পেটের ভিতরে বিছে, গলায় নর মুণ্ডের মালা! কষ্টি পাথরের রহস্যময়ী মা পেট কাটি কালীর মাহাত্ম্য আজও অমলিন ময়নাগুড়িতে
তপন রায়,ময়নাগুড়ি
পেটের মধ্যে খোদাই করা বিছের অবয়ব, গলায় নর মুণ্ডের মালা, সারা শরীর জুড়ে সর্পা লংকার! কালী মূর্তি হলেও রূপ ও বৈশিষ্ট্যে একে বারেই ব্যতিক্রমী। কয়েকশো বছরের ইতিহাস, লোক বিশ্বাস আর নানা রহস্যকে ঘিরে আজও পূজিত হয়ে আসছেন ময়নাগুড়ির মা পেটকাটি কালী। স্থানীয়দের কাছে তিনি ধূমাবতী চণ্ডী রূপে বিশেষভাবে পরিচিত। কালী পুজোকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই এই প্রাচীন দেবী স্থানে ভক্তদের ঢল নামে।
ময়নাগুড়ি পৌর শহর থেকে মাত্র দু’কিলো মিটার দূরে পেট কাটি গ্রাম। বর্তমানে এলাকাটি ময়নাগুড়ি পৌর সভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত। কথিত রয়েছে, কয়েকশো বছর আগে সন্তেশ্বর রায় নামে এক স্থানীয় কৃষক জমিতে চাষ করার সময় লাঙলের ফালায় মাটির নীচে থাকা একটি পাথরের মূর্তির সন্ধান পান। প্রথমে মূর্তিটি উদ্ধার না করেই তিনি বাড়ি ফিরে যান। কিন্তু সেই রাতেই স্বপ্নাদেশ পান দেবীর। পরদিন স্থানীয় বাসিন্দাদের ডেকে মূর্তিটি উদ্ধার করা হয়। এরপর এলাকাবাসী একজোট হয়ে কমিটি গঠন করে শুরু করেন দেবীর পুজো। সেই থেকেই শুরু মা পেটকাটি কালীর আরাধনা। দেবীর নাম থেকেই ধীরে ধীরে এলাকার নাম হয় পেটকাটি।
প্রায় সাড়ে চার ফুট উচ্চতার এই দেবীমূর্তিটি কষ্টি পাথরে নির্মিত। দশভুজা দেবী পদ্মের উপর দণ্ডায়মান। স্থানীয়দের অনুমান, মাটি খুঁড়ে মূর্তিটি উদ্ধারের সময় দেবীর তিনটি হাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মূর্তির বাম দিকের হাতে রয়েছে হাতি, ঘণ্টা, ছিন্ন নরমুণ্ড-সহ একাধিক প্রতীকী অবয়ব। একটি হাতও ভাঙা অবস্থায় রয়েছে।তবে দেবী মূর্তির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য তাঁর পেটের অংশে। মূর্তির পেট কাটা এবং সেই অংশের মধ্যেই খোদাই করা রয়েছে একটি বিছের অবয়ব। গলায় নরমুণ্ডের মালা, শরীরজুড়ে সাপের অলংকার সব মিলিয়ে দেবীর এই অনন্য রূপ দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। এমন বৈশিষ্ট্যের কষ্টি পাথরের দেবী মূর্তি সচরাচর দেখা যায় না বলেই দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুণ্যার্থীদের বিশ্বাস, মা পেটকাটি অত্যন্ত জাগ্রত। তাই ময়নাগুড়ি ছাড়াও আশ পাশের বিভিন্ন এলাকা এবং দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা দেবীর কাছে পুজো দিতে আসেন। বিশেষ করে কালীপুজোর দিন ধূমাবতী চণ্ডী রূপে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভক্তিভরে দেবীর আরাধনা করা হয়। পুজোকে ঘিরে প্রতিবছরই পেটকাটি এলাকায় তৈরি হয় উৎসবের আবহ। দেবীর পুজোর পাশাপাশি আয়োজন করা হয় দু’দিনের আনন্দমেলার।
ভক্তদের সমাগম, পুজোর আচার-অনুষ্ঠান এবং মেলাকে কেন্দ্র করে উৎসবের রঙে সেজে ওঠে গোটা এলাকা। ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোককথা, রহস্যময় দেবীমূর্তি এবং কয়েকশো বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্য সব মিলিয়ে ময়নাগুড়ির মা পেটকাটি কালী আজও এক অনন্য আকর্ষণ। সময় বদলেছে, বদলেছে এলাকার পরিচিতি, কিন্তু বদলায়নি দেবীর প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও ভক্তি। কালীপুজো এলেই নতুন করে জেগে ওঠে পেটকাটি কালীর মাহাত্ম্য।