নতুন দিল্লি
স্বাধীনতার পর বহু মুসলিম ব্যক্তি ভারতের বিচারব্যবস্থা ও আইনজীবী পেশায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। ভারতের শীর্ষ ১০ জন আইনি ব্যক্তির তালিকা নিচে দেওয়া হলো, যাঁরা দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং যাঁদের কার্যকালে সাধারণ মানুষ ন্যায় লাভ করেছে।
এম. সি. ছাগলা
মোহাম্মদ আলি কুরিম ছাগলা স্বাধীনতার পর বম্বে হাই কোর্টের (বর্তমানে মুম্বাই হাই কোর্ট) প্রথম ভারতীয় মুখ্য বিচারপতি ছিলেন। আধুনিক ভারতের আইনগত ও রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা গঠনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯০০ সালে বোম্বেতে জন্মগ্রহণকারী ছাগলা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করেন এবং প্রখ্যাত লিংকন ইন থেকে বার-এ-লঈন ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর আইনজীবী পেশার পাশাপাশি তিনি স্পষ্টবাদিতা, সততা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্যও পরিচিত ছিলেন।
আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির সঙ্গে বিচারপতি এম সি ছাগলা
তাঁর বিচারে প্রায়ই নাগরিক স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক নৈতিকতার প্রতি গভীর চিন্তা প্রতিফলিত হতো। ছাগলা যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত, ব্রিটেনে হাইকমিশনার এবং পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি গণতন্ত্র এবং স্বচ্ছতার প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনী "Roses in December" (ডিসেম্বরের গোলাপ)–এ তাঁর জীবন এবং মূল্যবোধ সম্পর্কে সৎ আত্মবিশ্লেষণ প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁকে একজন সম্মানীয় রাষ্ট্রনেতা হিসেবে স্মরণ করা হয়, যিনি বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিক সাহসের সমন্বয়ে ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীকভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন। সমাজের বিভিন্ন মতের মানুষের কাছ থেকেও তিনি শ্রদ্ধা ও প্রশংসা লাভ করেছিলেন।
এ. এম. আহমদী
মুখ্য বিচারপতি আজিজ মুসাব্বার আহমদী ছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রদ্ধেয় আইনজ্ঞ। তিনি গুজরাটের সুরাটে একটি দাউদী বোহরা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন নিম্ন আদালতের একজন বিচারক। ১৯৫৪ সালে তিনি আহমেদাবাদের আদালতে আইনজীবী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালের মার্চ মাসে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি সিভিল জজ হিসেবে নিযুক্ত হন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, সেই সময় তিনি ছিলেন এই পর্যায়ের একমাত্র মুসলিম বিচারক।
নাতনির সঙ্গে বিচারপতি এ. এম. আহমদী
তাঁর নিযুক্তির সময় তিনি কিছু প্রতিবাদের সম্মুখীন হন। পরবর্তীতে, ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ে (সুপ্রীম কোর্ট) বিচারপতি হিসেবে উন্নীত করা হয় এবং ১৯৯৪ সালের ২৫শে অক্টোবর তাঁকে ভারতের মুখ্য বিচারপতি হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ২৩২টিরও বেশি রায় প্রদান করেছিলেন এবং তাঁর সমগ্র বিচারকার্যকালে ৮০০-রও বেশি বেঞ্চের অংশ ছিলেন। তাঁর ঐতিহাসিক রায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এস. আর. বোম্মাই বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (১৯৯৪)। তিনি সেই ৯ সদস্যবিশিষ্ট সাংবিধানিক বেঞ্চের অংশ ছিলেন, যেটি ওবিসি (অনগ্রসর শ্রেণি) সংরক্ষণকে সমর্থন করেছিল, ৫০% সীমারেখা নির্ধারণ করেছিল এবং ‘ক্রিমি লেয়ার’ বাদ দেওয়ার সংজ্ঞা দিয়েছিল।
এম. ফাতিমা বীভি
বিচারপতি ফাতিমা বীভীকে ভারতের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৮৯ সালের ৬ই অক্টোবর তাঁর নিযুক্তি হয়েছিল, এবং তিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম মহিলা বিচারপতি ও এশিয়ার প্রথম মহিলা বিচারপতি হিসেবে পরিগণিত হন। তিনি কেরালার পাথানামথিট্টার বাসিন্দা ছিলেন। ১৯৫০ সালে তিনি বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকার করে সোনার পদক লাভ করেন, যা একজন মহিলার জন্য প্রথমবার ঘটেছিল, এবং তারপর তিনি কোল্লামে একজন আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
বিচারপতি এম. ফাতিমা বীভী
তিনি ১৯৫৮ সালে কেরালার বিচারব্যবস্থায় মুন্সিফ (প্রারম্ভিক পর্যায়ের বিচারক) হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে উচ্চ পর্যায়ের বিচারপদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৮৩ সালে তিনি কেরালা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং এর মাধ্যমে তিনি ভারতের বিচারব্যবস্থার প্রথম মুসলিম মহিলা বিচারপতি হিসেবে পরিচিত হন। তিনি বলেছিলেন যে তাঁর এই নিযুক্তি "বিচারব্যবস্থায় মহিলাদের জন্য এক বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছে"। পরবর্তীকালে তিনি তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এম. এইচ. বেগ
বিচারপতি মির্জা হামিদুল্লাহ বেগ ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের ১৫তম মুখ্য বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তাঁর প্রাজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গি ও সংবিধান সংক্রান্ত আইনের গভীর জ্ঞানের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। বিচারপতি বেগ ভারতের বিচার ইতিহাসের এক টালমাটাল সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। মুখ্য বিচারপতি হওয়ার আগে তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি এবং পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
বিচারপতি মীরজা হামিদুল্লাহ বেগ
তাঁর পেশাগত জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এডিএম জবলপুর মামলায় (১৯৭৬) তাঁর সম্পৃক্ততা, যেখানে তিনি জরুরি অবস্থার সময় মৌলিক অধিকারের স্থগিতকরণকে বিতর্কিতভাবে সমর্থন করেছিলেন। অবসরের পর তিনি ভারতের সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মহম্মদ হিদায়তুল্লাহ
মহম্মদ হিদায়তুল্লাহ ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১তম মুখ্য বিচারপতি ছিলেন। তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং সংবিধানিক আইনের গভীর জ্ঞানের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। তিনি ভারতের বিচারব্যবস্থা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯০৫ সালে লক্ষ্ণৌতে জন্মগ্রহণকারী হিদায়তুল্লাহর এক বিশিষ্ট শিক্ষাগত পটভূমি ছিল এবং সুপ্রিম কোর্টে যোগদানের আগেই তিনি একজন খ্যাতনামা আইনজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
বিচারপতি মহম্মদ হিদায়তুল্লাহ
তাঁর বিচারিক অবদানের পাশাপাশি তিনি ১৯৬৯ সালে ভারতের কার্যভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তীতে ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ভারতের উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হিদায়তুল্লাহকে তাঁর সততা, উচ্চশিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ন্যায়ের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতির জন্য সর্বসাধারণ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁর এই উত্তরাধিকার ভারতের আইন ক্ষেত্রের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে আসছে।
আলতামাস কবীর
বিচারপতি আলতামাস কবীর ভারতের ৩৯তম মুখ্য বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একটি বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়ন করেন। বিচারপতি কবীর ১৯৭৩ সালে আইনি পেশা শুরু করেন এবং ১৯৯০ সালে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। পরে তিনি ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের মুখ্য বিচারপতি হন। ২০০৫ সালে তিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসেবে উন্নীত হন এবং অবশেষে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের মুখ্য বিচারপতির পদে নিযুক্ত হন।
বিচারপতি আলতামাস কবীর
বিচারপতি কবীর তাঁর সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশেষভাবে মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। তিনি বিশেষ করে সমাজের বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি তাঁর গভীর সহানুভূতি এবং সকলের জন্য ন্যায়বিচার সহজলভ্য করে তোলার প্রয়াসের জন্য সম্মানিত হয়েছেন।
বিচারপতি আলতামাস কবীরের মৃত্যু ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি হয়। তাঁর বিচারিক জীবন ও অবদান ভারতের আইনক্ষেত্রে এক অনন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
বাহারুল ইসলাম
বিচারপতি বাহারুল ইসলাম ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় আইনজ্ঞ ও সংসদ সদস্য। তিনি ১৯১৮ সালে অসমে জন্মগ্রহণ করেন এবং একজন আইনজীবী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং এরপর তাঁকে গৌহাটি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
বিচারপতি বাহারুল ইসলাম
১৯৮০ সালে, বিচারপতি ইসলামকে ভারতের উচ্চতম আদালতে (সুপ্রিম কোর্ট) পদোন্নতি দেওয়া হয়। দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে দায়িত্ব পালনের আগে তিনি একজন বিধায়ক হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি তাঁর বিচারিক স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং মানবাধিকার সম্পর্কে গভীর সচেতনতার জন্য পরিচিত ছিলেন।
বিচার বিভাগের কার্যকাল শেষ হওয়ার পর, তিনি পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসেন এবং রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন।
আহসানউদ্দিন আমানুল্লাহ
বিচারপতি আহসানউদ্দিন আমানুল্লাহ হলেন ভারতের উচ্চতম আদালতের একজন বিচারপতি। তিনি সততা, আইনি দক্ষতা এবং ন্যায়ের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতির জন্য সুপরিচিত।
১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করা আমানুল্লাহ একজন আইন ও জনসেবা সংশ্লিষ্ট পরিবারে জন্মেছেন। তিনি পাটনা হাইকোর্টে তাঁর আইনি পেশা শুরু করেন, যেখানে তিনি সংবিধানিক এবং দেওয়ানি মামলার বিস্তৃত ক্ষেত্র দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচালনা করার জন্য স্বীকৃতি ও সম্মান অর্জন করেন।
বিচারপতি আহসানুদ্দিন আমানুল্লাহ
২০১১ সালে, তিনি পাটনা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান এবং পরে আন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্টে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তাঁকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।তাঁর বিচারিক কর্মজীবনে বিচারপতি আমানুল্লাহ ন্যায়বিচার, প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা ও আইনি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার জন্য বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন।
ফইজান মুস্তাফা
ফইজান মুস্তাফা একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও আইনি পণ্ডিত।
তিনি হায়দরাবাদের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব লিগ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ (NALSAR) আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এবং ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি ওড়িশার (NLUO) প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য।
শিক্ষাবিদ ও আইনবিদ ফইজান মুস্তাফা
তিনি টেকনোলজি ইনকিউবেটর টি-হাবের পরিচালনা সমিতির সদস্য।সাম্প্রতিককালে, তিনি পাটনার চানাক্য ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ছাবিহুল হাসনাইন
বিচারপতি ছাবিহুল হাসনাইন ১৯৮০ সালে লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৪ সালে তিনি একজন অ্যাডভোকেট হিসেবে নাম নথিভুক্ত করেন এবং মূলত সিভিল, সংবিধান ও সার্ভিস কেসে প্র্যাকটিস শুরু করেন।
বিচারপতি ছাবিহুল হাসনাইন (বাঁ পাশে)
২০০৮ সালের মে মাসে তাঁকে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।তিনি ২০১০ সালের ১৯ এপ্রিল স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং আলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।অবসরের পর তাঁকে দিল্লি বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।