নীরবতার দেয়াল ভেঙে মুসলিম নারীদের ন্যায়বিচারের পথ গড়ে চলেছে শরিফা খানমের ‘উইমেন্স জামাত’

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
ডি. শরিফা খানম
ডি. শরিফা খানম
 
আওয়াজ দ্য ভয়েস / নয়াদিল্লি

তামিলনাড়ুর পুদুক্কোট্টাইয়ে প্রতি মাসে এমন একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মুসলিম নারীরা নির্ভয়ে নিজেদের জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পরিত্যাগ, গার্হস্থ্য হিংসা, একতরফা তালাক, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া কিংবা দীর্ঘদিনের নীরব যন্ত্রণা, এমন নানা সমস্যার কথা তাঁরা জানান এই মঞ্চে। পুরুষ-প্রধান সালিশি ব্যবস্থার পরিবর্তে এখানে তাঁদের কথা শোনেন এমন নারীরাই, যাঁরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেন, আইনি সহায়তা ও কাউন্সেলিংয়ের পথ দেখান এবং আত্মমর্যাদা ফিরে পেতে পাশে দাঁড়ান। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন সমাজকর্মী ডি. শরিফা খানম, যাঁর চার দশকের নিরলস প্রচেষ্টা হাজার হাজার মুসলিম নারীর জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।
 
এই মঞ্চ, তামিলনাড়ু মুসলিম উইমেন্স জামাত কমিটি, গড়ে উঠেছে এক নারীর অদম্য সংকল্পের ফলস্বরূপ। তিনি হলেন ডি. শরিফা খানম, একজন সমাজকর্মী, যাঁর চার দশকের নিরলস কাজ হাজার হাজার মুসলিম নারীর জীবনে পরিবর্তন এনে দিয়েছে। শরিফা খানমের কাছে ন্যায়বিচারের লড়াই সমাজকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করার মাধ্যমে শুরু হয়নি; এর সূচনা হয়েছিল সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে।
 
আলোচনা সভায় ডি. শরিফা খানমের বক্তব্য রাখার একটি মুহূর্ত
 
তামিলনাড়ুর একটি গ্রামের বড় পরিবারে জন্ম নেওয়া শরিফা ছিলেন দশ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তাঁর মা ছিলেন একটি উর্দু বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। স্বামীর থেকে আলাদা হওয়ার পর তিনি একাই সন্তানদের বড় করে তোলেন। রক্ষণশীল সামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা বহু মেয়ের মতো শরিফাও একসময় পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বকে জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবেই মেনে নিয়েছিলেন। পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করার বিষয় হিসেবে নয়, বরং জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলেই তিনি দেখতেন। শিক্ষাই ধীরে ধীরে তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।
 
তাঁর এক বড় ভাই, যিনি পরে আইআইটি কানপুরে পড়াশোনা করেন, শরিফার উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে উৎসাহিত করেন এবং তাঁকে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে সাহায্য করেন। একটি ছোট গ্রাম থেকে দেশের অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর সামনে নতুন চিন্তা, নতুন অভিজ্ঞতা এবং বিস্তৃত সামাজিক আলোচনার জগৎ খুলে দেয়। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় স্নাতক হওয়ার পরের একটি ঘটনা।
 
আশির দশকের শেষদিকে পাটনায় অনুষ্ঠিত এক নারী সম্মেলনে শরিফা খানম অনুবাদক হিসেবে কাজ করেন। তিনি সারা দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিদের জন্য হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় হওয়া আলোচনা তামিলে অনুবাদ করতেন। অসংখ্য নারীর অভিজ্ঞতা শুনে তিনি উপলব্ধি করেন, নারীদের দুর্ভোগ কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল, ধর্ম বা সামাজিক শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভাষা ভিন্ন হলেও গল্পগুলো ছিল একই, ঘরের ভেতরের সহিংসতা, অসম সুযোগ, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া। এই অভিজ্ঞতা নারীদের জীবন সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধিকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
 
পরবর্তী বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে শরিফা বলেছেন, একসময় তিনি নিজেকে সিন্ডারেলার মতো ভাবতেন, যেন কোনো পরীর আগমনের অপেক্ষায় আছেন, যিনি এসে সব সমস্যার সমাধান করবেন। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, এমন কোনো উদ্ধারকর্তা আসবেন না। পরিবর্তন আনতে হলে নারীদেরই নিজেদের এবং একে অপরের রক্ষক হতে হবে। পুদুক্কোট্টাইয়ে ফিরে তিনি ছোট পরিসর থেকেই কাজ শুরু করেন।
 
ব্যক্তিগত টিউশন পড়িয়ে এবং শাড়ি বিক্রি করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি কয়েকজন নারীকে একত্রিত করেন। তাঁদের সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খোঁজা থেকেই শুরু হয় উদ্যোগটি। ধীরে ধীরে সেই অনানুষ্ঠানিক প্রচেষ্টা একটি সুসংগঠিত আন্দোলনের রূপ নেয়।
 
ডি. শরিফা খানম সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করছেন, এমন একটি মুহূর্ত
 
১৯৮৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্টেপস উইমেন্স ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (STEPS Women's Development Organisation)। এই সংস্থা গার্হস্থ্য হিংসা, বিবাহবিচ্ছেদ, পরিত্যাগ, দারিদ্র্য এবং সামাজিক বঞ্চনার শিকার নারীদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করে। প্রথমদিকে পরিবারে কাউন্সেলিং এবং বিরোধ মীমাংসার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরে এর কার্যক্রম আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সংস্থার কাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করে জেলা প্রশাসন তাদের একটি স্থায়ী কার্যালয় গড়ে তোলার জন্য জমি বরাদ্দ করে।
 
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নারীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শরিফা জানান, তিনি খুব কমই নিজেকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দেখেছেন। তবে প্রতিবেশী অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনাগুলি তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। বিশেষ করে মুসলিম পরিবার এবং নারীদের নিরাপত্তাহীনতা তাঁকে উপলব্ধি করায় যে, মূলধারার বহু নারী সংগঠন এই সমস্যাগুলি নিয়ে কাজ করতে অনীহা দেখায়।
 
এরপর তিনি প্রচলিত জামাত ব্যবস্থার কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। মসজিদ-সংযুক্ত এই কমিউনিটি সংস্থাগুলি সাধারণত পুরুষ প্রবীণদের নেতৃত্বে বিভিন্ন পারিবারিক বিরোধের নিষ্পত্তি করে। শরিফা মনে করতেন, এসব মঞ্চে নারীরা খুব কম ক্ষেত্রেই ন্যায্যভাবে নিজেদের কথা বলার সুযোগ পান।
 
তিনি আরও লক্ষ্য করেন, অনেক নারী ইসলামের ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় তাঁদের সামনে উপস্থাপিত ব্যাখ্যাগুলিকে প্রশ্ন করতে পারেন না। নিজে কোরআনের তামিল অনুবাদ পড়ার পর শরিফার বিশ্বাস জন্মায়, নারীদের অধিকার সম্পর্কিত বহু ক্ষেত্রে কোরআনের মূল বক্তব্য এবং কিছু সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
 
একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার সংকল্প নিয়ে তিনি ১৯৯১ সালে মুসলিম নারীদের জন্য একটি জামাত প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ২০০০ সালে STEPS-এর সম্প্রসারণ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠে তামিলনাড়ু মুসলিম উইমেন্স জামাত কমিটি। এই কমিটির মূল উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট, কিন্তু যুগান্তকারী, এমন একটি নিরাপদ মঞ্চ তৈরি করা, যেখানে মুসলিম নারীরা ভয় বা ভীতি ছাড়াই ন্যায়বিচারের আবেদন জানাতে পারবেন।
 
STEPS-এর মধ্যস্থতা শিবিরে অংশগ্রহণকারী নারীদের একটি দৃশ্য
 
জেলা ও রাজ্য স্তরে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে এই কমিটি বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, গার্হস্থ্য হিংসা, উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক বিরোধ সংক্রান্ত অভিযোগ শোনে। প্রথমে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। প্রয়োজন হলে পুলিশ ও আদালতের মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়।
 
বিরোধ নিষ্পত্তির পাশাপাশি সংস্থাটি শরিয়ত, আইনি অধিকার এবং ধর্মীয় ও দেওয়ানি আইন অনুযায়ী নারীদের প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে কর্মশালারও আয়োজন করে। তাৎক্ষণিক তিন তালাক (ইনস্ট্যান্ট ট্রিপল তালাক) প্রথা বিলোপ এবং মুসলিম নারীদের সম্পত্তির অধিকারের স্বীকৃতির দাবিতেও তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না।
 
সংস্থার দাবি, নারী জামাত গঠনের পর থেকেই রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি অংশ তাদের তীব্র বিরোধিতা করেছে। এমনকি সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের হুমকিরও মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে শরিফা বরাবরই বলেছেন, তাঁদের লক্ষ্য কখনও ধর্মকে চ্যালেঞ্জ করা নয়; বরং নারীদের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোচনায় তাঁদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
 
সময়ের সঙ্গে তিনি ইতিবাচক পরিবর্তনও লক্ষ্য করেছেন। তামিলনাড়ুর কয়েকটি মসজিদ ধীরে ধীরে নারীদের অংশগ্রহণের জন্য আরও বেশি সুযোগ করে দিতে শুরু করেছে, যা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে ধীর কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
 
অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পাশাপাশি STEPS এখনও গার্হস্থ্য হিংসা থেকে পালিয়ে আসা নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করছে। সংস্থাটি অস্থায়ী আবাসন, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনের পাশাপাশি জীবিকা, জমির অধিকার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়েও কাজ করে।
 
সংস্থার দর্শন একটি সহজ বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, আত্মমর্যাদাই নারীর ক্ষমতায়নের মূল ভিত্তি। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে প্রায় ৩,৫০০ জন নারী তাদের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রী, গ্রামীণ নারী এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কর্মশালা, পোস্টার প্রচার, প্রতিযোগিতা ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজও চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি।
 
ডি. শরিফা খানম
 
এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় শরিফা খানমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। নারী জামাত এবং শুধুমাত্র নারীদের জন্য একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার ধারণা সম্পর্কে তাঁর কার্যালয়ের কাছেও জানতে চাওয়া হলেও কোনো উত্তর মেলেনি। তবে আগের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন, শুধুমাত্র নারীদের জন্য মসজিদ গড়ে তোলাই কখনও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল না। তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এমন একটি নিরাপদ পরিসর তৈরি করা, যেখানে নারীরা স্বাধীনভাবে একত্রিত হয়ে নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন এবং সম্মিলিতভাবে সমাধানের পথ খুঁজে নিতে পারবেন।
 
আজও সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে STEPS এবং উইমেন্স জামাত। প্রায় চার দশক ধরে ডি. শরিফা খানম নীরবে এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যেগুলোর অস্তিত্ব একসময় অনেকের কাছেই অসম্ভব বলে মনে হতো। পরিবর্তনের জন্য বাইরের কারও অপেক্ষা না করে তিনি এমন একটি কাঠামো নির্মাণ করেছেন, যেখানে অসহায় নারীরা সহায়তা, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক সংহতির শক্তি খুঁজে পান। তাঁর কাজ প্রমাণ করে, অনেক সময় নেতৃত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ হলো মানুষকে নিজের কথা বলার সাহস জোগানো এবং নিশ্চিত করা যে, তাঁদের কথা শোনার জন্য কেউ অন্তত প্রস্তুত আছেন।


শেহতীয়া খবৰ