দেবকিশোর চক্রবর্তী
বাংলা সাহিত্য আজ যেন হঠাৎ স্তব্ধ। যে মানুষটি একাই হয়ে উঠেছিলেন এক শহর, এক চলমান ইতিহাস, সেই মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। তাঁর কলমে কলকাতা শুধু একটি শহর ছিল না, ছিল শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া এক জীবন্ত সত্তা। ইট-কাঠ-পাথরের অট্টালিকা, জনারণ্যের ভিড়, ফুটপাতের ফেরিওয়ালা, সবাই যেন আজ নিঃশব্দ, তাদের স্রষ্টাকে হারানোর শোকে।
শঙ্করের লেখায় শহর কখনও কংক্রিটের সীমায় বন্দি থাকেনি। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রেরা হেঁটেছে চৌরঙ্গী-এর রাস্তায়, হারিয়ে গেছে জনঅরণ্য-এর ভিড়ে, আবার ফিরে এসেছে মানুষের খুব কাছাকাছি। তিনি দেখিয়েছেন, শহর মানে শুধু স্থাপত্য নয়, মানুষ, তাদের স্বপ্ন, ব্যর্থতা, লড়াই এবং অজস্র না বলা গল্পের সমষ্টি। একইভাবে সীমাবদ্ধ-এ কর্পোরেট জগতের চাপা অস্থিরতা কিংবা গর্ভধারিণী-এ সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন, সবই তাঁর কলমে পেয়েছে গভীর মানবিক স্পর্শ।
মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়
তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা হয়েছিল কোনও কল্পনার অলীক জগৎ থেকে নয়, বরং কঠিন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে। হাওড়ার এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এক তরুণ, যিনি কাজের খোঁজে ঘুরেছেন কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়, সেই অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠেছিল তাঁর লেখার মূলধন। জীবনকে কাছ থেকে দেখার সেই চোখই তাঁকে আলাদা করে দিয়েছিল অন্যদের থেকে।
এই যাত্রাপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল তাঁর ব্যারিস্টার নোয়েল বারওয়েল-এর ক্লার্ক হিসেবে কাজ করা। বারওয়েল সাহেব শুধু তাঁর কর্মজীবনের সূচনা করেননি, তিনি হয়ে উঠেছিলেন শঙ্করের জীবনের প্রথম ‘আইকন’। সেই মানুষটির মৃত্যু যেন শঙ্করের ভেতরে এক গভীর আলোড়ন তোলে। আর সেই বেদনাই জন্ম দেয় তাঁর প্রথম উপন্যাস কত অজানারে, একটি লেখা যা প্রথম প্রকাশেই তাঁকে পৌঁছে দেয় বাঙালির ঘরে ঘরে।
পরবর্তী সময়ে আশা-আকাঙ্ক্ষা কিংবা নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি-এর মতো ভিন্নধর্মী কাজেও তিনি প্রমাণ করেছেন তাঁর লেখার বিস্তার কতটা গভীর ও বহুমাত্রিক হতে পারে।
শঙ্করের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর সহজাত বর্ণনাশৈলী। তিনি কোনও অতিরঞ্জন বা কৃত্রিমতা ছাড়াই এমনভাবে গল্প বলতেন, যেন পাঠক নিজেই সেই ঘটনার অংশ হয়ে উঠছেন। তাঁর চরিত্রেরা ছিল বাস্তবের মানুষ, তাদের হাসি, কান্না, দুঃখ, স্বপ্ন সবকিছুই ছিল স্পষ্ট ও স্পর্শযোগ্য। তাই তাঁর লেখা শুধু পড়া নয়, অনুভব করা যায়।
অথচ এই বিপুল জনপ্রিয়তার মাঝেও তিনি নিজেকে রেখেছিলেন প্রচারের আলো থেকে অনেক দূরে। তিনি ছিলেন নিভৃতচারী, আত্মমগ্ন, কাজই ছিল তাঁর একমাত্র পরিচয়। হয়তো এই কারণেই তাঁর বিদায় আরও গভীর শূন্যতা তৈরি করে। কারণ তিনি শুধু একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সময়ের সাক্ষী, শহরের ভাষ্যকার।
আজ তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য যেন এক বিশাল অভিভাবককে হারাল। তাঁর সৃষ্টি করা চরিত্রেরা আজ অনাথ। তারা যেন এখনও হাঁটছে কলকাতার পথে, কিন্তু তাদের গল্প বলার মানুষটি আর নেই। তবুও শঙ্কর থাকবেন, তাঁর প্রতিটি লাইনে, প্রতিটি চরিত্রে, প্রতিটি শহুরে দুপুরের নিঃসঙ্গতায়। কারণ কিছু মানুষ চলে যান না, তারা রয়ে যান তাদের সৃষ্টির মধ্যেই। আজ সত্যিই বড্ড দুঃখের দিন বাঙালির।