ইসরায়েলের সংসদ নেসেটে মোদিকে “স্পিকার অফ দ্য নেসেট মেডেল”, ইসরায়েলি সংসদের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদান
তেল আবিব / নয়াদিল্লি
কূটনৈতিক ইতিহাসে এক অসাধারণ অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন বিশ্বের সেই অল্পসংখ্যক নেতাদের একজন, যাঁরা ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন, উভয় পক্ষ থেকেই সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মান লাভ করেছেন। পশ্চিম এশিয়ার জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝে এই অর্জন শুধু ভারতের সমতলিত পররাষ্ট্রনীতির সাক্ষ্য নয়; বরং এই অঞ্চলে নয়াদিল্লির বাড়তে থাকা গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাবেরও সুস্পষ্ট পরিচায়ক।
ইসরায়েলের সংসদ নেসেটে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ শেষে মোদিকে প্রদান করা হয় “স্পিকার অফ দ্য নেসেট মেডেল”, ইসরায়েলি সংসদের সর্বোচ্চ সম্মান। এই সম্মানে ভূষিত হওয়া তিনি প্রথম বিশ্ব নেতা। ভারত–ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে তাঁর ভূমিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মানকে দেখা হচ্ছে। ভাষণের শেষে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়ে সংসদ সদস্যদের করতালি সেই মুহূর্তকে কূটনৈতিক ভদ্রতার বাইরে গিয়ে এক আন্তরিক আবেগের রূপ দেয়।
এটাই প্রথম নয় যখন পশ্চিম এশিয়া মোদিকে তার সর্বোচ্চ সম্মানে সম্মানিত করেছে। ২০১৮ সালে ফিলিস্তিন তাঁকে “গ্র্যান্ড কলার অফ দ্য স্টেট অফ ফিলিস্তিন” উপাধিতে ভূষিত করে, যা তাদের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান। ফলে তিনি সেই বিরল নেতাদের মধ্যে একজন হয়ে ওঠেন, যাঁরা দুই পক্ষ থেকেই সর্বোচ্চ স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। এটি ভারতের সেই নীতির দৃঢ় প্রমাণ, যেখানে ইসরায়েলের সঙ্গে গভীর কৌশলগত সম্পর্ক এবং ফিলিস্তিনের প্রতি ঐতিহাসিক সমর্থন, উভয়কেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নেসেটে তাঁর ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ভারত–ইসরায়েল সম্পর্কের বহুপ্রাচীন ভিত্তির কথা স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এস্থারের গ্রন্থে ভারতের “হোদু” নামে পরিচিতি এবং তলমুদে ভারত–ইসরায়েল প্রাচীন বাণিজ্যিক সম্পর্কের উল্লেখ। তাঁর বক্তব্যে ইতিহাসের স্মৃতি এবং বর্তমানের সম্ভাবনা একইসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। তিনি বলেন, এ সম্পর্ক কেবল সরকার–নির্ভর আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দুই দেশের মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা বিশ্বাস ও সম্মানই এ বন্ধনের প্রকৃত শক্তি।
প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত, কৃষিভিত্তিক এবং জল ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত সাফল্যের প্রশংসা করেন এবং জানান যে ভারত এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে চায়। তাঁর সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও নবউদ্ভাবন প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন, যেখানে বিভিন্ন স্টার্টআপ ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। দুই নেতা ভবিষ্যতের অংশীদারত্বকে নবউদ্ভাবন–কেন্দ্রিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম, কৃষি–প্রযুক্তি এবং সবুজ জ্বালানিতে যৌথ উদ্যোগ নতুন দিক নির্দেশ করবে।
মোদি বলেন, ভারতে ইহুদি জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী শান্তি ও মর্যাদার সাথে বসবাস করেছে। ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগসূত্র প্রাচীন সমুদ্রপথ ধরে আগত ইহুদি ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, ভারত তাঁদের আশ্রয়, সম্মান ও সুযোগ দিয়েছিল, আর তাঁরা ভারতের সামাজিক কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই ভাগ করা ইতিহাস আজকের সম্পর্কের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি।
তিনি বক্তৃতায় যোগ ও আয়ুর্বেদের বিস্তারের কথাও উল্লেখ করেন। স্মরণ করিয়ে দেন যে ২০০৬ সালে তাঁর প্রথম সফরের সময় ইসরায়েলে অল্প কয়েকটি যোগকেন্দ্র ছিল, আর আজ প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে যোগচর্চা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে; আয়ুর্বেদ প্রতিও আগ্রহ বেড়েছে। তিনি ইসরায়েলের তরুণ প্রজন্মকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, ভারতের প্রাণশক্তি, আধ্যাত্মিকতা ও জীবনদর্শন নিজের চোখে দেখার সুযোগ তাদের নেওয়া উচিত। এটি শুধু পর্যটন নয়; দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার বার্তা।
সংসদীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান যে ভারতের সংসদ ইসরায়েলের সঙ্গে একটি সংসদীয় বন্ধুত্ব–গোষ্ঠী গঠন করেছে, যাতে দুই দেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এই উদ্যোগ গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেকার সরাসরি সহযোগিতা বাড়াবে এবং নীতি–নির্ধারণে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়কে শক্তিশালী করবে।
সামাজিক মাধ্যম X–এ প্রধানমন্ত্রী নেসেটে ভাষণ দেওয়াকে “সম্মানের মুহূর্ত” বলে উল্লেখ করেন এবং সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎকে “আনন্দের অভিজ্ঞতা” বলেন। তাঁর পোস্টে তিনি জানান যে ভাষণে দুই দেশের প্রাচীন যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্মান তুলে ধরা হয়েছে। ডিজিটাল কূটনীতির এই যুগে এমন বার্তা দ্রুত বৈশ্বিক দর্শকের কাছে পৌঁছে জন–কূটনীতিকে আরও কার্যকর করে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন, উভয় পক্ষ থেকেই সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়া ভারতের “কৌশলগত স্বায়ত্ততা” নীতির ফলাফল। নয়াদিল্লি বহু বছর ধরে দুই–রাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করে এসেছে, পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও বাড়িয়েছে। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা সহজ ছিল না, কিন্তু আজকের অর্জন প্রমাণ করছে ভারতের এই নীতি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য।
নেসেটের সম্মান কেবল একটি পদক নয়, এটি ইসরায়েলের সেই গভীর বিশ্বাসের প্রতীক, যা তারা ভারতের ভূমিকার ওপর স্থাপন করেছে। একইভাবে ফিলিস্তিনের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান দেখায় যে ভারত ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও নীতিগত প্রতিশ্রুতি বজায় রাখে। পশ্চিম এশিয়ার সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে এই দ্বিমুখী স্বীকৃতি ভারতকে সংলাপ, শান্তি ও সহযোগিতার একটি সম্ভাব্য সেতু হিসেবে তুলে ধরে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, এই স্বীকৃতি শুধু কূটনৈতিক অর্জন নয়; এটি ভারতের সেই সর্বাঙ্গীন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৌশল, এবং মানুষের মধ্যে সংযোগ, সবই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই সম্মান পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের ক্রমবর্ধমান অবস্থান ও প্রভাবের স্পষ্ট চিহ্ন। আগামী দিনে এই প্রতীকী অর্জন বাস্তব সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে কীভাবে রূপ নেয়, সেটিই হবে নজর দেওয়ার বিষয়। আপাতত, এটি ভারতীয় কূটনীতির জন্য গর্ব ও আত্মবিশ্বাসে ভরা এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।