১৮ বছর ৮ মাস পর কলকাতায় তসলিমা নাসরিন, নতুন করে আলোচনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নির্বাসনের ইতিহাস
কলকাতা:
প্রায় ১৮ বছর ৮ মাস পর কলকাতায় ফিরলেন বাংলাদেশি নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ২০০৭ সালে তৎকালীন রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জেরে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর এবারই প্রথম তিনি প্রকাশ্যে শহরে এলেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি সাহিত্যিক সফর নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক আপস এবং লেখকদের নিরাপত্তা নিয়ে পুরনো বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
কলকাতায় পৌঁছে তসলিমা বলেন, "অন্যায় দীর্ঘদিন চলতে পারে, কিন্তু চিরস্থায়ী হয় না।" শহরে ফিরে আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, কলকাতা তাঁর কাছে সবসময়ই "নিজের শহর" ছিল এবং দীর্ঘদিন পর ফিরে আসতে পেরে তিনি আপ্লুত।
তসলিমা নাসরিন ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর দীর্ঘ সময় কলকাতায় থাকলেও ২০০৭ সালে তাঁর লেখা ও উপস্থিতি ঘিরে বিক্ষোভের জেরে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তাঁকে শহর ছাড়তে হয়। পরবর্তী সময়েও পশ্চিমবঙ্গে তাঁর প্রত্যাবর্তন আর সম্ভব হয়নি। এবার বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর কলকাতা সফর নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, তসলিমা নাসরিন যখন খুশি কলকাতায় আসতে পারবেন এবং তাঁর নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব নেবে রাজ্য সরকার। তিনি বলেন, "হুমকির রাজনীতির দিন শেষ।" এই ঘোষণার পর তসলিমার প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, তসলিমার কলকাতায় ফেরা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও একটি প্রতীকী ঘটনা। বহু বছর ধরে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ ছিল যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোট-রাজনীতির সমীকরণের কারণে তাঁকে কলকাতায় ফিরতে দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, সেই সময় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ছিল সম্ভাব্য অশান্তি এড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ। এই দুই ভিন্ন ব্যাখ্যাই নতুন করে জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে বাংলাদেশে তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন নিয়েও আবার প্রশ্ন উঠছে। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় মৌলবাদ নিয়ে তাঁর লেখালেখি এবং তার জেরে দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা—এই বিষয়গুলিও তাঁর কলকাতা সফরের পর আবার আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে, ১৮ বছর পর তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরা শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, লেখকের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনারও সূচনা করেছে।