ঐতিহাসিক সম্প্রীতি: হাওড়ায় দুর্গাপুজোয় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের একটাই মন্ত্র "উৎসব সবার, ধর্ম যার যার"!

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
ঐতিহাসিক সম্প্রীতি: হাওড়ায় দুর্গাপুজোয় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের একটাই মন্ত্র
ঐতিহাসিক সম্প্রীতি: হাওড়ায় দুর্গাপুজোয় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের একটাই মন্ত্র "উৎসব সবার, ধর্ম যার যার"!
 
শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী 

হাওড়ায় হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের যৌথ অংশগ্রহণ ও আন্তরিক সহযোগিতায় বেশ কয়েকটি দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়, যা বাংলার চিরাচরিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মেলবন্ধনের অনন্য উদাহরণ তুলে ধরে। হাওড়া জেলার এ ধরনের কিছু উল্লেখযোগ্য দুর্গাপুজোয় সম্প্রীতির চিত্র চোখে পড়ে। 

তার মধ্যে রয়েছে শ্যামপুরের কানপুরের দুর্গাপুজো। হাওড়ার শ্যামপুর এলাকার কানপুর গ্রামে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রে মিলে দুর্গাপুজোর আয়োজন করে আসছেন সেই ১৯৭২ সাল থেকে। গ্রামের বাসিন্দারা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই উৎসবকে তাদের নিজেদের সামাজিক উৎসব হিসেবে উদযাপন করেন।তবে কানপুর অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি এবং দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে নানা ঘটনা ও প্রেক্ষাপট রয়েছে। 
 
হাওড়া শিবপুরের দুর্গাপুজোর এক মন্ডপ
 
১৯৭২ সালে শ্যামপুরের কানপুরে প্রথম দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বনান ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও এলাকার হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্গাপুজোর আয়োজন ও আবাহনে অংশ নিয়েছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়। তবে ২০২৪ সালে এই পুজোকে কেন্দ্র করে কিছু উত্তেজনা ও অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটেছে।
 
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে দুর্গাপুজোর সময় শ্যামপুর থানার অন্তর্গত কানপুর ও শ্যামপুর বাজার এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। একটি ডেপুটেশন জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গণ্ডগোলে শ্যামপুর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির পুজো মণ্ডপে ও প্রতিমায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে। 
 
এই ঘটনার পর হাওড়া গ্রামীণ পুলিশ প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে এবং এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত ও পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়। তার পরেও হাওড়া জেলার শ্যামপুর থানার কানপুর গ্রামে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ আজও মিলেমিশে দুর্গাপুজোর আয়োজন করে আসছেন।
 
বেলুড়ের বিষ্ণুবাটিকা আবাসন দুর্গাপূজা: 
 
হাওড়ার বেলুড় অঞ্চলের এই আবাসিকের পুজোটি সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক বড় উদাহরণ। এখানে সনাতনী নিয়ম ও আচার মেনে পুজো হলেও এর সার্বিক ব্যবস্থাপনা, আনন্দ এবং আয়োজনে হিন্দু ও মুসলিম উভয় পরিবারের সদস্যরাই সমানভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশগ্রহণ করেন।
 
হাওড়ার শিবপুর সার্বজনীন শারদোৎসব ক্ষেত্রমিলনীর পুজো
 
বেলুড়ের এই আবাসনের দুর্গাপুজো ২০১১ সাল থেকে  আয়োজন করা হয়ে আসছে। এই পুজোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, আবাসন ও সংলগ্ন এলাকার হিন্দু এবং মুসলিম বাসিন্দারা একসঙ্গে মিলে উৎসবের সমস্ত দায়িত্ব ভাগ করে নেন। চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে প্যান্ডেল তদারকি, অতিথি আপ্যায়ন এবং বিজয়ার কোলাকুলি, সব ক্ষেত্রেই উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন।
 
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পুজো কমিটির ঐতিহ্য অনুসারে, বেলুড়ের এই ধরনের সম্প্রীতির পুজো আজও তার মূল ভাবনা বজায় রেখেছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং পুজো উদ্যোক্তাদের আন্তরিকতায় ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে উৎসবকে 'সর্বজনীন' রূপ দেওয়া অব্যাহত রয়েছে।
 
বাঙালি সংস্কৃতিতে "ধর্ম যার যার, উৎসব সবার", এই মন্ত্রকে ধারণ করে বেলুড়ের বিষ্ণু বাটিকা আবাসনের বাসিন্দারা প্রতি বছর অত্যন্ত আনন্দের সাথে এই উৎসব পালন করে আসছেন। এছাড়াও হাওড়ার সালকিয়া, শিবপুর এবং তার আশেপাশের বেশ কিছু এলাকায় ধর্মীয় বিভেদ ভুলে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে পুজোর আয়োজন করেন।
 
হাওড়ার পুরনো শিল্পাঞ্চল ও মিশ্র জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে,যেমন শিবপুর, সালকিয়া এবং নিকটবর্তী ঘুড়ুড়ি বা বেলুড় অঞ্চলে বহু দশক ধরে বহু বারোয়ারি ও ক্লাব পুজো পরিচালিত হয় যেখানে হিন্দু ও মুসলিম প্রতিবেশীরা একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মায়ের পুজো করেন। অনেক পুজো কমিটিতেই আবার মুসলিম যুবকেরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, যার মধ্যে চাঁদা বা অনুদান সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে মণ্ডপ তৈরি ও তদারকির কাজও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
 
হাওড়ার সালকিয়ায় ভারত সংঘের  দুর্গাপুজো
 
এইসব পুজোয় ধর্মীয় রীতিনীতি বা পুজো-অর্চনা সনাতনী বৈদিক নিয়ম মেনেই করা হয়, তবে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমারেখা থাকে না। অষ্টমীর অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ এবং দশমীর সিঁদুরখেলার পর কোলাকুলির মতো সামাজিক পর্বগুলোতে দুই সম্প্রদায়ের মানুষই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
 
হাওড়ার অনেক এলাকায় যখন দুর্গাপুজো এবং মহরম কাছাকাছি সময়ে পড়ে, তখন সম্প্রীতির আরও এক অনন্য রূপ দেখা যায়। পুজো মণ্ডপের উদ্যোক্তারা এবং মহরমের তাজিয়া মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা একে অপরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেন। অনেক সময় পুজো কমিটির মুসলিম সদস্যরা যেমন মণ্ডপের কাজ দেখাশোনা করেন, তেমনি হিন্দু প্রতিবেশীরাও মহরমের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের জল বা শরবত পানের ব্যবস্থা করে আপ্যায়ন জানান।
 
বলা চলে, হাওড়ার শিবপুর, সালকিয়া এবং সমগ্র বাংলার এই ধরণের উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে "উৎসব সবার, ধর্ম যার যার"। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক সৌহার্দ্য ও মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতীক। এ এক ঐতিহাসিক সম্প্রীতি।


শেহতীয়া খবৰ