তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
একটা সময়ে শখের বশেই শুরু করেছিলেন। আজ সেই শিল্পসৃষ্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে পেশা। আর পেশা থেকে কর্মসংস্থানের পথও খুলে দিয়েছেন তিনি। শোলাকে ব্যবহার করে দুর্গার সাজ তৈরির শিল্পে নতুন দিশা দেখাচ্ছেন দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের দেবজ্যোতি মোহরা। বলা ভালো, তাঁর ছোট্ট কর্মশালায় প্রতিমার অলংকার তৈরির পাশাপাশি হয়ে উঠেছে কয়েকজন মহিলার স্বনির্ভর হয়ে ওঠারও ঠিকানা।
শিউলি ফোটার সুগন্ধের সঙ্গে সঙ্গে পুজোর গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে গ্রামের অলিগলিতে। পুজোয় নজর কাড়তে শুরু হয়ে গেছে প্রতিযোগিতা। কোথাও মণ্ডপ তৈরির শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা, কোথাও প্রতিমায় চলছে রং-তুলির প্রলেপ। ঠিক এদের মতোই উৎসবের মরশুমে বালুরঘাট শহরের ছোট্ট কর্মশালাতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে অন্য রকম এক ব্যস্ততা।
এখানে মাটির প্রতিমা সাজাতে যা যা দরকার তা তৈরি হয় এই কর্মশালায়। শোলা, চুমকি, মুক্তো, রঙিন অভ্র, সুতো আর নানা উপকরণকে নিপুণ হাতে সাজিয়ে তৈরি করা হচ্ছে দেবী দুর্গার মুকুট, হার, কানের দুল থেকে শুরু করে নানা ধরনের অলংকার। খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, শিল্পীর ধৈর্য, কল্পনা আর সূক্ষ্ম কারুকাজ প্রতিটি সাজের মধ্যে ফুটে উঠছে। কথা বলে জানা যায়, একসময় নিছক শখের বশেই শোলার কাজ হাতে নিয়েছিলেন দেবজ্যোতি মোহরা। প্রথমে ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু হতেই নজর কেড়েছিলেন। শিল্পসৃষ্টির নেশা যেন সময়ের সঙ্গে হয়ে ওঠেছে পেশা। আর এই শোলাশিল্পের পেশাকে নিজের মধ্যে আটকে না রেখে ধীরে ধীরে কয়েকজন মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেছেন কর্মসংস্থানের পরিসর।
দেবজ্যোতির কর্মশালায় ঢুকলেই প্রত্যেকের ব্যস্ততা দেখে অনুমান করা যাবে, পুজোর আগে তাঁদের সময়টা কতটা মূল্যবান। কেউ ব্যস্ত মুকুটে শেষ মুহূর্তের কারুকাজে, কেউ মুক্তোর সারি বসাচ্ছেন, আবার কেউ নিখুঁতভাবে তৈরি করছেন কানের দুল কিংবা হার। শিল্পের ছোঁয়ায় একেকটি অলংকার যেন তাকিয়ে থাকার মত। শিল্পী দেবজ্যোতির এই কর্মযজ্ঞের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন কয়েকজন মহিলাও। নিজেদের সংসার সামলেও হাতে তুলে নিয়েছেন এই শিল্পের কাজ।
দেবজ্যোতির পাঠশালায় মহিলারা কাজকর্মে লেগে রয়েছেন
দেবজ্যোতির শিক্ষায় ধীরে ধীরে শিখেছেন শোলার অলংকার তৈরির কৌশল। আজ তাঁদের কাছে এই কর্মশালা যেন আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্বনির্ভর হওয়ার একটি পথ হয়ে উঠেছে। একসময় যে কাজটি ছিল দেবজ্যোতির একার শখ হয়ে শুরু হয়েছিল, আজ সেই শিল্পই অন্যদের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। বালুরঘাটের এই কর্মশালায় তৈরি এই শোলার অলংকার পাড়ি দিচ্ছে দূরদূরান্তে। এই সৃষ্টি এখন আর দক্ষিণ দিনাজপুরে সীমাবদ্ধ নেই।
দেবজ্যোতির কর্মশালায় তৈরি দুর্গার সাজ পৌঁছে যাচ্ছে রায়গঞ্জ, কলকাতা সহ পাটনা, উত্তরপ্রদেশের মতো ভিনরাজ্যেও। নিঁখুত ফিনিশের কারণে তাঁর তৈরি এই অলংকারের চাহিদা যেন মার্কেটে বেড়েই চলেছে। বিশেষ আকর্ষণ সুপারি পাতার উপর তৈরি অভিনব কারুকাজ। এই বিশেষ সাজের একটি যাচ্ছে রায়গঞ্জে, অন্যটি পাড়ি দিচ্ছে পাটনায়। অর্থাৎ বালুরঘাটের ছোট্ট কর্মশালার নিপুণ হাতের কাজ এখন পৌঁছে যাচ্ছে বাংলার সীমানা পেরিয়েও।
বিভিন্ন পুজো কমিটিগুলো প্রতিবছর নিয়ম মেনে ছয়-সাত মাস আগে থেকেই অর্ডার দিয়ে দেয়। তবে এ বছর কয়েকটি কমিটি দেরিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অনেকটা পরে অর্ডারও এসেছে। ফলে ব্যস্ততা থেকেই যাচ্ছে। কাঁচামালের জোগান আর নিত্যদিন দামের ওঠানামা বরাবরই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় শোলার শিল্পীদের কাছে। তবুও শত প্রতিকুলতার মধ্যেও মায়ের সাজে কোনও খামতি রাখতে নারাজ দেবজ্যোতি ও তাঁর সহকারীরা। সময়ের আগেই সমস্ত কাজ শেষ করাই এখন তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য। রাত দিন এক হলেও কর্মশালায় থামছে না হাতের কাজ।
স্বনির্ভর হচ্ছেন বালুরঘাটের মহিলারা
দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন আপামর বাঙালীরা। ঠিক তার আগে বালুরঘাটের এই ছোট্ট কর্মশালায় তৈরি হচ্ছে মাকে আরও সুন্দর করে তোলার শেষ প্রস্তুতি। শোলার সাদা রঙে, মুক্তোর ঝলকে আর শিল্পীর হাতের নিপুণতায় যা রূপ নেবে অন্য ভালোলাগায়।