আট মাসের গর্ভবতী অবস্থায় সাক্ষাৎকার দিয়ে IPS অফিসার হওয়া ডঃ বুশরা বানোর অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 16 h ago
IPS অফিসার ডঃ বুশরা বানো
IPS অফিসার ডঃ বুশরা বানো
 
মালিক আসগর  হাশমি

কানৌজের সরু গলি থেকে বেরিয়ে এসে দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ডঃ বুশরা বানোর গল্প যেন এক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য। পার্থক্য শুধু এই, এটি সম্পূর্ণ সত্যি। এটি সাহসের গল্প। এটি বিশ্বাসের গল্প। আর এটি এক মায়ের গল্প, যিনি সন্তান জন্মের পরেও নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
 
উত্তর প্রদেশের কানৌজ জেলার সৌরিখ গ্রামে জন্মগ্রহণ করা বুশরা বানো ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তাঁর পরিবার তাঁকে নিয়ে গর্ব করত। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তে শুরু করেন। তিনি প্রতিটি শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করতেন। এমন সময়ে, যখন গ্রামে মেয়েদের শিক্ষার বিষয়ে সচেতনতা খুব সীমিত ছিল, তিনি গণিতে বিএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর অল্প বয়সেই MBA শেষ করেন। তাঁর শেখার গতি এতটাই দ্রুত ছিল যে বিশ বছর হওয়ার আগেই তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
 

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্টে পিএইচডি করতে ভর্তি হন। পরের বছরই তিনি NET-JRF পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। গবেষণার পাশাপাশি তিনি শিক্ষকতাও শুরু করেন এবং আগ্রার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রভাষক হিসেবে কাজ করেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর কাছে শিক্ষা শুধু ডিগ্রি অর্জনের বিষয় ছিল না; এটি ছিল আত্মনির্ভর হওয়ার পথ।
 
এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেন, “সেই সময়েই আমার বিয়ে হয় সৌদি আরবের জাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আসমার হুসেনের সঙ্গে। বিয়ের পর আমিও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সুযোগ পাই। আমরা দুজনেই সেখানে শিক্ষকতা করতাম। জীবন ছিল স্থিতিশীল ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। সম্মান ও নিরাপত্তাও ছিল। কিন্তু আমার মনে একটা শূন্যতা ছিল। আমি আমার দেশকে খুব মিস করতাম। ভারতের মাটির গন্ধ আমাকে শান্তিতে থাকতে দিত না।”
 
তিনি বলেন, “চার বছর পর আমি একটি বড় সিদ্ধান্ত নিই। আমি চাকরি ছেড়ে ভারতে ফিরে আসি। এটি সহজ ছিল না। আমার স্বামী তখনও সৌদি আরবে কাজ করছিলেন। ততদিনে আমি এক সন্তানের মা। ভারতে ফিরে এসে আমি একটি পোস্ট-ডক্টরাল প্রোগ্রামে যোগ দিই এবং পাশাপাশি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করি। আমার ওপর পরিবারের দায়িত্ব এবং ছোট সন্তানের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব ছিল, কিন্তু আমার সংকল্প ছিল অটুট।”
 
ডঃ বুশরা বানো তাঁর পরিবারের সঙ্গে
 
প্রথমবার তিনি UPSC পরীক্ষায় বসে সফল হতে পারেননি। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। সেই সময় তিনি কোল ইন্ডিয়ার অধীন একটি কোম্পানিতে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে চাকরি পান এবং সোনভদ্রায় পোস্টিং হয়। চাকরির পাশাপাশি তিনি পড়াশোনাও চালিয়ে যান। পরের বছর তিনি আবার চেষ্টা করেন এবং UPSC ও UPPSC, দুটোরই প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
 
২০১৮ সালের জুন মাসে তিনি দুই পরীক্ষার মূল পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হন। সেই সময় তিনি দ্বিতীয় সন্তানের মা হতে চলেছিলেন। সাক্ষাৎকারের সময় তিনি গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে ছিলেন। অপারেশনের পর শরীর দুর্বল হলেও তাঁর মন ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। তিনি সাক্ষাৎকারে অংশ নেন। ফল প্রকাশের পর তিনি ২৭৭তম স্থান অর্জন করে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ট্রাফিক সার্ভিসে নির্বাচিত হন।
 
অন্যদিকে, UPPSC পরীক্ষায় তিনি ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন, যার ফলে তিনি ডেপুটি কালেক্টর হতে পারতেন। ২০২০ সালে তিনি ফিরোজাবাদ সদর-এ সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট (SDM) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রশাসনিক কাজে তিনি অবৈধ খননের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্ব দেন এবং সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা শোনেন। তিনি হিজাব পরে অফিসে যেতেন। প্রথমে অনেকে অবাক হলেও তাঁর কাজই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল।
 
ডঃ বুশরা বানো
 
যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চিনতেন, তাঁরা তাঁর সরলতা ও স্পষ্ট চিন্তাভাবনার প্রশংসা করতেন। তিনি বলেন, মানুষ প্রথমে আপনাকে আপনার পরিচয়ে বিচার করে, কিন্তু পরে আপনার কাজই আপনার পরিচয় হয়ে ওঠে। ফিরোজাবাদে তিনি একজন জনপ্রিয় অফিসার হয়ে ওঠেন।
 
এই সময় তিনি আবার UPSC পরীক্ষায় বসেন। এবার তিনি ২৩৪তম স্থান অর্জন করে ভারতীয় পুলিশ সার্ভিস (IPS)-এ নির্বাচিত হন। তিনি ২০২১ ব্যাচের একজন অফিসার এবং পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি হুগলি গ্রামীণ জেলায় সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত। পুলিশ ইউনিফর্মে তাঁর কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়, যেখানে তিনি আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ করছেন।
 
তাঁর এই সাফল্যে তাঁর পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি নিজেই বলেন, প্রায়ই বলা হয় যে প্রতিটি সফল পুরুষের পেছনে একজন নারী থাকেন। তাঁর ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা হয়েছে। যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে তিনি ভারতে কাজ করবেন এবং সন্তানরা তাঁর সঙ্গে থাকবে, তখন তাঁর স্বামী সৌদি আরবের চাকরি ছেড়ে ভারতে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি একটি ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং পাশাপাশি নিজের পিএইচডি করার জন্য পড়াশোনা করছেন।
 
একটি জাদুঘরে ডঃ বুশরা বানো
 
দু’টি সন্তানের মা। একাধিক অপারেশন। শিক্ষাগত চাপ। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি। চাকরির দায়িত্ব। সামাজিক প্রত্যাশা, সব একসঙ্গে চলছিল। তবুও তিনি কখনো নিজেকে দুর্বল ভাবেননি। তিনি বলেন, মা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কারও স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় না; বরং দায়িত্ব বাড়ে, আর সেই সঙ্গে সাহসও।
 
তাঁর বার্তা বিশেষ করে মুসলিম মেয়েদের এবং তাঁদের পরিবারের জন্য স্পষ্ট, মেয়েদের সুযোগ দিন। তাঁদের পড়তে দিন। তাঁদের নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দিন। পরিবার যদি পাশে থাকে, তাহলে কোনো লক্ষ্যই দূরে থাকে না।
 
ডঃ বুশরা বানোর গল্প আমাদের এটাও শেখায় যে জীবন কখনো সরলরেখা নয়। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি ছিলেন সহকারী অধ্যাপক, কর্পোরেট কর্মী, এসডিএম এবং এখন একজন IPS অফিসার। প্রতিটি মোড়ে তিনি নতুন পথ বেছে নিয়েছেন। প্রতিবার চ্যালেঞ্জ বড় ছিল, কিন্তু প্রতিবারই তিনি নিজেকে আরও শক্তিশালী প্রমাণ করেছেন।
 
জালিয়ানওয়ালা বাগ স্মৃতিসৌধে ডঃ বুশরা বানো
 
আজ যখন তিনি পুলিশ ইউনিফর্ম পরে কর্মক্ষেত্রে পা রাখেন, তিনি শুধু একজন অফিসার নন, তিনি ছোট শহর থেকে উঠে আসা বড় স্বপ্ন দেখা লক্ষ লক্ষ মেয়ের আশা। যেসব মায়েরা মনে করেন তাঁদের জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে, তাঁদের জন্য তিনি এক অনুপ্রেরণার কণ্ঠস্বর। তিনি প্রমাণ করেছেন, কোনো কাজের জন্য কখনোই দেরি হয়ে যায় না।
 
কানৌজের গলি থেকে প্রশাসনিক পরিষেবা এবং সেখান থেকে ভারতীয় পুলিশ সার্ভিস, এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, দৃঢ় সংকল্প নিজের পথ নিজেই তৈরি করে। ডঃ বুশরা বানো প্রমাণ করেছেন, স্বপ্নের কোনো সময়সীমা নেই, আর সাহসের কোনো বিকল্প নেই।