মুর্শিদাবাদের রাণীনগর ইসলামপুরের ঋষিপুর গ্রামের কালীপুজো মুসলিম বাড়ির গুড় ছাড়া অসম্পূর্ণ!
শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী
মুর্শিদাবাদের রানীনগর ব্লকের ইসলামপুর থানার ঋষিপুর গ্রামের কালীপুজো আজও হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ও এক অনন্য লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই পুজোর সঙ্গে মিলেমিশে রয়েছে দুই সম্প্রদায়ের আবেগ। শোনা যায় এই গ্রামের কালীপুজো শুরু হয়েছিল ৬০০ বছর আগে। কিভাবে এই পুজোর শুরু হয়েছিল সে নিয়ে রয়েছে অনেক গল্প আর এই পুজোতে মুসলিম হিন্দু সম্প্রদায় কিভাবে মিলেমিশে রয়েছে তার রয়েছে চমৎকার কাহিনী।
ঋষিপুর গ্রামের প্রাচীন ডাকাত কালীপুজো ,যা বড়মার পুজো নামে পরিচিত। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ৬০০ বছরের ইতিহাস ও একাধিক অলৌকিক কাহিনী। এই পুজোকে কেন্দ্র করে এলাকায় বেশ কিছু লোককাহিনি প্রচলিত আছে।
মুর্শিদাবাদের রাণীনগর ইসলামপুরের ঋষিপুর গ্রামের কালীপুজো
ঋষিপুর গ্রামের এই কালীপুজোর প্রধান অলৌকিক ও অনন্য কাহিনীগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
** এক রাতেই তৈরি ও বিসর্জন: লোকশ্রুতি অনুযায়ী, সুদূর অতীতে গভীর জঙ্গলে ঘেরা এই জনপদে ডাকাত দল রাতের অন্ধকারে দেবীর মূর্তি গড়ে পুজো করত এবং ভোর হওয়ার আগেই তা সামনের বড় বিলে বিসর্জন দিয়ে দিত। সকালে গ্রামবাসীরা শুধু বটগাছের তলায় পুজোর ফুল, বেলপাতা আর সিঁদুর দেখতে পেতেন, কিন্তু প্রতিমার কোনো চিহ্ন থাকত না। আজও সেই ঐতিহ্য মেনে কালীপুজোর দিন বিকেলের পর থেকে এক রাতের মধ্যেই মূল প্রতিমা (বড়মা)-সহ সমস্ত মানতের প্রতিমা তৈরি করা হয় এবং পুজোর শেষে সেই রাতেই তা বিসর্জন দেওয়া হয়।
** গয়না সুদ্ধ প্রতিমা বিসর্জনের অলৌকিক ঘটনা: ঋষিপুরের পুজোর সবচেয়ে বড় আশ্চর্য নিয়ম হলো, ভক্তরা দেবীকে সোনা বা রূপোর যে গয়নাই দান করুন না কেন, বিসর্জনের সময় প্রতিমার গা থেকে একটি গয়নাও খোলা হয় না। সব গয়না সুদ্ধই প্রতিমা বিলের জলে নিরঞ্জন করা হয় এবং পরবর্তীকালে কেউ তা জল থেকে তোলার সাহস পান না।
প্রচলিত আছে, বহু বছর আগে এক পুরোহিত লোভের বশে প্রতিমার গা থেকে অলঙ্কার খুলে নিতে গিয়েছিলেন। অলৌকিক উপায়ে তখনই দেবীর মূর্তিতে আগুন ধরে যায়। সেই ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেবীর গয়না খোলার সাহস কেউ দেখাননি।
** মুসলিম ভক্তকে স্বপ্নাদেশ ও আখের গুড়: জনশ্রুতি আছে, একদা মুসলিম সম্প্রদায়ের এক আখের গুড় বিক্রেতা বড় মার মন্দির প্রাঙ্গণের পাকুড় গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে নিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন সেই সময়ে এক কিশোরী তার কাছে এসে গুড় খেতে চাইছে। এমন নির্জন জায়গায় এমন সুন্দরী কন্যাকে স্বপ্নে দেখে অবাক হয়ে যান ওই মুসলিম বিক্রেতা। তিনি স্বপ্নে ভাবতে শুরু করলেন এই মেয়েকে তো আগে কখনো দেখিনি। খিদেয় সুন্দর মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটি করুন স্বরে ওই বিক্রেতার কাছে গুড় চায়। গুড় হাতে দিতেই মেয়েটি মুহূর্তে মিলিয়ে যায়। ওই রাতেই ওই মুসলিম বিক্রেতা স্বপ্ন দেখেন স্বয়ং বড়মা, তার গুড় খাচ্ছে।
সেই থেকেই এই গ্রামে বড়মার পুজো মুসলিম সম্প্রদায়ের গুড় ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। তাই আজও কালী পূজোর সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক দিয়ে প্রতিটি মানুষকে গুড় খাওয়ানো হয় সবাই এই গুড় খেয়ে আনন্দে মেতে উঠেন সেই দিনটায়।
** টিন চুরির শাস্তি ও তালাহীন মন্দির: গ্রামবাসীদের মুখে আরেকটি কাহিনী শোনা যায়। তখন দেবীর থানটি ছিল টিনের চালার। এক বর্ষার রাতে এক ব্যক্তি সেই মন্দিরের টিন চুরি করে নিয়ে যায়। অলৌকিকভাবে, এর পরদিনই চোরের বাড়ির একই পরিবারের পাঁচজন সদস্যের আকস্মিক মৃত্যু হয় এবং তাদের বাড়ি থেকেই চুরি যাওয়া টিন উদ্ধার হয়। দেবীর এই জাগ্রত রূপের ভয়ে আজও মন্দিরে কোনো তালা দেওয়া হয় না।
** মানত পূরণ ও একাধিক প্রতিমা পুজো: ভক্তদের বিশ্বাস, এখানে নিষ্ঠাভরে কোনো মানত বা মানসিক করলে মা কাউকে খালি হাতে ফেরান না। মনস্কামনা পূরণ হলে পরের বছর ভক্তরা মায়ের উদ্দেশ্যে একটি করে কালী প্রতিমা উৎসর্গ করেন। এর ফলেই মূল প্রতিমা 'বড়মা'-র পাশে প্রতি বছর একসাথে ৩০-৩৩টি বা তারও বেশি মানতের কালী প্রতিমা একই মণ্ডপে পূজিত হতে দেখা যায়, যা এক বিরল দৃশ্য।
এই পুজোর প্রধান বিশেষত্ব ও সম্প্রীতির দিকগুলো ছিল:
** মুসলিম পরিবারের গুড়: এই পুজোর ভোগ ও নানা আচার-অনুষ্ঠানে একটি মুসলিম পরিবারের দেওয়া আখের গুড় ব্যবহার করার দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে, যা এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান মেলবন্ধনের প্রতীক।
** এক রাতেই প্রতিমা তৈরিতে থাকেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ: প্রচলিত লোকবিশ্বাস ও রীতি অনুযায়ী, এখানে প্রতিমা তৈরির কাজ থেকে শুরু করে নানা আয়োজনে গ্রামের উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে শামিল হন।
** সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: উৎসবের দিনগুলোতে ধর্মীয় বিভেদ ভুলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ সমান আনন্দে মেতে ওঠেন। প্রত্যেকে প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করেন,আনন্দ উৎসব করেন। ঋষিপুরের এই কালীপুজো কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে এক গ্রামীণ সার্বজনীন লোকউৎসব।