চল্লিশ বছর ধরে নার্স গীতা কর্মকার দূর্গম চা বাগান গুলিতে সাইকেল চালিয়ে প্রসুতিদের সাহায্য করে পেলেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 3 d ago
চল্লিশ বছর ধরে নার্স গীতা কর্মকার দূর্গম চা বাগান গুলিতে সাইকেল চালিয়ে প্রসুতিদের সাহায্য করে  পেলেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার
চল্লিশ বছর ধরে নার্স গীতা কর্মকার দূর্গম চা বাগান গুলিতে সাইকেল চালিয়ে প্রসুতিদের সাহায্য করে পেলেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার
 
শান্তি প্রিয় রায়চৌধুরী

পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার চা বাগানের নিবেদিত প্রাণ নার্স গীতা কর্মকার। যিনি এক দশক সাইকেলে চেপে চা বাগানের দুর্গম এলাকার কয়েক হাজার আদিবাসী প্রসুতিদের মধ্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিয়ে এক অনন্য নজির গড়েছেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁকে সম্মানজনক 'ন্যাশনাল ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল অ্যাওয়ার্ড' প্রদান করেছেন।
 
২০২৬ সালের ১২ মে, ভারতের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতি ভবনে জনস্বাস্থ্যে অসাধারণ অবদানের জন্য স্বীকৃত নার্সদের জাতীয় ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল পুরস্কার প্রদান করেন। রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পুরস্কার নিয়ে তিনি বলেন,"আমি কখনো ভাবিনি যে আমি এই পুরস্কারটি পাব। আমার বিশ্বাস, এটা আমার মায়ের আশীর্বাদ ছিল।"
 
জলপাইগুড়িতে এক আদিবাসী মহিলা তাঁর কোলে একটি নবজাতক শিশুকে ধরে আছেন এবং পাশে গীতা কর্মকার দাঁড়িয়ে আছেন
 
গীতা কর্মকার পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বেলাকোবা গ্রামীণ হাসপাতালের একজন অক্সিলিয়ারি নার্স মিডওয়াইফ এবং হেলথ সুপারভাইজার ছিলেন। টানা ৪০ বছর ধরে তিনি দুর্গম ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে অক্লান্ত ভাবে পরিশ্রম করে গেছেন। প্রসূতিদের সাহায্য করা, টিকাদান কর্মসূচি সফল করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বাড়াতে তিনি প্রতিদিন সাইকেলে চেপে ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনোদিন নিজের কাজ ও কর্তব্যে অবহেলা করেননি।
 
তাঁর নিরলস পরিশ্রম ও মায়েদের প্রতি ভালোবাসার জন্য স্থানীয়রা তাঁকে "পোলিও দিদিমণি" বা "মা" বলে ডাকতেন। কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর এই সুদীর্ঘ অবদান ও আত্মত্যাগের জন্য তাঁকে জাতীয় স্তরের সর্বোচ্চ নার্সিং সম্মান প্রদান করা হয়।গীতা কর্মকার তাঁর আদর্শ ও কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, প্রবল ইচ্ছা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব।
 
জলপাইগুড়িতে নার্সিং প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর ১৯৮৬ সালের স্বাস্থ্য বিভাগে যোগদান করে গীতা তার কর্মজীবন শুরু করেন। সহকারি নার্স মিড ওয়াইফ হিসেবে তার প্রথম পোস্টিং ছিল বেলাকোবা গ্রামীণ হাসপাতালে। কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে ডাংগুয়া ঝাড় চা বাগানে বদলি করা হয়, যা মূলত একটি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। যেখানে স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কে সচেতনতা প্রায় নেই বললেই চলে। কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছিল না। এখানে একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা সবেমাত্র শুরু হয়েছিল। স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপনের আগে প্রথম দুই বছর গীতা বাজারের কোনো দোকানের বারান্দায় একটি চেয়ার টেবিল নিয়ে ক্লিনিক চালাতেন।
 
আদিবাসী শিশুদের চিকিৎসা শিবিরে গীতা কর্মকার
 
স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের মতে, গীতা জলপাইগুড়ির প্রত্যন্ত গ্রামে টিকাকরণ কর্মসূচি এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব প্রসারে অভাবনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে যক্ষ্মা, থ্যালাসেমিয়া এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধিতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গিয়েছেন। জলপাইগুড়ি সদরের ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রীতম বসু বলেছেন, ‘উনি অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং দক্ষ। তিনি ছুটি নিতেন খুব কম। রোগীদের প্রতি তাঁর মানবিক আচরণ এবং নথিপত্র সংরক্ষণের নিখুঁত কাজ আমাদের সকলের কাছে এক বড় পাওনা।’
 
আশা কর্মী নীলিমা জাক্সা, যিনি গীতার সঙ্গে ছয় বছর কাজ করেছিলেন, সমাজে তাঁর প্রতি থাকা শ্রদ্ধার কথা স্মরণ করেন।  ৩৩ জন আশা কর্মীর সহায়তায় তিনি ৩১ জানুয়ারি ২০২৬-এ অবসর গ্রহণের আগে পর্যন্ত মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের উপর মনোযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন। ততদিনে তিনি জনস্বাস্থ্য সেবায় ৪২ বছর পূর্ণ করেছিলেন।
 
জলপাইগুড়ির বেলাকোবা গ্রামীণ হাসপাতালের এই অক্সিলিয়ারি নার্স মিডওয়াইফ গীতা কর্মকার কর্মজীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে এই সম্মান তাঁর চার দশকের পরিশ্রমকে সার্থক করে তুলেছে। অবসর গ্রহণের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের তরফে তাঁকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়। তাঁর সহকর্মী এবং উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের দাবি, তিনি কেবল একজন নার্স নন, তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের মানুষের ভরসার স্থল।
 
রাষ্ট্রপতি ভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে গীতা কর্মকার ও অন্যান্য পুরস্কার প্রাপ্তরা
 
নার্স হওয়ার অনেক আগে গীতার জীবনটা ছিল সংগ্রামের। তাঁর বাবা জয়চন্দ্র রাজবংশী মাছ বিক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন, কিন্তু তিনি দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছিলেন। টাকার অভাব ছিল এবং পরিবারটিকে প্রায়ই সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো।
 
গীতা যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত, তখন তার বাবা মারা যান। তার পড়াশোনার খরচ জোগাতে না পারায়, তার মা তাকে এক পারিবারিক বন্ধু রিনা দত্তের কাছে রেখে আসেন, যাঁকে গীতা ভালোবেসে দিদিমা বলে ডাকত।এটি ছিল গীতার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। রিনা খাদ্য, আশ্রয় ও উৎসাহ জুগিয়েছিলেন, আর গীতা বাড়ির কাজে সাহায্য করত। গীতা বলেন, আমি রান্না করতাম, ঘর পরিষ্কার করতাম, কাপড় কাচতাম। এই স্মৃতিচারণ করার পাশাপাশি গীতা বলেন,“কিন্তু তিনি আমাকে সবসময় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করতেন।”
 
কিছুদিন পর বাড়িতে ফিরে এলেও কি হবে, দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী হয়েই রইল। সংসার চালাতে গীতা বাড়ি বাড়ি দুধ বিক্রি করত, জ্বালানির জন্য গোবর দিয়ে ঘুঁটে বানাত এবং বাড়তি টাকা উপার্জনের জন্য মাঝে মাঝে প্রতিবেশীদের বাসনপত্র ধুয়ে দিত।
 
১৯৮৫ সালে গীতা সহকর্মী স্বাস্থ্যকর্মী যুগল কিশোর কর্মকারকে বিয়ে করেন। তাঁরা একসঙ্গে সেবা ও সমাজসেবাকে কেন্দ্র করে একটি জীবন গড়ে তোলেন।কিন্তু তারপর, ২০০৮ সালে তার জীবনে সবকিছু বদলে গেল একটা দুর্ঘটনায়।
 

কাজ শেষে স্বামীর স্কুটারে করে বাড়ি ফেরার পথে এক দুর্ঘটনার শিকার হন। তার ফিবুলাতে গুরুতর ফ্র্যাকচার হয়েছিল এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তার নটি (২০১৮-২০১৫) অস্ত্রোপচার হয়। কিন্তু তা ভালোভাবে সেরে ওঠেনি।তার ফলে শেষ পর্যন্ত তিনি ৪০ শতাংশ শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে কাজ করে গেছেন।
 
আজ, যদিও তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, যে সম্প্রদায়গুলোর তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সেবা করেছেন, তারা আজও তাঁকে তাঁর পদবীতে নয়, বরং বহু বছর আগে দেওয়া সেই পোলিও দিদিমোনি বলেই ডাকেন। গীতার কাছে সেটাই হয়তো সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার।


শেহতীয়া খবৰ