ট্রিপল তালাকের বিরুদ্ধে মুসলিম নারীদের কণ্ঠস্বর জাকিয়া সোমান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 3 d ago
জাকিয়া সোমান
জাকিয়া সোমান
 
মৃদগন্ধা দীক্ষিত / পুনে

নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করে মুসলিম নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছেন জাকিয়া সোমান। ধর্মের পুরুষতান্ত্রিক ও সুবিধাবাদী ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করে তিনি কোরআন এবং ভারতের সংবিধান, এই দুই ভিত্তির ওপর সমতা ও ন্যায়বিচারের নতুন বয়ান নির্মাণ করেছেন। ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন (BMMA)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ট্রিপল তালাকের বিরুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন মুসলিম নারীদের অধিকার রক্ষার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাঁর জীবনই প্রমাণ করে, "Personal is Political", এই নারীবাদী দর্শন কেবল একটি তত্ত্ব নয়, বরং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত এক সত্য।
 
একজন নারীর জীবনে ঝড় নেমে এসে সবকিছু তছনছ করে দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু সেই ঝড়কেই নিজের শক্তিতে পরিণত করে, হাজার হাজার নারীর জীবনের অন্ধকার দূর করার সংকল্প নিয়ে সংগ্রামের ময়দানে নামা মোটেই সহজ নয়। জাকিয়া সোমান সেই সাহসী ব্যক্তিত্ব, যিনি ঠিক এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলনের (BMMA) সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি আজ দেশে মুসলিম নারীদের অধিকার নিয়ে এক নতুন ইতিহাস রচনা করছেন।
 
জাকিয়া সোমান
 
জাকিয়া সোমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা গুজরাটে। তিনি একটি অত্যন্ত শিক্ষিত ও প্রগতিশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একটি কলেজের অধ্যক্ষ এবং মা ছিলেন একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর ঠাকুমা ছিলেন তাঁদের তালুকের প্রথম মহিলা যিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
 
এমন প্রগতিশীল পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা জাকিয়া ২১ বছর বয়সে প্রেম করে বিয়ে করেন। তাঁর স্বামীও ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু বিয়ের পর তিনি উপলব্ধি করেন, শিক্ষিত হওয়া আর সংস্কৃতিবান হওয়া এক বিষয় নয়। একদিকে তিনি গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ একটি কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছিলেন, অন্যদিকে নিজের ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে তাঁকে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছিল।
 
কিন্তু যেহেতু এটি ছিল প্রেমের বিয়ে, তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সমস্ত দায়িত্ব যেন তাঁরই, এমন এক সামাজিক চাপ তিনি অনুভব করতেন। সেই প্রবল মানসিক চাপে তিনি টানা ষোলো বছর ধরে এই নির্যাতন সহ্য করেন। তাঁর ১৪ বছর বয়সী ছেলেও এই কঠিন পরিস্থিতির সাক্ষী ছিল।
 
জাকিয়ার জীবনের প্রকৃত মোড় ঘুরে যায় ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার সময়। তার আগে তিনি কোনও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি আহমেদাবাদের একটি ত্রাণশিবিরে যেতে শুরু করেন। সেখানে গিয়ে তিনি যে পরিস্থিতি দেখেন, তা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মানুষের ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, পরিবারগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। তবুও সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মুসলিম নারীদের অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা ও ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাঁকে নিজের জীবন নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
 
একটি সভায় জাকিয়া সোমান
 
সেখানেই জাকিয়া উপলব্ধি করেন, বিশেষ করে দরিদ্র মুসলিমদের জীবন কতটা অসহায়। ত্রাণশিবিরে থাকা সাধারণ নারীদের, যাঁদের অনেকেই সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণির বেশি পড়াশোনা করেননি, নিজেদের ভেঙে পড়া জীবন নতুন করে গড়ে তুলতে দেখে তিনি নিজের জীবন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। তিনি ভাবেন, "আমার শিক্ষা আছে, আর্থিক স্বাধীনতা আছে, তাহলে আমি কেন এই নির্যাতন সহ্য করে চলেছি?" ত্রাণশিবিরের সেই নারীরাই অজান্তে তাঁকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। এরপর ২০০৩ সালে তিনি সেই নির্যাতনমূলক বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন।
 
নিজের জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার আগুনে পরিশুদ্ধ হয়ে জাকিয়া সিদ্ধান্ত নেন, জীবনের বাকি সময় তিনি মুসলিম নারীদের অধিকার রক্ষার কাজেই উৎসর্গ করবেন। এরপর মুম্বই তাঁর কাজের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে তিনি নূরজাহান সাফিয়া নিয়াজের সঙ্গে মিলে ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন (BMMA) প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবেই তাঁর জীবনে "Personal is Political" নারীবাদী দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।
 
জাকিয়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, "মুসলিম নারীরা ন্যায়বিচার চান, আর সেই ন্যায়বিচার পেতে তাঁদের ধর্ম ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই।" তাই তিনি মুসলিম নারীদের অধিকারকে কোরআন এবং ভারতের সংবিধান, এই দুই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেন। বর্তমানে BMMA দেশের ১৫টিরও বেশি রাজ্যে বিস্তৃত হয়েছে এবং এক লক্ষেরও বেশি মুসলিম নারী এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। জাকিয়ার ভাষায়, "অন্যায় কী, দারিদ্র্য কী এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে কীভাবে দাঁড়াতে হয়, এসব আমি কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিখিনি; চল্লিশ বছর বয়সে এই নারীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়েই শিখেছি।"
 
BMMA-র ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তাৎক্ষণিক ট্রিপল তালাক বা জুবানি তালাকের বিরুদ্ধে তাদের ঐতিহাসিক লড়াই। তারা প্রমাণ করে যে ট্রিপল তালাক শুধু কোরআনবিরোধী নয়, এটি মানবাধিকারেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
 
জাকিয়া সোমান
 
এই আন্দোলনের মাধ্যমে তারা গোটা বিশ্বের সামনে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে যে মুসলিম নারীরাও এই দেশের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। BMMA-র দাবি ছিল, "আমরা ন্যায়বিচার চাই, আর তা চাই কোরআন ও সংবিধান, উভয়ের আলোয়।" এই দাবির সমর্থনে তারা ৫০ হাজার নারীর স্বাক্ষর সংগ্রহ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানায়। ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট তাৎক্ষণিক ট্রিপল তালাককে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে। সেই ঐতিহাসিক রায়ের প্রায় দশ বছর পর জাকিয়ার পর্যবেক্ষণ, বর্তমানে ভারতে মৌখিক ট্রিপল তালাকের প্রথা প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
 
আজ ব্যক্তিগত জীবনেও জাকিয়া সোমান সুখী। তিনি পরে কর্পোরেট জগতের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা মি. সোমানকে বিয়ে করেন। তাঁর স্বামী, ছেলে, পুত্রবধূ এবং সৎকন্যা, সবাই তাঁর সামাজিক কাজের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে পাশে রয়েছেন।
 
সামাজিক কাজের অভিজ্ঞতার মতোই কোরআন ও ধর্ম নিয়ে জাকিয়া সোমানের অধ্যয়নও অত্যন্ত গভীর।তিনি মনে করেন, যদি ইসলাম ধর্মের ব্যাখ্যা কেবল পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও পুরুষ-প্রধান সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে করা হয়, তাহলে সেই ব্যাখ্যা স্বাভাবিকভাবেই পুরুষদের পক্ষে যাবে। কিন্তু লিঙ্গসমতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোরআন পাঠ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে আল্লাহ নারী ও পুরুষকে সমান মর্যাদা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন।
 
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, "ন্যায়বিচার ও সমতা ইসলামের মূল ভিত্তি। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুরুষরা নিজেদের সুবিধামতো ধর্মের ব্যাখ্যা করেছেন। আল্লাহ আদম ও হাওয়াকে একই সময়ে এবং সমান অধিকার নিয়ে সৃষ্টি করেছেন।" তিনি আরও বলেন, কোরআনে ব্যবহৃত 'জওজ' (Zauj) শব্দটির অর্থই হলো 'জোড়া' বা 'যুগল', যা নারী-পুরুষের পূর্ণ সমতার প্রতীক।
 
জাকিয়া সোমান
 
নারীদের ওপর অত্যাচারের ঘটনায় আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করছেন। তাঁর সংগঠন হাজি আলি দরগায় নারীদের প্রবেশাধিকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ লড়াই করেছে। একই সঙ্গে নারীদের কাজি হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে। মুসলিম পারিবারিক আইনের সংস্কারের পক্ষেও তিনি জোরালোভাবে মত দেন। তাঁর সংগঠন একদিকে যেমন আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতেও সমানভাবে কাজ করছে।
 
জাকিয়া বিশ্বাস করেন, একজন মানুষের পরিচয় শুধু তার ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কথায়, "আমি একজন মুসলিম, কিন্তু তার পাশাপাশি আমি একজন মা, একজন নারী; হয়তো আমি একজন চিত্রশিল্পী কিংবা যোগব্যায়াম অনুশীলনকারীও।" তাঁর এই উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর সমগ্র কাজের মধ্যেই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
 
দেশে ক্রমবর্ধমান ঘৃণার রাজনীতি এবং বৈচিত্র্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বলেন, "আমাদের দেশের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের। আমাদের এই মিলিত সংস্কৃতির কারণেই দেশ আজও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। বৈচিত্র্যই ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। আজকের রাজনীতি এই বৈচিত্র্যকেই ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং নির্বুদ্ধিতার পরিচয়।"