মুসলিম শিল্পীর হাতে তৈরি হচ্ছে দেবদেবীর মুর্তি! ধর্মের ঊর্ধ্বে শিল্প, মাটির প্রতিমায় যেন সম্প্রীতির বার্তা সরিফুল ইসলামের
তরুণ নন্দী / কলকাতা
মাটির তাল থেকে নানা দেবদেবীর মুর্তি গড়েন তিনি। তাঁর আঙুলের স্পর্শেই তৈরি হয়ে যায় অসাধারণ দেবদেবীর প্রতিমা। এই শিল্পীর পরিচয় তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের। তাঁর মতে, শিল্পের জগতে ধর্মের কোনও দেওয়াল নেই। উত্তর ২৪ পরগনার দত্তপুকুরের বাসিন্দা এই মৃৎশিল্পী হলেন ৫৬ বছর বয়সী সরিফুল ইসলাম। শিল্পীমহলে কিংবা এলাকায় যিনি ‘খোকা’ নামেই বেশি পরিচিত।
বছরের পর বছর ধরে হিন্দুদের বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করে আসছেন শিল্পী সরিফুল। তাঁর হাতের তৈরি প্রতিমা বাংলার নানা জেলাতে তো বটেই, পাড়ি দিয়েছে মুম্বই, দিল্লি-সহ দেশের নানা প্রান্তে। এমনকী দেশের বাইরেও তাঁর শিল্পকর্ম পৌঁছে গিয়ে সুনাম ছড়িয়েছে। আর তাঁর সৃষ্টি করা সেই মাটির প্রতিমার মধ্য দিয়েই বারবার উঠে এসেছে একটাই বার্তা, শিল্পের কোনও ধর্ম হয় না।
আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের একজন বলা চলে। সরিফুলের নিজস্ব শিল্পশালাও রয়েছে। প্রতিভার জোরে নিজের পরিচিতি অর্জন করেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে তাঁর শিল্পকর্মের চাহিদা। কিন্তু এই জায়গায় পৌঁছনোর পথটা মোটেই মসৃণ ছিল না এই শিল্পীর।
দেবীর প্রতিমা হাতে সরিফুল ইসলাম
ছোটবেলায় অর্থের অভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি সরিফুলের। সংসারের অভাব মেটাতে অল্প বয়সেই হাতে তুলে নিতে হয়েছিল ভ্যানের হাতল। অন্য অনেক শিশুর মতো বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার বদলে সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে ছুটতে হয়েছে তাঁকে। তবু সংসারে বয়ে চলা অভাব-অনটন তাঁর ভিতরের শিল্পীসত্তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি।
মাটি, রং আর প্রতিমার মুখ এই তিনের প্রতি অদ্ভুত টান ছিল ছোট থেকেই। কোনও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ হয়নি। কোন নামী কর্মশালায় থেকে হাতেখড়ি হয়নি। ভ্যানে করে মাটি পৌঁছে দিতে গিয়ে নিজের চোখে দেখে, নিজের হাতে চেষ্টা করে, ভুল করতে করতে ধীরে ধীরে নিজের শিল্পভাষা তৈরি করেছেন সরিফুল। সংসারের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও শিল্পের স্বপ্নটা তিনি মনের মধ্যে আঁকড়ে রেখেছিলেন। সেই স্বপ্নই একদিন তাঁকে পৌঁছে দেয় নিজের শিল্পশালা তৈরির পথে। প্রতিষ্ঠানের নাম রাখেন ‘ইসলাম টেরাকোটা’।
দেবীর প্রতিমা হাতে সরিফুল ইসলাম
মাটি চিনে তাতে শিল্পে রূপ দেওয়ার মত প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে প্রতিমার কাঠামো তৈরি একা হাতেই করেন। প্রতিমা গঠনে মাটির প্রলেপ, মুখের আদল ফুটিয়ে তোলা, সূক্ষ্ম কাজ, সবেতেই তিনি পারদর্শী। বছরের পর বছর কাজ করতে করতে তাঁর শিল্পকর্মে চলে এসেছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। তাঁর কাছে এসে কাজ শিখে আজ বহু শিল্পী প্রতিষ্ঠিত। তাই বলতে দ্বিধা নেই, যে মানুষটি একদিন কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাননি, তিনিই এখন অন্যদের হাতে তুলে দিচ্ছেন নিজের অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার।
সরিফুলের শিল্পকর্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই। তিনি মুসলিম হয়েও হিন্দু দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করেন। বিষয়টি তাঁর কাছে কোনও দ্বন্দ্বের নয়, বরং শিল্পের স্বাভাবিক প্রকাশ।একদিকে তাঁর হাতে গড়া দেবী প্রতিমা আর অন্যদিকে শিল্পীর নিজের পরিচয়, এই দুইয়ের মিলন যেন বাংলার বহু পুরনো সংস্কৃতিরই প্রতিচ্ছবি।
সরিফুল ইসলাম দেবদেবীর প্রতিমা তৈরির মুহূর্তে
সরিফুল কথায় কথায় বললেন, “অনেকেই বলেন, আমি সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। এর চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু হতে পারে না। শিল্পের জায়গায় সব ধর্মই এক।” একসময় যে শিল্পীকে সংসার চালানোর জন্য ভ্যান চালাতে হয়েছিল, আজ তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে তথ্যচিত্র। প্রকাশিত হয়েছে বইও। স্বীকৃতি এসেছে নানা দিক থেকে।
কিন্তু স্বীকৃতির পাশাপাশি তাঁর মনের মধ্যেও রয়ে গিয়েছে কিছু আক্ষেপও। সরিফুল আক্ষেপ করে বলেন, তাঁর কাজের প্রশংসা অনেকেই করেন, কিন্তু এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা তিনি পাননি। সরকারি সাহায্যও তাঁর কাছে পৌঁছয়নি বলে তাঁর দাবি। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, উপযুক্ত সহযোগিতা পেলে শুধু তাঁর নিজের শিল্পকর্মই নয়, এই মাটির শিল্পের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকেও আরও বেশি করে যুক্ত করা সম্ভব।
দেবীর প্রতিমা হাতে সরিফুল ইসলাম
৫৭ বছরের সরিফুল ইসলাম আজ প্রতিষ্ঠিত। ধর্মীয় পরিচয়ও তাঁর শিল্পের সামনে কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বলা ভালো, শিল্পসৃষ্টিতে মাটির প্রতিটি দলা যেন তাঁকে বারবার শিখিয়েছে, মানুষের পরিচয়ের আগে শিল্পীর পরিচয়। তাঁর হাতের তৈরি প্রতিটি মুর্তি যেন হয়ে ওঠে বাংলার মাটিতে সম্প্রীতির এক জীবন্ত ছবি।