সুন্দরবনের যেন উৎসবের ছোঁয়া, পুজোর আগেই ফিরল কাজের ছন্দ। দীর্ঘদিনের নানা টালবাহানা শেষে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হিঙ্গলগঞ্জে ‘জি রাম জি’-র আওতায় শুরু হয়েছে ১২৫ দিনের কর্মসংস্থান। হাতে কাজ, ঘরে আয়, পুজোর মুখে সরকারের এই ভূমিকায় ফের নতুন করে আশার আলো দেখছেন প্রান্তিক এলাকার শ্রমজীবী মানুষজনেরা।
পুজোর আর কয়েকদিন বাকি, তার আদেই উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার হিঙ্গলগঞ্জের পশ্চিম মামুদপুর এলাকায় শুরু হয়েছে কাজ। কুনেখালি সুইজগেট থেকে গৌড়েশ্বর নদীর পাড় ধরে নিতাই মালির জলকর পর্যন্ত এলাকায় চলছে ‘জি রাম জি’-র আওতায় থাকা এই কর্মসূচির কাজ। বহুদিন পর হাতে কাজের সুযোগ ফিরে আসতেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত স্থানীয় প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষেরা।
হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এলাকার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাছে এই কর্মসংস্থান এখন পুজোর আগে সংসারে স্বস্তির বার্তা। কারও ঘরে পুজোর মরশুমে নতুন জামাকাপড়ের চিন্তা, কারও আবার সংসার চালাতে চাল-ডাল-তেল-নুনের জোগানের চিন্তা। পুজোর মুখে কাজের মজুরি মিললেই সেই দৈনন্দিন লড়াইয়ের কিছুটা ভার কমাবে বলেই আশা শ্রমিক পরিবারগুলোর।
এখানে কাজ করতে আসা শ্রমিক মহম্মদ কাদের শেখ জানালেন, “দীর্ঘদিন ১০০ দিনের কাজ না থাকায় সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। ধারদেনা বেড়ে গিয়েছে। এখন ফের কাজের সুযোগ মেলায় অন্তত পুজোর আগে হাতে কিছু টাকা আসবে। উৎসবের মরশুমে শ্রমিকদের মুখে এই হাসি যেন স্বস্তিতে রেখেছে গোটা পরিবারকে।”
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হিঙ্গলগঞ্জ লাকার শ্রমজীবী মানুষজনেরা
পরিবারের মুখে হাসি ফেরানোর মতো স্বস্তিটুকুই তো তাঁদের কাছে এই মুহুর্তে বড় কথা। মহম্মদ কাদের শেখের মতো স্থানীয় মুসলিম শ্রমিকদের কাছেও এই কর্মসংস্থান সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁদের মতে, “ঠিকমত হাতে কাজ থাকলে নিজের পরিশ্রমে সংসার চালানো যায়। পুজোর আগে কাজ শুরু হওয়ায় আমাদের মতো গরিব মানুষের অনেক অনেক উপকার হবে।” এক সংখ্যালঘু মহিলা শ্রমিক জানালেন, “অনেকদিন কাজের অপেক্ষায় দিন গুনছিলাম। পুজোর আগে কাজটা শুরু হওয়ায় খুব ভালো লাগছে। সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে কিছুটা সুবিধা হবে।”
প্রমীলা পালের গলাতেও একই সুর। তাঁর বক্তব্য, কাজ থাকলে সংসারের খরচ চালানোর মত চাপটা যে কতটা কমে যা তা আমারাই বুঝি। এই পরিশ্রমের টাকায় পুজোর সময় ছোট ছোট সন্তানদের জন্য কিছু কেনাকাটা করার সুযোগ পাব।
প্রত্যেকের আলাদা আলাদা অনুভূতির কথাগুলো শুনে মনে হয়, ধর্মের পরিচয় আলাদা হলেও প্রয়োজনের জায়গায় ছবিটা যেন একই। কাজ চাই, আয় চাই, আর দিন এনে দিন খাওয়া সংসারে স্বস্তি চাই। হিঙ্গলগঞ্জের এই কর্মযজ্ঞ অর্থ্যাৎ ১২৫ দিনের কাজের হিসাবটা বোধহয় তুলে ধরল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে একসঙ্গে থাকার ছবিটা।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হিঙ্গলগঞ্জ লাকার শ্রমজীবী মানুষজনেরা
বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের দাবি, ডবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে এই প্রথম এলাকায় ১২৫ দিনের কাজ শুরু হয়েছে। হিঙ্গলগঞ্জ পঞ্চায়েতের বিজেপি পঞ্চায়েত সদস্য অমিত মণ্ডলের দাবি, পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে কেন্দ্রের সঙ্গে হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ১০০ দিনের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই জটিলতা কাটিয়ে নতুন ব্যবস্থায় ফের কাজ শুরু হয়েছে বলে তাঁর দাবি। মণ্ডলের সহ-সভাপতি পার্থপ্রতিম জানার বক্তব্য, দীর্ঘদিন কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকার সমস্যা কাটিয়ে ওঠা গেছে। এবার নতুন করে কাজ শুরু হওয়ায় শ্রমজীবী পরিবারগুলি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
কুনেখালি সুইজগেট থেকে গৌড়েশ্বরের পাড়, কাজের জায়গায় এখন প্রতিটি শ্রমিকের মুখে চওড়া হাসি। কারও কাছে দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ মিলেছে। আনন্দ কি শুধু আলো, জামাকাপড় আর পুজোর মণ্ডপে? নাকি একজন শ্রমিকের হাতে কাজ আর তাঁর পরিবারের মুখে নিশ্চিন্ত হাসিই আসল উৎসব? সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় গেলে এই প্রশ্নের উত্তরটা সহজে মিলে যাবে। কাজ থাকুক, ঘরে আয় থাকুক, সবাই মিলে ভালো থাকুক, তাহলেই তো মিলবে সত্যিকারের পুজোর আনন্দ।