতীয় ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাস ও আক্রমণাত্মক মানসিকতার ভিত রচিত হয়।তাঁর নেতৃত্বেই ভারতীয় দলবিদেশের মাটিতে প্রথমবার টেস্ট জয়ের স্বাদ পায়। তাঁর ব্যাটিং ছিল দৃঢ় ও আগ্রাসী, আর ফিল্ডিংয়ে তিনি ছিলেন দুর্দান্ত।
তিনি ভারতীয় ক্রিকেটকে আত্মসম্মান ও বিজয়ীর মানসিকতা দিয়েছিলেন, যা ভবিষ্যতে কপিল দেব, সৌরভ গাঙ্গুলী, মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো অধিনায়কদের অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি শুধুই একজন ক্রিকেটার ছিলেন না, তিনি ছিলেন যুব ভারতের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
অভিনেতা মনোজ কুমার
মনোজ কুমার: দেশপ্রেমের ছবির এক প্রতীক অভিনেতা
যখন ভারত নিজের অস্তিত্ব ও পরিচয়ের সংকটের মুখোমুখি ছিল, ঠিক সেই সময়েই বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন এক নতুন নায়ক মনোজ কুমার। ১৯৬৫ সালে ভগত সিং-এর চরিত্রে তাঁর অভিনীত ছবি 'শহীদ' দেশপ্রেমের এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে। ভগত সিং-এর সহযোদ্ধা বটুকেশ্বর দত্ত রচিত এই ছবির বিশ্বাসযোগ্যতা ও আবেগময়তা প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করে যায়।
এরপর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী তাঁকে ‘জয় জওয়ান, জয় কিষান’ স্লোগানের উপর ভিত্তি করে একটি ছবি নির্মাণের অনুরোধ জানান। এই আহ্বানের ফলস্বরূপ ১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় 'উপকার', যেখানে ‘মেরে দেশ কি ধরতি’ গানটি ভারতের প্রতিটি হৃদয়ে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে তোলে।
এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মনোজ কুমার ‘ভারত কুমার’ উপাধি লাভ করেন এবং তখনকার যুবসমাজের আদর্শ হয়ে ওঠেন। তিনি কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন না, তাঁর ছবি ছিল একটি আন্দোলন, তাঁর সংলাপ ছিল স্লোগান নয়, চেতনা। তিনি কলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের বীজ বপন করেছিলেন।
রীতা ফারিয়া
রীতা ফারিয়া: আধুনিকতা ও পরম্পরার এক অনন্য সংমিশ্রণ
১৯৬৬ সালে, যখন ভারত পশ্চিমী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের টানাপোড়েনে আটকে ছিল, ঠিক সেই সময়ে ২৩ বছর বয়সী চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রী রীতা ফারিয়া মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব জিতে দেশকে গৌরবান্বিত করেন। এই সম্মান অর্জনকারী তিনি ছিলেন প্রথম এশীয় তরুণী। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সৌন্দর্য শুধুমাত্র চেহারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা জ্ঞান, চিন্তাশক্তি ও ব্যক্তিত্বেও প্রতিফলিত হয়।
এই প্রতিযোগিতায় রীতা ফারিয়া শাড়ি পরেই ‘বেস্ট ইন সুইমসুট’ ও ‘বেস্ট ইন ইভিনিংওয়্যার’-এর মতো শিরোপা জয় করেন। যার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন ভারতীয় পোশাকেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্ব মঞ্চে উপস্থিত হওয়া যায়।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল । তিনি মডেলিং কিংবা চলচ্চিত্রের জগতে আকৃষ্ট হননি। বরং তিনি নিজের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন চিকিৎসা শিক্ষার পাঠ সম্পূর্ণ করে, তিনি পরবর্তীতে নিজেকে মানবসেবায় উৎসর্গ করেন। সেই সময়ের তরুণ প্রজন্মের জন্য রীতা ফারিয়া ছিলেন এক উজ্জ্বল বার্তা "আপনি সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিমতীও হতে পারেন।"
আমিন সায়ানি
আমিন সায়ানি: ভারতকে সংযুক্ত করা এক কিংবদন্তি কণ্ঠস্বর
“বেহনো অওর ভাইয়ো!” এই একটি বাক্য শুনলেই প্রতিটি ভারতীয়ের কানে বাজে আমিন সায়ানির কণ্ঠস্বর। রেডিও জগতে তাঁর অবদান অতুলনীয়। ১৯৬০ সালে যখন টেলিভিশন ছিল শুধুই কল্পনা, আর সোশ্যাল মিডিয়া ছিল বহু দূরের স্বপ্ন, সেই সময়ে প্রতি বুধবার রাতে রেডিও সিলোনে তাঁর কণ্ঠে “বিনাকা গীতমালা” বাজত ভারতের ঘরে ঘরে।
তাঁর কণ্ঠে ছিল এক আশ্চর্য আপনভোলা স্পর্শ, যা সমগ্র ভারতকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছিল। তাঁর উচ্চারণভঙ্গি ও উপস্থাপনার ধরণ তাঁকে ভারতের প্রথম‘ভয়েস আইকন’-এ পরিণত করেছিল। ছোট শহর থেকে মেট্রো শহর পর্যন্ত, তাঁকে অনুকরণকারী অসংখ্য ঘোষক দেখা গিয়েছিল। আমিন সায়ানি শুধু একজন রেডিও ঘোষক ছিলেন না, তিনি গড়ে তুলেছিলেন ভারতের জনপ্রিয় সংস্কৃতির ভাষা। তিনি এমন এক যুগের কণ্ঠস্বর ছিলেন, যেখানে ‘কণ্ঠই ছিল মাধ্যম।’
১৯৬০-এর দশক কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা কিছু ঘটনার নাম নয়। সেই সময়ে ভারত আত্মপরিচয়, আত্মসম্মান ও আত্মনির্ভরতার পথে অগ্রসর হচ্ছিল। হাবিলদার আবদুল হামিদ সাহসের নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, মনসুর আলি খান পাতৌদি আত্মবিশ্বাস শিখিয়েছিলেন, মনোজ কুমার দেশপ্রেমের এক নতুন রূপ দেখিয়েছিলেন, রীতা ফারিয়া আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করেছিলেন, আর আমিন সায়ানি ভারতীয় কণ্ঠস্বরের সংজ্ঞা গড়ে তুলেছিলেন।
এই পাঁচজন তরুণ আইকন শুধুমাত্র ষাটের দশকে ভারতের যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন তা নয় তাঁরা শিখিয়েছিলেন, যদি দেশের প্রতি ভালোবাসা, আত্মবিশ্বাস ও সমর্পণ থাকে, তাহলে সীমিত সম্পদ দিয়েও সীমাহীন উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব। এটাই সেই ভাবনা যা আজও ভারতের যুবসমাজকে পথ দেখায়, অনুপ্রেরণা জোগায়।