মানবিকতাকে এক করে দেওয়া ছোট্ট মানুষদের চিকিৎসা খরচ নিয়ে বিতর্ক! প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস জেলাশাসকের

Story by  Nurul Haque | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
মানবিকতাকে এক করে দেওয়া ছোট্ট মানুষদের চিকিৎসা খরচ নিয়ে বিতর্ক! প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস জেলাশাসকের
মানবিকতাকে এক করে দেওয়া ছোট্ট মানুষদের চিকিৎসা খরচ নিয়ে বিতর্ক! প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস জেলাশাসকের
 
নূরুল হক / আগরতলা

২৪ মাস বয়সের এক ছোট্ট ফুটফুটে শিশু মনুশ্রী চৌধুরী। শিশুটি বিরল এবং জটিল রোগ হিসেবে পরিচিত এস এম এ টাইপ ওয়ান রোগে আক্রান্ত। এই রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন বহু কোটি টাকা। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার জামানায় ফুটফুটে হাসিমুখে শিশুর জটিল রূপে আক্রান্তের খবর ভাইরাল হতেই জোয়ার ওঠে মানবিক সাহায্যের।
 
ছোট্ট শিশুর প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। ধর্ম বর্ণ মিলেমিশে হয়ে যায়। শিশুর প্রাণ বাঁচাতে মন্দির থেকে যেমন সাহায্য আসে, তেমনি দুই হাত উজাড় করে সাহায্য করে মসজিদ এবং মাদ্রাসা। স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সহ জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের রাজ্য কমিটি এবং একাধিক ধর্মীয় সংগঠন শিশুর সাহায্য করার পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্যের আর্জি জানায়।
 
শিশু মনুশ্রী চৌধুরী
 
সম্প্রতি দেখা যায় শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পর মনশ্রী চৌধুরীর সাহায্যের জন্য ব্যাপক হারে অর্থ সাহায্য করেন দিল্লি জামা মসজিদের মুসল্লিরা। দেখা যায় বিভিন্ন কনটেন্ট ক্রিকেটার মনস্রিকে নিয়ে ভিডিও বানিয়ে সাহায্যের আর্জি জানাচ্ছে। মনশ্রী চৌধুরী এবং তার মার সাহায্যের আবেদনের ভিডিও ব্যাপক হারে ভাইরাল হয়। সেই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরই একের পর এক বিতর্ক উঠতে শুরু করেন।
 
ত্রিপুরার এসএমএ আক্রান্ত শিশু মনুশ্রী চৌধুরীকে বাঁচাতে গত কয়েক মাস ধরে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছ থেকে ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে বহু মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পর সেই টাকার প্রকৃত হিসাব এবং চিকিৎসা খরচের তথ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
 
অভিযোগ, মনুশ্রীর চিকিৎসার জন্য প্রথমদিকে প্রায় ১৬ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে সাধারণ মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন শিশুটির বাবা ধ্রুব চৌধুরী। শিশুটির চিকিৎসার জন্য আগরতলা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাহায্যের আবেদন পৌঁছে যায়। এমনকি দেশের খ্যাতনামা সমাজ সেবী হোসেন মনসুরি সহ বাইরে থেকে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি মনুশ্রীর পাশে দাঁড়ান।
 
কিন্তু ক্রাউডফান্ডিংয়ের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় প্রশ্ন। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের অভিযোগ, মনুশ্রীর চিকিৎসার জন্য সংগৃহীত অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হচ্ছে না। চিকিৎসার প্রকৃত খরচ কত, কত টাকা সংগ্রহ হয়েছে এবং বর্তমানে সেই অর্থের কতটা অবশিষ্ট রয়েছে, এই প্রশ্নগুলির স্বচ্ছ উত্তর চাওয়া হচ্ছে।
 
বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিষয়ও। অভিযোগ অনুযায়ী, মনুশ্রীর চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি শিশুটির বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট এবং আগরতলার এক ব্যক্তি রাজা সাহার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টেও অর্থ জমা হয়েছে। রাজা সাহা মনুশ্রীর পরিবারের সদস্য নন। তবে শিশুটির চিকিৎসার জন্য সাহায্য সংগ্রহের উদ্যোগে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন বলে জানা যায়।

এই বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর জানতে পশ্চিম জেলার জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছে কয়েকটি সামাজিক সংগঠন। তাদের দাবি, মনুশ্রীর প্রকৃত চিকিৎসা ব্যয় এবং গত কয়েক মাসে সংগৃহীত মোট অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হোক। শিশুটিকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত কিছু ভিডিও নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলি। তাদের অভিযোগ, ক্রাউডফান্ডিংয়ের জন্য ভিডিও তৈরির সময় অসুস্থ শিশুটির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। 
 
এরই মধ্যেই বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করেন পশ্চিম জেলার জেলাশাসক ডা. বিশাল কুমার। তিনি জানান, মনুশ্রীর চিকিৎসার জন্য সংগৃহীত অর্থ সংক্রান্ত অভিযোগ ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের কাছে এসেছে। জেলাশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে মনুশ্রীর বাবা ধ্রুব চৌধুরী এবং রাজা সাহাকে ডেকে বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় তাদের পক্ষ থেকে সাড়ে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকার হিসাব দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
 
সেই তথ্যের উপর স্মল সেভিংস এর আধিকারিকরা তদন্ত করছেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, আরও একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩ কোটি টাকা থাকার বিষয় রয়েছে। ওই অর্থের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে তখন পর্যন্ত স্পষ্ট তথ্য ছিল না বলেই সাংবাদিকদের জানান জেলাশাসক। জেলাশাসক আরও জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও অসুস্থ করেন মানুষ যে কারণে অর্থ সহ্য করেছে, টাকার সেই খাতে খরচ না হলে তদন্ত করে পুলিশের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 

অন্যদিকে মনুশ্রীর চিকিৎসা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কিত কিছু দাবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। প্রশাসনিক পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, শিশুটির শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য যথাযথ চিকিৎসা নথির ভিত্তিতেই যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করলেই চিকিৎসার ফলাফল নিশ্চিত হবে, এমন কোনও দাবি প্রশাসনের বক্তব্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সব অভিযোগের মধ্যেও একটি বিষয়েই কার্যত একমত সাধারণ মানুষ, মনুশ্রীর চিকিৎসা যেন কোনওভাবেই থেমে না যায় এবং শিশুটির জীবন রক্ষাই যেন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়।তবে সেই সঙ্গে উঠে আসছে স্বচ্ছতার প্রশ্নও।
 
মানুষের আবেগ এবং সহানুভূতিতে সংগৃহীত কোটি কোটি টাকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হবে কি না, চিকিৎসায় প্রকৃত ব্যয় কত হয়েছে এবং অবশিষ্ট অর্থের ভবিষ্যৎ ব্যবহার কীভাবে হবে, এখন নজর সেদিকেই।‌মনুশ্রীর জীবন রক্ষার লড়াই চলুক, কিন্তু সেই লড়াইয়ের পাশে থাকা হাজার হাজার মানুষের আস্থার স্বার্থে ক্রাউডফান্ডিংয়ের প্রতিটি টাকার স্বচ্ছ হিসাবও প্রকাশ করা জরুরি, এমনটাই দাবি উঠছে বিভিন্ন মহলে।


শেহতীয়া খবৰ