জম্মু ও কাশ্মীরের এক সিভিল সার্ভিস অফিসার আনিসা নবী প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের ফিটনেসের প্রতি গভীর অনুরাগকে সমানভাবে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। একজন অ্যাথলেট হিসেবেও তিনি সক্রিয় এবং নারী ও তরুণদের মধ্যে ফিটনেস সচেতনতা বাড়াতে নিরন্তর কাজ করছেন। জম্মু ও কাশ্মীর সিভিল সার্ভিস (JKAS) পরীক্ষায় তিনি তৃতীয় স্থান অর্জন করেন এবং ২০১২ সালে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার পর বর্তমানে তিনি যুব পরিষেবা ও ক্রীড়া বিভাগের অধীন জম্মু ও কাশ্মীর স্পোর্টস কাউন্সিলের চিফ স্পোর্টস অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আনিসা নবী ‘আওয়াজ–দ্য ভয়েস’-কে জানান, তিনি সবসময়ই চেষ্টা করেছেন প্রশাসনিক জীবনের পাশাপাশি ফিটনেসের প্রতি তাঁর আবেগকে ধরে রাখতে। একজন অ্যাথলেট হিসেবে তিনি রাজ্য ও জাতীয় স্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও ৮০০ মিটার দৌড়ে একাধিক পদক জিতেছেন। এছাড়াও তিনি ভেদান্তা দিল্লি হাফ ম্যারাথন, টাটা মুম্বই ম্যারাথন এবং দুবাই ম্যারাথনের মতো গুরুত্বপূর্ণ হাফ ম্যারাথন সম্পন্ন করেছেন।
আনিসা নবী
নারীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য তিনি “ওয়ান্ড্রাস উইমেন” (Wondrous Women)নামে একটি কমিউনিটি উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নারীদের ফিটনেস, মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থ জীবনযাপনের দিকে উৎসাহিত করা হয় এবং ইতিমধ্যে বহু নারীকে খেলাধুলা ও ফিটনেসের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তিনি ‘ফিট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট’-এর একজন অ্যাম্বাসাডর হিসেবেও কাজ করছেন এবং জম্মু ও কাশ্মীরসহ বিভিন্ন জায়গায় ফিটনেস ও সুস্থতার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। পাশাপাশি তিনি র্যাকেট স্পোর্টস যেমন পিকলবল ও প্যাডেল টেনিসকেও জম্মু ও কাশ্মীরে জনপ্রিয় করে তুলতে কাজ করছেন, বিশেষ করে নারীদের এই খেলাগুলো শেখাতে ও অংশগ্রহণে উৎসাহিত করছেন।
প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আনিসা নবী বলেন, জিএসটি অফিসার হিসেবে তিনি নতুন কর সংস্কার (GST) সম্পর্কে সাধারণ মানুষ, করদাতা ও কর বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং রাজস্ব বৃদ্ধিতেও অবদান রেখেছেন। তিনি ট্যাক্সেশন বিষয়ে প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন এবং বিভাগে নতুন যোগদান করা ইনস্পেক্টর ও কর্মকর্তাদের করব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তৃণমূল স্তরেও তিনি মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন, বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীর রুরাল লাইভলিহুড মিশন (JKRLM)-এ স্টেট প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, বাজারের সুযোগ তৈরি এবং জীবিকার পথ প্রসারিত করার মাধ্যমে তাঁদের ক্ষমতায়নে কাজ করেছেন।
আনিসা নবী
যুবসমাজকে মাদকাসক্তি ও নেতিবাচক প্রভাব থেকে দূরে রাখতে চিফ স্পোর্টস অফিসার হিসেবে তিনি খেলাধুলার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করছেন। তরুণদের খেলাধুলায় যুক্ত করতে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও কার্যক্রম আয়োজন করা হচ্ছে। ‘খেলো ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির নোডাল অফিসার হিসেবে তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের খেলো ইন্ডিয়া সেন্টারগুলোর কার্যক্রম তদারকি করেন।
২০১২ সালে JKAS কর্মকর্তা হিসেবে সরকারে যোগ দেওয়ার পর থেকে আনিসা নবী প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সিভিল সেক্রেটারিয়েট, রাজস্ব বিভাগ, স্টেট ট্যাক্সেস বিভাগ, জম্মু ও কাশ্মীর গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগ এবং জম্মু ও কাশ্মীর রুরাল লাইভলিহুড মিশন।
সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার অনুপ্রেরণা সম্পর্কে আনিসা বলেন, তাঁর বাবা ছিলেন তাঁর প্রধান প্রেরণা। মানুষকে সেবা করার ক্ষেত্রে বাবার কাজ ও প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছোটবেলা থেকেই তাঁকে এই পেশার দিকে আকৃষ্ট করেছে। তাঁর বাবা গুলাম নবী সোফি জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের একজন সিনিয়র JKAS কর্মকর্তা ছিলেন এবং ২০১০ সালে রেজিস্ট্রার কো-অপারেটিভস পদ থেকে অবসর নেন।
আনিসা নবী
ফিটনেস ও অ্যাথলেটিক্সের ক্ষেত্রে তাঁর স্বামী মুদাসসির নবী শেখ তাঁর বড় অনুপ্রেরণা। তিনি একজন ব্যবসায়ী এবং একজন ম্যারাথন রানার। আনিসা জানান, মা হওয়ার পর যখন তিনি তাঁর বেসরকারি চাকরি ছেড়ে দেন এবং জীবনের এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি হন, তখন তাঁর স্বামীই তাঁকে সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতি নিতে উৎসাহ দেন এবং বিশ্বাস করেন যে তিনি সফল হবেন।
তিনি আরও বলেন, তাঁর স্বামী তাঁকে সবসময় সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপন করতে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁরই উৎসাহে ২০২১ সালে “ওয়ান্ড্রাস উইমেন” নামে নারীদের জন্য একটি ফিটনেস কমিউনিটি শুরু করেন। আনিসার মতে, সমাজে অনেক সময় এমন একটি পর্যায় আসে যখন অনেক নারী নিজেদের স্বপ্ন ছেড়ে দিতে চান, কিন্তু স্বামীর সমর্থন তাঁকে সেই সময়েও এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
এই “ওয়ান্ড্রাস উইমেন” কমিউনিটির মাধ্যমে তিনি বহু নারীকে সক্রিয় ও সুস্থ জীবনযাপনের পথে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছেন। দৌড়, যোগব্যায়াম, ট্রেকিংসহ বিভিন্ন ফিটনেস কার্যক্রমের মাধ্যমে নারীরা এখানে যুক্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন জায়গার নারীরা এই কমিউনিটির মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ ভাগ করে নিচ্ছেন। আনিসা বলেন, এই উদ্যোগের ফলে নারীরা বিভিন্ন ক্রীড়া কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন এবং শারীরিক ও মানসিক শক্তির মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতায়ন করতে পারছেন।
আনিসা নবী জম্মু কাশ্মীরে তাঁর এথেলেটিক্স টিম - এর সঙ্গে
একজন ক্রীড়া ও ফিটনেস অ্যাম্বাসাডর হিসেবে তিনি সবসময়ই তরুণদের সুস্থ ও ইতিবাচক জীবনযাপনের দিকে উৎসাহিত করতে বিশ্বাস করেন, যাতে তারা মাদকাসক্তির মতো ক্ষতিকর পথ থেকে দূরে থাকতে পারে। এই লক্ষ্যেই তিনি বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে গিয়ে তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের অনুপ্রাণিত করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পডকাস্টের মাধ্যমে সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতি সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেন। অনেক তরুণ তাঁকে তাদের অনুপ্রেরণা ও পরামর্শদাতা হিসেবে দেখেন, এটিই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি।
তিনি মনে করেন, সমাজে যখন অনেক তরুণ মাদকাসক্তি ও নেতিবাচক পথে ঝুঁকে পড়ছে এবং অনেক নারী নানা দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে মানসিক চাপ ও অবসাদের মুখোমুখি হচ্ছেন, তখন তাঁদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারা একটি বড় সাফল্য। এই কাজের জন্য তিনি সমাজের কাছ থেকে সমর্থন ও উৎসাহও পাচ্ছেন।
২০০৮ সালে বিয়ের পর তাঁর জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। প্রায় পাঁচ বছর তিনি পুরোপুরি পারিবারিক জীবনেই মনোনিবেশ করেন এবং এই সময়েই তাঁর একটি কন্যাসন্তান জন্ম হয়। এরপর ২০১০ সালে তিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন। স্বামীর সমর্থনে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার চর্চাও চালিয়ে যান। ২০০৯–২০১০ ব্যাচে তিনি JKAS পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ২০১২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন।
শ্রীনগরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আনিসা নবী প্রেজেন্টেশন কনভেন্ট এবং ম্যালিনসন’স গার্লস স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি জম্মু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইনফরমেশন টেকনোলজিতে বি.টেক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০০৭ সালে কাটরার শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী বিশ্ববিদ্যালয় (SMVDU) থেকে এইচআর ও মার্কেটিংয়ে এমবিএ সম্পন্ন করেন।