রমজান মাসের আগমন ঘটতেই পুরোনো দিল্লির সরু গলিগুলো যেন নতুন প্রাণ পায়। সন্ধ্যার আলো গাঢ় হতে না হতেই ইফতারের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়, আর ঐতিহাসিক জামে মসজিদের চারপাশে রোজাদারদের ঢল নেমে আসে। ঠিক এই ভিড়ের মাঝেই গত চার বছর ধরে একটি পরিচিত মুখ বারবার নজর কাড়ে, পুরোনো দিল্লির বাসিন্দা নেহা ভারতী। প্রতি বছর রমজান মাসে তিনি নিজের হাতে ইফতার তৈরি করে জামা মসজিদের গেট নম্বর তিনে পৌঁছে দেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, “অল্প কিছু মানুষই ঘৃণা ছড়ায়, সাধারণ ভারতবাসী শান্তি ভালোবাসে।” এই ভাবনাই তাকে বছর বছর এই পথচলায় উৎসাহিত করে।
চার বছর আগে তাঁর এই উদ্যোগের জন্ম। সমাজজুড়ে বাড়তে থাকা বিদ্বেষ আর অবিশ্বাসের খবর তাঁকে অস্থির করছিল। মনে হয়েছিল, সাধারণ মানুষ যদি ছোট ছোট ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পরিবেশ বদলে যেতেই পারে। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে রমজানের পবিত্র মাসে রোজাদারদের জন্য ইফতার তৈরি করবেন। শুরুটা ছিল ছোট, কয়েকটি প্যাকেট, সামান্য উপকরণ আর হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের জন্য। কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল নির্মল, মন ছিল দৃঢ়। ধীরে ধীরে সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগই এক উষ্ণ ঐতিহ্যে পরিণত হয়।
দুপুর পেরোতেই তাঁর বাড়ির রান্নাঘর যেন কর্মচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। কেউ ফল কাটছে, কেউ খেজুর সাজাচ্ছে, কোথাও পকোড়া ভাজা হচ্ছে, আবার কোথাও প্রস্তুত হচ্ছে মিষ্টি। নেহা যত্ন নিয়ে নিশ্চিত করেন যেন ইফতারের খাবার তাজা ও পুষ্টিকর হয়, যাতে রোজা ভাঙার সময় রোজাদারদের আরাম ও শক্তি দুটোই মেলে। তাঁর বাবা–মা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাও একসঙ্গে হাত লাগান। কেউ সবজি কাটেন, কেউ প্যাকেট ভরেন, কেউ বা মালপত্র বয়ে আনেন। ইফতার বিলানো এখন তাঁদের পরিবারের জন্য এক ধরনের সম্মিলিত সেবা-অনুষ্ঠান।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে নেহা ইফতারের তৈরি প্যাকেট হাতে জামা মসজিদের পথে হাঁটেন। বাইরে রোজাদাররা সারি বেঁধে বসে আছেন, আজানের অপেক্ষায়। নেহা ও তাঁর সঙ্গে থাকা স্বেচ্ছাসেবীরা হাসিমুখে প্যাকেট বিতরণ করেন। কেউ দোয়া দেন, কেউ বিস্মিত হয়ে জানতে চান, কেন তিনি এই কাজ করেন? নেহার উত্তর সরল, উৎসব কোনো একটি গোষ্ঠীর নয়, উৎসব মানুষের। তাঁর মতে, যখন মানুষ অন্যের বিশ্বাস ও উৎসবের মর্যাদা দেয়, তখনই সত্যিকারের ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে।
রমজানে নেহা ভারতীর ইফতার বিতরণের এক দৃশ্য
এ বছর তাঁর একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ইফতার বিলাতে বিলাতে শান্তি আর ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন। বহু মানুষ তাঁর প্রশংসা করেছেন, তাঁকে সংবেদনশীলতা ও সাহসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলেছেন। ডাক্তার, শিক্ষক, সমাজকর্মী, অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে সমাজের বড় পরিবর্তন এসব ছোট উদ্যোগ থেকেই শুরু হয়। সমালোচনাও ছিল, কেউ ধর্মকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তুলেছে, কেউ ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছে। কিন্তু নেহা তাতে বিচলিত হননি। তাঁর বিশ্বাস, ঘৃণার মোকাবিলা ঘৃণায় নয়, বরং সেবা আর ধৈর্যের মাধ্যমে করতে হয়।
নেহা একটি এনজিও পরিচালনা করেন, যার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতা ও সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড চালান। তাঁর কাজ কেবল রমজান কেন্দ্রিক নয়; সারা বছরই বিভিন্ন সময়ে তিনি প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়ান। তাঁর স্পষ্ট মত, সেবার কোনো ধর্ম নেই। যে মানুষ ক্ষুধার্ত, তার প্রয়োজন খাবার, পরিচয় নয়। আর এ মূল্যবোধ তাঁর প্রতিটি কাজে প্রকাশ পায়।
রমজানে নেহা ভারতীর ইফতার বিতরণের এক দৃশ্য
এখন তাঁর উদ্যোগে অন্যরাও যুক্ত হতে শুরু করেছেন। কেউ আর্থিকভাবে সাহায্য করেন, কেউ স্বেচ্ছাসেবক হয়ে পাশে দাঁড়ান। ফলে ইফতারের প্যাকেটের সংখ্যা বেড়েছে, এবং আরও বেশি রোজাদারের কাছে খাবার পৌঁছাচ্ছে। বহু তরুণ–তরুণী নেহার অনুপ্রেরণায় নিজেদের এলাকাতেও এমন উদ্যোগ শুরু করেছেন। নেহার বিশ্বাস, সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি সামান্য হলেও সৎ কাজ করে, তাহলে পরিবেশ বদলাতে সময় লাগে না।
শুরুর দিকে কিছু পরিচিত মানুষ তাঁর কাজকে ভুল বুঝেছিলেন। কেউ ভেবেছিলেন, হয়তো এটি দেখানোর জন্য, বা সাময়িক উচ্ছ্বাস। কিন্তু চার বছর ধরে বিরামহীনভাবে তিনি এই কাজ চালিয়ে যাওয়ায় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। এখন সেই মানুষরাই তাঁকে উৎসাহ দেন এবং বলেন, এ ধরনের উদাহরণ সমাজকে একত্রে বেঁধে রাখে। তাঁর বাবা–মাও মেয়ের এই পথচলায় অপরিসীম গর্ব অনুভব করেন।
নেহার দৃষ্টিতে, রমজান কেবল ইবাদতের মাস নয়, এ মাস আত্মশুদ্ধি, সহমর্মিতা আর করুণার সময়। তাঁর মতে, রোজা শুধু ক্ষুধা–তৃষ্ণা সহ্যের নাম নয়, বরং নিজের কঠোরতা ভেঙে মানবিকতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুশীলন। হয়তো সেই অনুভূতিই তাঁকে এই পথে এনেছে।
পুরোনো দিল্লির সন্ধ্যা, জামা মসজিদের সিঁড়ি আর সেই সাধারণ ইফতারের প্যাকেট, এখন হয়ে উঠেছে এক প্রতীক; প্রমাণ যে সমাজে ভালোবাসা এখনও জীবন্ত। নেহা বলেন, পৃথিবীতে যতই ঘৃণার আওয়াজ উঠুক, ভালোবাসার একটি আন্তরিক প্রয়াস সবকিছুকে ছাপিয়ে যেতে পারে। ভবিষ্যতেও তিনি এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখবেন।
আজানের ধ্বনি উঠতেই যখন রোজাদাররা খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙেন, ঠিক সেই মুহূর্তে নেহার মুখে যে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে, সেটাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তাঁর কাছে এটি শুধু সেবা নয়, একটি বার্তা: ভারতের প্রকৃত পরিচয় বৈচিত্র্যের মধ্যকার ঐক্য, আর এই ঐক্য রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। রমজানের এই পবিত্র সময় নেহা ভারতীর উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, মানবতার সম্পর্ক সমস্ত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে, আর যখন হৃদয় মিলতে শুরু করে, দেয়ালগুলো নিজে থেকেই ভেঙে পড়ে।