গুয়াহাটীর বিষ্ণুপুরে ব্যতিক্রমী ‘নাগলোক’, নৌকায় চড়ে দর্শন করতে হবে মা দুর্গাকে
Story by Ariful Islam | Posted by Aparna Das • 18 h ago
গুয়াহাটীর বিষ্ণুপুরে ব্যতিক্রমী ‘নাগলোক’, নৌকায় চড়ে দর্শন করতে হবে মা দুর্গাকে
আরিফুল ইসলাম ও অপর্ণা দাস / গুয়াহাটি
আজ মহাষষ্ঠী। দেবী দুর্গার বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ-উৎসব। চারদিকে এখন শুধুই পুজোর উচ্ছ্বাস আর উৎসবের আমেজ। প্রতি বছরের মতো এবারও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে গুয়াহাটি মহানগরের বিভিন্ন পুজো কমিটি সাজিয়ে তুলছে দৃষ্টিনন্দন ও বিশালাকার মণ্ডপ। আর এ বারও গুয়াহাটির দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে চলেছে বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো সমিতি। এ বছরের পুজোয় তাদের বিশেষ আকর্ষণ ‘নাগলোক’। জলের মাঝে গড়ে তোলা হচ্ছে এই নাগলোক। নৌকায় চড়ে দর্শনার্থীরা উপভোগ করতে পারবেন এই অভিনব আয়োজন। তবে চাইলে সেতু বা ঝুলন্ত পথের মাধ্যমেও পুজোপ্রেমীরা নাগলোক দর্শন করতে পারবেন।
বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির এই বিশেষ মণ্ডপ নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছেন বিশিষ্ট ভাস্কর্যশিল্পী পদ্মশ্রী নুরউদ্দিন আহমেদ। তাঁর ছেলে দ্বীপ আহমেদ সরাসরি পুজোর মণ্ডপ নির্মাণের কাজ তদারকি করছেন। ব্যতিক্রমী ভাবনা ও অভিনব উপস্থাপনার মাধ্যমে এবার দর্শনার্থীদের বিশেষ অভিজ্ঞতা দিতে প্রস্তুত বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো সমিতি।
বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির পূজো মণ্ডপের একটি ছবি
৭৬ বছরে পা দেওয়া এই পুজো এ বছর মহারজত জয়ন্তী উদ্যাপন করছে। এবারের পুজোর বাজেট প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা। পুজোর মূল আকর্ষণ নাগলোক নির্মাণে মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। প্রতি বছর পুজোর দিনগুলিতে এই পুজোমণ্ডপে লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীর সমাগম হয়। এবারই প্রথম দর্শনার্থীদের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করেছে বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো সমিতি। বিপুল জনসমাগমের কথা মাথায় রেখে দর্শনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সাধারণ লাইনের পাশাপাশি টিকিট সংগ্রহ করা দর্শনার্থীদের জন্য থাকবে পৃথক লাইন। ইতিমধ্যেই ‘বুক মাই শো’-এর মাধ্যমে টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে এবং যথেষ্ট সংখ্যক টিকিট বিক্রিও হয়েছে। টিকিটের মূল্য ১৯৯ টাকা। টিকিটধারীদের জন্য থাকবে আলাদা লাইনের ব্যবস্থা।
'আওয়াজ-দ্য ভয়েস'-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক দেবাশিস দাস বলেন, “আমাদের পুজো কমিটির পক্ষ থেকে "বুক মাই শো"র মাধ্যমে যে টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা বাধ্যতামূলক নয়। কেউ চাইলে নিজের ইচ্ছায় টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন। দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখেই এই ব্যবস্থা করতে হয়েছে। যাঁরা ভিড়ের মধ্যে যেতে চান না, প্রবীণ নাগরিক, মহিলা এবং যাঁরা বহু দূর থেকে আসেন ও যাঁদের হাতে সময় কম, তাঁদের সুবিধার জন্যই এই উদ্যোগ। এর পিছনে আমাদের কোনও বাণিজ্যিকীকরণের উদ্দেশ্য নেই।”
ভাস্কর্যশিল্পী দ্বীপ আহমেদ এবং বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক দেবাশিস দাস
৭৬ বছরে পা রাখা বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো সমিতি এবার মহারজত জয়ন্তী উপলক্ষে একাধিক বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পুজোর দিনগুলিতে দরিদ্র মানুষের মধ্যে বস্ত্র বিতরণের পাশাপাশি গুয়াহাটির বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পালন করবে পুজো কমিটি। এ প্রসঙ্গে সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেবাশিস দাস বলেন, “বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আমাদের মণ্ডপের উদ্বোধন হবে। তার পর থেকেই শুরু হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যা নবমী পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের জন্য ভোগের ব্যবস্থা থাকবে। সপ্তমীর দিন দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ করা হবে। অষ্টমীর দিন হবে কুমারীপুজো। পাশাপাশি, পুজো শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণ করা হবে।”
দর্শনার্থীদের সমাগম প্রসঙ্গে দেবাশিস দাস জানান, গত কয়েক বছরে তাঁদের পুজোমণ্ডপে প্রতিদিন প্রায় দেড় লক্ষ মানুষের সমাগম হয়েছে। এবার প্রতিদিন প্রায় দুই লক্ষ দর্শনার্থীর সমাগম হতে পারে বলে আশা করছে পুজো কমিটি। পাশাপাশি, অনলাইনের মাধ্যমেও প্রতিদিন হাজারেরও বেশি মানুষ পুজো দর্শন করবেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।এবারের পুজোর অন্যতম আকর্ষণ ‘নাগলোক’ দর্শনের জন্য জলে ৭–৮টি নৌকা চালানোর ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি নৌকায় একসঙ্গে ১০ থেকে ১২ জন দর্শনার্থী উঠতে পারবেন। ফলে নৌকায় চড়ে নাগলোক দর্শনের অভিনব অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে পারবেন পুজোপ্রেমীরা।
পূজো মণ্ডপের ভেতরে মা দুর্গার প্রতিমূর্তি
পুজোমণ্ডপে ভিড় বেশি হওয়ায় নৌকায় চড়ে নাগলোক দেখতে গেলে কিছুটা অপেক্ষা করতে হতে পারে। টিকিট না কেটেও নৌকায় চড়ে নাগলোক দর্শনের সুযোগ থাকবে। তবে সেই সুযোগ কতটা পাওয়া যাবে, তা ভিড়ের উপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক দেবাশিস দাস। তিনি আরও জানান, এবার মা দুর্গার প্রতিমা মাটি দিয়ে তৈরি করা হবে। নাগলোকের গুহার চারপাশে থাকবে আড়াই ফুট পর্যন্ত জল। সেই জলেই চলবে নৌকা। নৌকাগুলি তৈরি করা হবে লোহার কাঠামো দিয়ে এবং সেগুলি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে চলবে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি নৌকা তৈরিতে এক লক্ষ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে।
নাগলোক নির্মাণের ভাবনা প্রসঙ্গে শিল্পী দ্বীপ আহমেদ বলেন, “নাগলোক সম্পর্কে আমরা সকলেই জানি। কিন্তু এ ভাবে তা আগে তুলে ধরা হয়নি। পৃথিবী সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই নাগলোকের অস্তিত্বের কথা বলা হয়। আমরা এই পুজোমণ্ডপে নাগলোকের একটি অংশ তুলে ধরতে চাইছি। বাসুকী, শেষনাগ ও কালীয়ের মতো পৌরাণিক কাহিনির বিভিন্ন অংশ এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
পূজো মণ্ডপের ভেতরের দৃশ্য
তিনি আরও জানান, "গুহার ভিতরে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যা সাধারণত মানুষের চোখে পড়ে না। সমুদ্র মন্থন এবং কালীয়দমনের মতো পৌরাণিক কাহিনিও এই মণ্ডপে তুলে ধরা হবে। বাইরে থেকে নাগলোকের একটি বিশেষ দৃশ্য দেখা যাবে। নাগলোকের চারপাশে থাকবে জল, আর নৌকায় চড়ে তার ভিতরে প্রবেশ করে দর্শনার্থীরা উপভোগ করতে পারবেন এই অভিনব আয়োজন।"
নাগলোকের পরিবেশকে বাস্তবসম্মত করে তুলতে প্রায় ৫ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে জলাশয় তৈরি করা হচ্ছে। নৌকায় চড়ে নাগলোক দর্শনের পাশাপাশি সেতুর উপর দিয়েও মণ্ডপের এই বিশেষ আকর্ষণ উপভোগ করতে পারবেন দর্শনার্থীরা। গুহার ভিতরে মণি-মুক্তায় সমৃদ্ধ পাতাললোকের এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের আশা, জলের মাঝে পাতাললোকের এই অভিনব রূপ দর্শনার্থীদের বিশেষ অভিজ্ঞতা দেবে। গুহার ভিতরে দিনের পরিবেশ ও রাতের পরিবেশের মধ্যে থাকবে যথেষ্ট পার্থক্য। সেখানে না গেলে এই বৈচিত্র্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছেন শিল্পী।
বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটির পূজো মণ্ডপের একটি ছবি
মহারজত জয়ন্তী উপলক্ষে পুজোর প্রতিটি আয়োজনকে ব্যতিক্রমী করে তোলার পরিকল্পনা করেছিল পুজো কমিটি। সেই ভাবনা থেকেই নাগলোকের ভিতরে হেঁটে ঘোরার পরিবর্তে নৌকায় চড়ে দর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দ্বীপ আহমেদ বলেন, “প্রায় দু’মাস ধরে আমরা এখানে কাজ করছি। ইতিমধ্যেই প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে।”
একটি নির্দিষ্ট ভাবনাকে কেন্দ্র করে বিশাল পুজোমণ্ডপ তৈরি করতে শিল্পীদের যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়। পাশাপাশি, বিষয়টি নিয়ে গভীর গবেষণারও প্রয়োজন হয়। দ্বীপ আহমেদের কথায়, “অনেক গবেষণা করতে হয়। চাইলেই কোনও কিছু মণ্ডপে তুলে দেওয়া যায় না। আমাদের পুজো দেখতে অনেক জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ মানুষ আসেন। মণ্ডপে কোনও ভুল থাকলে তাঁদের নজরে পড়বেই। তাই যতটা সম্ভব পড়াশোনা ও গবেষণা করে বিষয়টিকে সঠিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করি।”
মণ্ডপের ভেতরে গরুড়ের একটি মূর্তি
নাগলোককে পৌরাণিক কাহিনি অনুয়ায়ী পাতাললোকের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। তাই মণ্ডপে কাদা-মাটি বা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখানোর পরিবর্তে মণি-মুক্তায় ভরা এক সমৃদ্ধ রাজ্যের ছবি তুলে ধরা হচ্ছে। শিল্পীর ব্যাখ্যা, নাগলোকের সঙ্গে মণি-মুক্তা সুরক্ষিত রাখার যে পৌরাণিক ধারণা জড়িয়ে রয়েছে, সেই ভাবনাকেই মণ্ডপের নকশায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রতি বছরই বিষ্ণুপুর বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলের ময়দানে আয়োজিত হয় বিষ্ণুপুর সার্বজনীন দুর্গাপুজো। এবারও সেখানে তৈরি হচ্ছে বিশাল পুজোমণ্ডপ। প্রায় দু’মাস ধরে ৬০–৭০ জন কর্মী মণ্ডপ নির্মাণের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। নাগলোকের মতো অভিনব ভাবনাকে বাস্তবে ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের নির্মাণসামগ্রী ও আধুনিক প্রযুক্তি। এ প্রসঙ্গে দ্বীপ আহমেদ বলেন, “অনেক সামগ্রী এখানে পাওয়া যায় না। যেমন, নৌকার মোটর এখানে উপলব্ধ না হওয়ায় বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন ধরনের নির্মাণসামগ্রী, প্লাস্টার, সিমেন্ট ও লোহা ব্যবহার করা হচ্ছে। জলপ্রতিরোধ করার জন্য প্রচুর রাসায়নিকও ব্যবহার করতে হচ্ছে।”
একজন শিল্পীর কাছে দর্শকদের প্রশংসাই যে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, সে কথাও তুলে ধরেন দ্বীপ আহমেদ। তাঁর কথায়, “মানুষ যখন আমাদের কাজ দেখে ভালো বলেন, প্রশংসা করেন, তখনই সবচেয়ে ভালো লাগে। আমি মনে করি, মানুষের এই স্বীকৃতিই একজন শিল্পীর সাফল্য। দু’মাস ধরে ধাপে ধাপে যে কাজ আমরা করে যাই, তা সম্পূর্ণ হওয়ার পর সাধারণ মানুষ যখন তার প্রশংসা করেন, তখনই আমাদের পরিশ্রম সার্থক বলে মনে হয়।”
উল্লেখ্য, বিশিষ্ট ভাস্কর্যশিল্পী পদ্মশ্রী নুরউদ্দিন আহমেদ ও তাঁর ছেলে দ্বীপ আহমেদ এবার দুর্গাপুজো উপলক্ষে দুটি বিশাল মণ্ডপ নির্মাণের কাজ করছেন। পাশাপাশি, তাঁদের অন্যান্য কাজও সমানতালে চলছে। গুয়াহাটির নবগ্রহ মন্দির, দুর্গামন্দির এবং শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের জন্মস্থান বটদ্রবা থানের কাজেও তাঁরা যুক্ত রয়েছেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পাশাপাশি দুর্গাপুজোর মণ্ডপ নির্মাণের কাজ সামলাচ্ছেন তাঁরা।