চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে নেতৃত্বের শীর্ষে: আইপিএস আজীথা বেগম

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 20 h ago
আজীথা বেগম সুলতানা
আজীথা বেগম সুলতানা
 
শ্রীলতা এম

কেরালার ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ আজীথা বেগম সুলতানার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার সময় বের করা যেন একপ্রকার অসম্ভব কাজ। দিনের পর দিন তিনি এক দায়িত্ব থেকে আরেক দায়িত্বে ছুটে চলেন, এতটাই ব্যস্ত যে মাঝে মাঝে মনে হয়, নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো সময়ও তাঁর হাতে নেই। কেরালা ক্যাডারের ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের (IPS) সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে তিনি অন্যতম এবং তামিলনাড়ু থেকে উঠে আসা প্রথম মুসলিম মহিলা IPS কর্মকর্তা।
 
তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলার জন্য অনেক সময় দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। তাঁর অফিসও প্রায়ই অপেক্ষা করে থাকে, কখন তিনি বিভিন্ন দায়িত্ব শেষ করে ফিরবেন। কখনো তিনি কোনো ক্রীড়া অনুষ্ঠানে, কখনো কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, আবার কখনো চলচ্চিত্র জগতে যৌন হয়রানির অভিযোগের তদন্তে ব্যস্ত থাকেন। মানব পাচার, রাজ্যে মাদক প্রবেশ এবং সমাজের মূল কাঠামোকে নাড়া দেয় এমন নানা সংবেদনশীল বিষয়ের তদন্তের নেতৃত্বও তিনি দিচ্ছেন। নারী ও শিশু সংক্রান্ত কাজ তাঁর হৃদয়ের খুব কাছের, এ কথা তিনি সবসময়ই বলে আসছেন।
 
আজীথা বেগম সুলতানা
 
কেরালার পুলিশ ব্যবস্থার ধাপে ধাপে উঠে এসে তিনি নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন এবং যেখানেই পোস্টিং পেয়েছেন সেখানেই প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তিনি এক অর্থে এক ধরনের সেলিব্রিটিও। তাঁর IPS স্বামীও ইন্সপেক্টর জেনারেল পদে কর্মরত। নানা সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁদের নিয়ে খবর হয়েছে। যেমন, আজীথা যখন দ্রুত অভিযান চালিয়ে ৪৪ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে একটি মানব পাচার চক্র ভেঙে দেন; অথবা যখন তিনি ও তাঁর স্বামী একই সময়ে কোল্লাম জেলায় শহর ও গ্রামীণ SP হিসেবে কর্মরত ছিলেন; আবার কয়েক বছর আগে তাঁরা দুজনেই আইরনম্যান ট্রায়াথলন সম্পূর্ণ করে নিজেদের সবচেয়ে ফিট পুলিশ দম্পতি হিসেবে প্রমাণ করেন; কিংবা যখন ফুলব্রাইট স্কলারশিপের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ শেষ করে তাঁরা আবার ইউনিফর্ম পরে দায়িত্বে ফিরে আসেন।
 
কয়েকদিন অপেক্ষার পর এক সন্ধ্যায় হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। ওপাশ থেকে ভেসে আসে কণ্ঠস্বর, “হ্যালো, আমি আজীথা বলছি। বলুন।” মুহূর্তের মধ্যেই আপনি যেন ছোট বাচ্চার মতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। কারণ ফোনের ওপাশে আছেন একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা, ক্রাইম ব্রাঞ্চের IG।
 
তিনি বয়সে আপনার অর্ধেকের মতো। কিন্তু তবু পুলিশকে নিয়ে আমাদের মনে এক ধরনের ভয় কাজ করে। এত পুলিশ অফিসারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, কত পুলিশ স্টেশনে যাওয়া হয়েছে, তবু পুলিশ মানেই যেন এক ধরনের ভীতির অনুভূতি। হয়তো কারণ, আমরা তাঁদের কঠোর, অপরাধীদের কাছে ভয়ংকর এবং কিছুটা আক্রমণাত্মক হিসেবেই ভাবতে অভ্যস্ত, যা খুব সহজে আপন করে নেয় না।
 
আজীথা বেগম সুলতানা কিছু মহিলাদের সঙ্গে
 
কিন্তু আজীথার কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই সেই ভয় দূর করে দেয়। তাঁর কথায় যেন এক মায়ের উষ্ণতা, দুই সন্তানের মায়ের কোমলতা এবং তামিলনাড়ুর কোনো দূর গ্রামে বড় হয়ে ওঠা এক সাধারণ মেয়ের সরলতা ও আন্তরিকতা ধরা পড়ে।
 
এরপর প্রশ্ন ও উত্তরের ধারাবাহিকতা শুরু হয়। ভয় কেটে যায়, আর পুলিশ অফিসারটিও যেন একজন সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠেন। কীভাবে তিনি এত দৃঢ় একজন পুলিশ অফিসারে পরিণত হলেন? কোথা থেকে এল তাঁর আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তা? তিনি কি সবসময়ই এমন ছিলেন? তিনি বলেন, “আমি সবসময় এত আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না। আমি তো কোয়েম্বাটুরের এক সাধারণ পরিবার থেকে এসেছি।” বছরের পর বছর ধরে সেই আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। পরিবারের কথা এবং কীভাবে তিনি প্রশাসনিক পরিষেবায় এলেন, সেসব বিষয়ও তিনি সংক্ষেপে তুলে ধরেন।
 
অশিক্ষিত বাবা–মায়ের ঘরে তাঁর জন্ম। তাঁদের পরিবারে মেয়েদের সাধারণত ১৮ বছর হলেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো। তাঁর বড় বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর, কলেজের প্রথম বছরেই তাঁর বিয়ের কথাও ওঠে। কিন্তু তিনি তখন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর শিক্ষকরা তাঁকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। সেই উৎসাহ তিনি গুরুত্ব সহকারে নেন।
 
যখন তাঁর বিয়ের পালা আসে, তখন বাবা–মা চাপ দিতে শুরু করেন। কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে আপত্তি জানান এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এরপর তাঁর বাবা চান তিনি সিভিল সার্ভিসের জন্য চেষ্টা করুন এবং IAS হন। তখন তিনি ঠিকমতো জানতেনও না বিষয়টি কী। তবু প্রস্তুতি নেন এবং শেষ পর্যন্ত IPS-এ নির্বাচিত হন।
 
আজীথা বেগম সুলতানা তাঁর স্বামী সাহতিশ বিনোর সঙ্গে
 
শৈশবে তিনি দেখেছেন, সরকারি সুবিধা পেতে তাঁর বাবাকে কত দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে এবং কত জায়গায় ঘুষের দাবির মুখে পড়তে হয়েছে। সেখান থেকেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার মানুষের কষ্ট ও ক্ষোভ যেন তাঁর ভেতরে জমে ছিল।
 
তিনি বলেন, আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে এসেছে। তবে মানুষ হিসেবে তিনি একটুও বদলাননি। “IPS-এ যোগ দেওয়ার আগে আমি যেমন সরল ছিলাম, এখনও তেমনই আছি। আমার কাছের মানুষরা জানে, আমি মোটেই বদলাইনি,” তিনি বলেন। তিনি আরও বলেন, “শেষ পর্যন্ত এটি আর পাঁচটা সরকারি চাকরির মতোই, তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক সম্মান, ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব।” তবে একজন নারী অফিসার হিসেবে স্বীকৃতি পেতে কিছুটা সময় লেগেছিল।
 
২০০৮ সালে জম্মু ও কাশ্মীর ক্যাডারে প্রথম পোস্টিংয়ের সময় তিনি প্রথম বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। সেখানে সমস্যা ছিল না লিঙ্গ নিয়ে, বরং ভাষা নিয়ে। “ডোগরি বা হিন্দি বুঝতাম না, আর সব ফাইলই উর্দুতে লেখা ছিল, তাই খুব কষ্ট হতো,” তিনি বলেন। তবে মানুষের সরলতা ও বিনয় তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।
 
২০১৯ সালে তিনি কেরালা ক্যাডারে আসেন। তখন তাঁর জীবন অনেকটাই বদলে যায়। এখানে অন্তত তিনি সবকিছু বুঝতে পারতেন, পড়তেও পারতেন। কেরালায় যোগ দেওয়ার আগে তাঁকে বাধ্যতামূলক ভাষা পরীক্ষাও পাস করতে হয়েছিল।
 
আজীথা বেগম সুলতানা তাঁর স্বামী সাহতিশ বিনোর সঙ্গে
 
লিঙ্গবৈষম্যের প্রসঙ্গে তিনি থ্রিসুরে SP হিসেবে কাজ করার সময়কার একটি ঘটনা মনে করেন। তিনি বলেন “একবার অপরাধ বিষয়ক একটি বৈঠকে আমি বক্তব্য দিচ্ছিলাম। হলে অনেক সিনিয়র অফিসার ছিলেন এবং সব বিধায়কদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু আমি নতুন SP এবং একজন নারী হওয়ায় উপস্থিতি খুব কম ছিল,”। তবে এসব বিষয় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ শেষ পর্যন্ত পদ এবং দায়িত্বকেই গুরুত্ব দেয়, তাঁর মতে।
 
প্রশিক্ষণকেন্দ্রে তাঁর মেন্টরের কথা তিনি আজও মনে রাখেন, “আমার মেন্টর বলতেন, ২৫ বছর বয়সেও তোমাকে সঠিক হতে হবে। ভুল করার সুযোগ নেই। এক-দুবার ভুল করলে চিরদিনের জন্য সেই পরিচয় লেগে যাবে।” এই কথাগুলো তিনি সবসময় হৃদয়ে ধারণ করেছেন। তিনি বলেন, “এই পেশাটিই একমাত্র যেখানে খুব অল্প বয়সেই মানুষের কাঁধে বিশাল দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়।”
 
লিঙ্গ সমতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেরালায় পদোন্নতির ক্ষেত্রে নারী–পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কেরালায় আসার পর তিনি দ্রুত অতিরিক্ত SP পদ পান, অথচ জম্মু–কাশ্মীর ক্যাডারে তাঁর ব্যাচমেট অনেক পরে SP হন।
 
‘দ্য কেরালা স্টোরি’ বিতর্ক নিয়ে তিনি মন্তব্য করেননি, তবে বলেন যে রাজ্যে POCSO মামলার হার অনেক বেশি। এর একটি বড় কারণ হচ্ছে অপরাধের ভালো রিপোর্টিং। মালয়ালম চলচ্চিত্র জগতে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে হেমা কমিটির প্রতিবেদনের তদন্তকারী SIT দলের সদস্য হিসেবেও তিনি কাজ করছেন। তিনি বলেন, শিশু ও নারীর সুরক্ষা তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার, বিশেষ করে মানব পাচার, যৌন হয়রানি এবং মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই।
 

তিনি রাজ্যের স্টেট পুলিশ ক্যাডেট (SPC) কর্মসূচির রাজ্য নোডাল অফিসারও। কেরালা থেকেই এই কর্মসূচির সূচনা হয়েছিল এবং পরে অনেক রাজ্য তা গ্রহণ করে। এই কর্মসূচি তাঁর খুব কাছের। সামাজিক সচেতনতা, শৃঙ্খলা এবং তরুণদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতেই এর লক্ষ্য। তিনি জানান, প্রায় ১০৪৮টি স্কুল ইতিমধ্যেই এই SPC প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
 
এদিকে ফোনের মাঝেই আবার নতুন কল আসে, আর তিনি আবার কাজের ভিড়ে হারিয়ে যান। তবে এই অল্প সময়ের কথোপকথনে তিনি যেন রেখে যান বহু বছরের পরিশ্রম, সংগ্রাম এবং সেবার গল্প, কোয়েম্বাটুরের এক সাধারণ মেয়ের IPS প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে নানা পোস্টিং, চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে আজ কেরালার ক্রাইম ব্রাঞ্চের IG হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথচলা।
 
২০২৫ সালের শেষ দিকে এক SPC অ্যালামনাই সভায় ছাত্র পুলিশ ক্যাডেটদের উদ্দেশে তিনি মালয়ালম ভাষায় বক্তৃতা দেন, এত নিখুঁত উচ্চারণে যে যেকোনো মালয়ালি গর্ববোধ করতে পারেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল সহমর্মিতা, দৃঢ়তা এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার উদ্দীপনা। বিশেষ করে মাদকাসক্তির মতো সমস্যায় জর্জরিত তরুণদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। এ যেন ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের কণ্ঠ নয়, বরং আশার কণ্ঠ।