গণেশ-কার্তিকহীন দুর্গাপ্রতিমা, ২৫৬ বছরের ঐতিহ্য! অসমের হাইলাকান্দির পুরকায়স্থ বাড়িতে আজও অটুট বনেদিয়ানা

Story by  Satananda Bhattacharjee | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
গণেশ-কার্তিকহীন দুর্গাপ্রতিমা, ২৫৬ বছরের ঐতিহ্য! অসমের হাইলাকান্দির পুরকায়স্থ বাড়িতে আজও অটুট বনেদিয়ানা
গণেশ-কার্তিকহীন দুর্গাপ্রতিমা, ২৫৬ বছরের ঐতিহ্য! অসমের হাইলাকান্দির পুরকায়স্থ বাড়িতে আজও অটুট বনেদিয়ানা
 
শতানন্দ ভট্টাচার্য

বাঙালির প্রধান উৎসব দুর্গোৎসব। সারা বছরের অপেক্ষার পর শরতের এই সময়ে মানুষ উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে উঠেন। পৌরাণিক কাহিনী ও 'শ্রীশ্রী চণ্ডী' (মার্কণ্ডেয় পুরাণ) অনুসারে, বিশ্বের প্রথম দুর্গাপূজা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার কাঁকসা ব্লকের গড় জঙ্গল-এ অবস্থিত ঋষি মেধসের আশ্রমে। পুজো করেছিলেন রাজা সুরথ। যদিও সেটি ছিল বাসন্তী পূজা। 
 
দক্ষিণ অসমের বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দিতে বহু বছর আগে দেবী দুর্গার পূজা শুরু হয়েছিল। তবে, এমন নয় যে সেই ঐতিহ্য এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। জমিদারী নেই, কিন্তু রাজপাট না থাকলেও, প্রায় ২৫৬ বছরের ঐতিহ্য মেনে এবারও হাইলাকান্দি শহর সংলগ্ন রাঙ্গাউটি গ্রামের পুরকায়স্থ বাড়িতে শঙ্খধ্বনি হচ্ছে। এই দুর্গাপূজাকে জেলার প্রাচীনতম বলে মনে করা হয়। সঠিক বছরের হিসেব একেকজনের কাছে একেকরকম। ওই বাড়িরই একজন গৃহবধূ রিঙ্কু পুরকায়স্থর ভাষ্য মতে আনুমানিক চারশো বছর আগে তাঁদের পুজো শুরু হয়েছিল। তিনি এটাও দাবি করেন যে উত্তরপূর্ব ভারতের এটাই নাকি প্রথম দুর্গা পুজো। 
 

হিসেবের খাতিরে যাইহোক পুজোর বয়স, পুরকায়স্থ পরিবারের বর্তমান প্রজন্মও  এই ঐতিহ্যকে একইভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রস্তুত। এখনও হাইলাকান্দির বেশ কয়েকটি বনেদি বাড়িতে পবিত্রতা বজায় রেখে মাতৃদেবী দুর্গার পূজা করা হয়। এমনই একটি বনেদি জমিদার বাড়ি হলো  রাঙ্গাউটি গ্রামের পুরকায়স্থ বাড়ি। 
 
তাঁরা আর্থিকভাবে সচ্ছল না হলেও পূজা চালিয়ে যাচ্ছেন। পঞ্চাশ বছর আগেও রাঙ্গাউটির পুরকায়স্থ বাড়িতে পূজা জাঁকজমকের সাথে করা হতো। তবে, এখনও পুরকায়স্থ পরিবারের মহিলারা সেই ঐতিহ্য ও আন্তরিকতা বজায় রেখেছেন। যদিও দীর্ঘ বছরের পুরোনো এই পূজা ততটা জাঁকজমকপূর্ণ নয়, তবুও পুরকায়স্থ বাড়ির সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা চার দিন ধরে আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দিত হন। তাঁরা অন্তর থেকে আন্তরিকভাবে মা দুর্গাকে আহ্বান করেন।
 
হাইলাকান্দির পুরকায়স্থ বাড়ি
 
আগে পূজার এই চার দিন যাত্রা এবং অন্যান্য সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে কাটানো হতো। এখন, যদিও এগুলি অনুষ্ঠিত হয় না, তবুও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই পরিবারের মাটির মায়ের পূজা প্রাচীনকাল থেকেই শাক্ত রীতিতে করা হয়ে আসছে।
 
বর্তমান প্রজন্মের একজন সদস্য গুরুদাস পুরকায়স্থ বলেন যে, এই পূজা শুরু করেছিলেন কাছাড়ি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। পরে রাজা পূজার দায়িত্ব মাসাই ঠাকুরের হাতে তুলে দেন। তিনি ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্রের রাজপুরোহিত। বাড়িটিতে এখনও শত শত সাল পুরোনো নারায়ণ মন্দিরের দেওয়ালের অবশেষ বিদ্যমান। 
 
পুরকায়স্থ পরিবারের অন্যতম বংশধর কমলজ্যোতি পুরকায়স্থ জানান, তাঁদের আদি নিবাস ছিল পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ) শ্রীহট্ট জেলার বলিসিরা অঞ্চলের সাতগাঁওতে। সেখান থেকে তাঁদের পূর্বপুরুষ মাসাই ঠাকুর অসমের বরাক উপত্যকার বন্দুকমারা অঞ্চলের মুরখারগুল গ্রামে চলে যান এবং পরে রাঙ্গাউটি গ্রামে বসবাস শুরু করেন। মাসাই ঠাকুর কাছাড়ি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজপুরোহিত থাকার সময় প্রায় ১৭৭০ সালে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মাসাই ঠাকুরকে 'পুরকায়স্থ' উপাধি প্রদান করেন। কিন্তু এই উপাধি পাওয়ার প্রায় ৩০ বছর আগেই মাসাই ঠাকুর পুরকায়স্থ পরিবারে দুর্গাপূজা করতে শুরু করেছিলেন বলে জানা যায়।
 
হাইলাকান্দির পুরকায়স্থ বাড়ির গণেশ-কার্তিকহীন দুর্গাপ্রতিমা
 
এই পূজার বিশেষত্ব হল দেবী দুর্গার প্রতিমায় গণেশ ও কার্তিকের অনুপস্থিত এবং এর কারণ তাঁদের কাছে আজও অজানা। একজনের মতে স্বপ্নে যেরকম মা দুর্গার কাঠামোকে দেখেছিলেন ঠিক সেরকমই প্রতিমা গড়ে পুজো আরম্ভ হয়।স্বপ্নে কার্তিক আর গণেশকে মায়ের কাঠামোতে দেখতে পাননি। পরিবারের অন্য এক সদস্য মহাশ্বেতা পুরকায়স্থ জানান কিভাবে মাকে ভোগ দেওয়া হয় এবং বলেন যে বাড়ির পুকুর থেকে মাছ ধরে মাকে ভোগ দেওয়া হয়।
 
যদিও বর্তমানে পূজা ততটা জাঁকজমকপূর্ণ নয়, এই পরিবারটি ভক্তি ও ঐতিহ্য মেনে মায়ের আরাধনা করে চলেছে। পুরকায়স্থ পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি রাঙ্গাউটি গ্রামের বিস্তৃত এলাকা থেকেও লোকজন এই পূজায় অংশগ্রহণ করেন। আগে ভিড় অনেক বেশি থাকতো, কিন্তু আজকাল তা কিছুটা কমে গেছে। বিজয়া দশমীর দিন বাড়ির পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন করা হয় রীতিনীতি মেনে।


শেহতীয়া খবৰ