মুসলিম ভোটে ‘খেলা’ জমজমাট! একদিকে মুসলিম ভোট, অন্যদিকে বিরোধী ভোটের ভাগ! উপনির্বাচনে নন্দীগ্রাম–রেজিনগরে বদলে যাবে কি খেলা?
তরুণ নন্দী / কলকাতা
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভোটের অঙ্কে বহু নির্বাচনী কেন্দ্রতেই মুসলিম ভোটাররা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনে যেভাবে রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারে ঝড় তুলেছে তাতে সেই চেনা সমীকরণকে যেন আরও জটিল করে তুলেছে। ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনের ভোটে দেখার বিষয় হল সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে কতটা একত্রিত হয়। যদি সংখ্যালঘু ভোটারদের সিংহভাগ ভোট এক জায়গায় পড়ে তবে তা উঠতে পারে ফল নির্ধারণের অন্যতম চাবিকাঠি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের ছবিটা কিন্তু একটু ভিন্ন। এই কেন্দ্রে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৬৫ শতাংশ বলে রাজনৈতিক মহলে তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে, রয়েছে নানা অংক। ফলে এই কেন্দ্রের মুসলিম ভোটের ভোটদান যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে তা নিয়ে কোন সংশয় নেই। এখানকার এই বিশাল সংখ্যালঘু ভোট কোনও একটি দলের দিকে যে এককভাবে চলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া কঠিন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞমহল।
তার কারণটা হল, তৃণমূল, গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস, বাম এবং হুমায়ুন কবীরের AJUP, বিরোধী শিবিরের একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ভোটের ময়দানে থাকায় ভোট ভাগের সম্ভাবনাই বরং বেশি। ফলে সেক্ষেত্রে ভোট ভাগাভাগিতে হয়ত শাসক দলের পাল্লা ভারী হয়ে উঠতে পারে।
ভোট অংকের ঠিক এই জায়গাতেই রেজিনগরে হুমায়ুন কবীর গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে হুমায়ুণের বিরাট সাফল্যের পর এবার তাঁর ছেলে গোলাম নবী আজাদ প্রার্থী হয়েছেন। ফলে ব্যক্তিগত প্রভাব, পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচিতি আর সেইসঙ্গে মিশবে AJUP-এর নিজস্ব পকেট ভোট, এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা যাবে না।
তবে এটাও গুরুত্বপূর্ন বিষয় হচ্ছে, তৃণমূল ও নতুন বিরোধী প্ল্যাটফর্মের প্রার্থী থাকায় মুসলিম ভোটের একটি অংশের ভোট ভাগাভাগিতে সরাসরি সুবিধা পেতে পারে বিজেপি প্রার্থী। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বলা যায়, বিজেপির জন্য বিরোধী ভোটের বিভাজনই বড় রাজনৈতিক সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
বিশ্লেষকদের মতে, উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামের অঙ্ক আবার সম্পূর্ণ আলাদা। এই কেন্দ্র মেদিনীপুরের অধিকারী পরিবারের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলে এখানে শুধু মুসলিম ভোটের শতাংশ দিয়ে ফলের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পেক্ষাপট ও শাসক বিরোধী ভোট একত্রিত হলে লড়াই কতটা বদলে যেতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী সরে গিয়ে কংগ্রেসকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে পারে। কংগ্রেস প্রার্থীর ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত ভোটের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মনে করা হচ্ছে, এই কেন্দ্রের বিরোধী শিবিরের সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ যদি কোনভাবে কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকে যায় সেক্ষেত্রে নন্দীগ্রামে কংগ্রেসই ভোট ময়দানে বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্নটি হল, শুধু মুসলিম ভোট একত্রিত হলেই কি বিজেপিকে হারানো সম্ভব? নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রে উত্তর সম্ভবত ‘না’। কারণ শুভেন্দু অধিকারীর জনপ্রিয়তা আর হিন্দু ভোটের প্রভাবে বিজেপিকে এখানে ঠেকানো মুশকিল। নানা সম্প্রদায়ের ভিতরেও স্থানীয় সমস্যা, প্রার্থী, সংগঠন, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা সহ বিজেপিকে ঠেকানোর কৌশল, সবকিছু ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে একই সমীকরণ কাজ করবে না।
বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি
অনেকেই মনে করছেন, তৃণমূলের ভাঙনে কংগ্রেসের সামনে তাই এবার বড় সুযোগ রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কঠিন পরীক্ষাও রয়েছে। পুরনো রাজনৈতিক ভিত্তিকে নতুন সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দিতে পারলে তারা বিভক্ত বিরোধী ভোটের একটি বড় অংশ নিজেদের দিকে টানতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে হুমায়ুন কবীর বা নওশাদ সিদ্দিকির মতো নেতারা নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে প্রভাব ফেলতে পারলেও সেই প্রভাব রাজ্যজুড়ে ছড়ানো এখনও কঠিন।
৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনের লড়াইতে দেখা যাবে মুসলিম ভোট কি আবার কোনও এক রাজনৈতিক ছাতার নিচে একত্রিত হবে, নাকি বহুমুখী বিরোধিতার কারণে সেই ভোট ভাগ হয়ে নতুন নির্বাচনী সমীকরণ তৈরি করবে। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ফলাফল দেখেই হয়ত এই প্রশ্নের উত্তরটি খুঁজে নিতে পারবেন বঙ্গবাসী।