১৩ গোল্ড মেডেলের পর NEET PG-তে দেশসেরা ২১-এর মধ্যে মেঙ্গালুরুর ড. আফলা রফিক
আওয়াজ দ্য ভয়েস / নয়াদিল্লি
MBBS-এর পড়াশোনায় একের পর এক সাফল্যের পর এবার NEET PG 2026-এও নজরকাড়া ফল করলেন মেঙ্গালুরুর ড. আফলা রফিক। কেএস হেগড়ে মেডিক্যাল অ্যাকাডেমির এই প্রাক্তন ছাত্রী পরীক্ষায় অল ইন্ডিয়া ২১তম র্যাঙ্ক অর্জন করেছেন। ৭২০ নম্বরের পরীক্ষায় তাঁর প্রাপ্ত নম্বর ৬১৪। এর আগে MBBS পড়ার সময়ই তিনি ১৩টি গোল্ড মেডেল অর্জন করে নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছিলেন।
বর্তমানে কেএস হেগড়ে হাসপাতালে MBBS ইন্টার্নশিপ করছেন ড. আফলা। ইন্টার্নশিপের ব্যস্ত রুটিনের মধ্যে NEET PG-এর প্রস্তুতি নেওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না। হাসপাতালের দায়িত্ব, পড়াশোনার চাপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল নানা ব্যস্ততা। তা সত্ত্বেও প্রতিদিন পড়াশোনার জন্য সময় বের করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন তিনি।
ড. আফলা রফিক
NEET PG 2026-এ ড. আফলা রফিকের ২১তম র্যাঙ্ককে তাঁর ধারাবাহিক প্রস্তুতির ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরীক্ষায় দেশজুড়ে বিপুল সংখ্যক মেডিক্যাল পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। ন্যাশনাল বোর্ড অফ এগজামিনেশনস ইন মেডিক্যাল সায়েন্সেস অর্থাৎ NBEMS-এর তথ্য অনুযায়ী, NEET PG 2026-এর জন্য ২,৭৩,০৯৬ জন প্রার্থী রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২,৬৫,৯৮০ জন পরীক্ষায় অংশ নেন।
ড. আফলার প্রস্তুতির গল্প শুধু পরীক্ষার শেষ কয়েক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। MBBS-এর শুরুর বছর থেকেই তিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। তবে ইন্টার্নশিপের সময় তাঁর প্রস্তুতি আরও নিয়মিত হয়ে ওঠে। নির্দিষ্ট রুটিন মেনে পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যান তিনি। বারবার রিভিশন করা এবং প্রশ্ন সমাধানের ওপর জোর দিয়েছিলেন তিনি।
ড. জয়নব ভোরার সঙ্গে কথোপকথনে ড. আফলা তাঁর প্রস্তুতির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানিয়েছেন। ড. জয়নব ভোরাকে তিনি নিজের মেন্টর মনে করেন। কথোপকথনে তিনি জানান, ইন্টার্নশিপের সময়ও পড়াশোনাকে প্রতিদিনের অভ্যাস হিসেবে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যেও তিনি লাইব্রেরিতে যেতেন এবং প্রতিদিন অন্তত ১০০টি MCQ অর্থাৎ বহুনির্বাচনী প্রশ্ন সমাধানের দিকে নজর দিতেন।
তাঁর প্রস্তুতিতে নোটসের রিভিশনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ড. আফলার মতে, “তিনি তাঁর নোটস ছয়বার রিভিশন করেছিলেন। এর পাশাপাশি Grand Tests বা GTs এবং Tests and Discussions বা T&Ds-এও নিয়মিত অংশ নিয়েছিলেন। প্রতিটি পরীক্ষার পর তিনি নিজের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করতেন। ভুল হওয়া প্রশ্নগুলি বোঝা এবং দুর্বল জায়গাগুলিতে ফের কাজ করা ছিল তাঁর কৌশলের অংশ।”
NEET PG-এর মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শুধু পড়াশোনার সময়ই গুরুত্বপূর্ণ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়াও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ড. আফলা জানিয়েছেন, অনেক সময় Grand Test-এ তাঁর নম্বর একই স্তরের আশপাশে থাকত। এমন পরিস্থিতিতে হতাশ হওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু প্রস্তুতি থামিয়ে না দিয়ে তিনি নিজের ভুলগুলি পর্যালোচনা করার দিকে মনোযোগ দেন।
তাঁর এই যাত্রায় পরিবার ও বন্ধুদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রস্তুতির সময় তাঁর স্বামী তাঁকে নিয়মিত উৎসাহ দিয়েছেন। পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতা কঠিন সময়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে তাঁকে সাহায্য করেছে। ড. আফলা আরও জানান, প্রস্তুতির সময় তিনি বন্ধুদের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে দূরত্ব তৈরি করেননি। তাঁর কাছে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি ছিল।
ড. আফলা রফিক
এই কারণেই তিনি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা বা মেলামেশা পুরোপুরি বন্ধ করেননি। তাঁর মতে, পড়াশোনার পাশাপাশি মানসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ থাকাও জরুরি। তবে এর পাশাপাশি নিজের তৈরি রুটিন মেনে চলাকেই তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর কাছে প্রস্তুতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল ধারাবাহিকতা।
ড. আফলার শিক্ষাজীবনের সঙ্গে মেঙ্গালুরু গভীরভাবে যুক্ত। তিনি মূলত বাজপের বাসিন্দা। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাজপের আনসার স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। এরপর মেঙ্গালুরুর সেন্ট মেরিজ হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। সেখানে SSLC পরীক্ষায় ৯৭ শতাংশ নম্বর অর্জন করেন তিনি।
স্কুলের পর মেঙ্গালুরুর শ্রী চৈতন্য PU কলেজে ভর্তি হন তিনি। সেখানেও তাঁর ফলাফল ছিল দুর্দান্ত। ৯৬ শতাংশ নম্বর পেয়ে শীর্ষস্থান অর্জন করেন তিনি। এরপর চিকিৎসাশিক্ষার জন্য কেএস হেগড়ে মেডিক্যাল অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন।
MBBS পড়ার সময়ও তাঁর সাফল্যের ধারা অব্যাহত ছিল। মোট ১৩টি গোল্ড মেডেল অর্জন করেন তিনি। মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনার সময় ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করার পর NEET PG-তেও তাঁর পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্য হয়েছে। ৬১৪ নম্বর নিয়ে AIR 21 অর্জন তাঁর শিক্ষাজীবনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এখন ড. আফলার নজর পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল শিক্ষার দিকে। তিনি রেডিওলজিতে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করতে চান। NEET PG 2026-এ তাঁর র্যাঙ্ক দেশের মর্যাদাপূর্ণ মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলিতে পোস্টগ্র্যাজুয়েট আসনের ক্ষেত্রে তাঁকে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে। তবে চূড়ান্ত কলেজ ও আসন নির্বাচন কাউন্সেলিং প্রক্রিয়ার সময় হবে।
ড. আফলা রফিকের গল্প NEET PG-এর মতো কঠিন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া মেডিক্যাল পড়ুয়াদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কোনও একটি পদ্ধতি ছিল না। নিয়মিত পড়াশোনা, রিভিশন, MCQ, Grand Test এবং নিজের ভুলের পর্যালোচনা, সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। ইন্টার্নশিপের সময়ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তাঁর প্রস্তুতির অন্যতম বিশেষ দিক ছিল।
তাঁর প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, তিনি শুধু পরীক্ষার কাছাকাছি এসে পড়াশোনার গতি বাড়াননি। MBBS-এর শুরুর বছর থেকেই নিজের ভিত্তি মজবুত করার দিকে নজর দিয়েছিলেন। ইন্টার্নশিপের সময় সেই প্রস্তুতিকে আরও সুশৃঙ্খল করে তোলেন। এর ফলে ক্লিনিক্যাল বিষয় সংক্রান্ত প্রশ্নগুলি বুঝতেও তিনি সাহায্য পেয়েছেন।
ড. আফলা বলেন, “বারবার রিভিশন পরীক্ষার সময় ক্লিনিক্যাল প্রশ্ন নিয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। NEET PG-তে মেডিক্যাল পড়ুয়াদের জন্য শুধু তথ্য মনে রাখাই যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন বুঝে সঠিক বিকল্পে পৌঁছনোটাও গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই নিয়মিত প্রশ্ন অনুশীলনকে তিনি তাঁর প্রস্তুতির অংশ করে রেখেছিলেন।”
ড. আফলা রফিক, মোহাম্মদ রফিক ও ফাতিমা রফিকের মেয়ে। তাঁর পরিবারের কাছেও এই সাফল্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১৩টি গোল্ড মেডেলের পর NEET PG 2026-এ অল ইন্ডিয়া ২১তম র্যাঙ্ক তাঁর শিক্ষাজীবনে একটি নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।
ড. আফলার এই সাফল্য মেঙ্গালুরুর চিকিৎসাশিক্ষার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য। একদিকে MBBS-এর সময় তিনি ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করেছেন। অন্যদিকে ইন্টার্নশিপের মতো ব্যস্ত সময়েও NEET PG-এর প্রস্তুতি চালিয়ে গিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ৬১৪ নম্বর নিয়ে ২১তম অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক অর্জন করেছেন তিনি।
এখন তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য রেডিওলজিতে পোস্টগ্র্যাজুয়েট পড়াশোনা করা। আগামী দিনে তাঁর চিকিৎসা-শিক্ষার যাত্রা কোন দিকে এগোয়, সেদিকেই নজর থাকবে। আপাতত NEET PG 2026-এ ড. আফলা রফিকের ২১তম র্যাঙ্ক এবং MBBS-এর সময় অর্জিত ১৩টি গোল্ড মেডেল তাঁর পরিশ্রম, ধারাবাহিকতা এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রস্তুতির গল্পই তুলে ধরে।