জ্যান্ত কেউটেকেই ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’ রূপে পুজো! পূর্ব বর্ধমানের পলসোনা গ্রামে অনন্য ঐতিহ্য

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 13 h ago
সাপ নয়, ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’! জ্যান্ত কেউটে পুজোয় মুখর পূর্ব বর্ধমানের পলসোনা
সাপ নয়, ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’! জ্যান্ত কেউটে পুজোয় মুখর পূর্ব বর্ধমানের পলসোনা
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের পলসোনা গ্রামে জ্যান্ত কেউটে সাপের পুজো করা হল ধুমধাম করে। এই গ্রামে সাপকে দেবী জ্ঞানে পুজো করা হয়। তাই এই গ্রামের মানুষ এই সাপকে ‘সাপ’ বলে ডাকেন না। তাঁদের কাছে তিনি ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’। প্রতি বছর এই পুজোকে কেন্দ্র করে ভিড় জমান বহু দুরদুরান্তের ভক্তরা। পূর্ব বর্ধমানের পলসোনা গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় অবাধে ঘুরে বেড়ায় বিষধর কেউটে। 
 
গ্রামের বাসিন্দারা দাবি করলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁরা যত্রতত্র সাপকে ঘুরে বেড়াতে দেখে আসছেন। গ্রামবাসীরা বললেন, সাপগুলি কখনও গ্রামের মানুষের ক্ষতি করেনি। বিষাক্ত ফণার সামনে সাধারণ মানুষের বুক কাঁপলেও পলসোনা গ্রামে দৃশ্যটা একদম বিপরীতমুখী। স্থানীয়রা জানালেন, বিষধর কেউটেরা ঘরের উঠোন বা আশপাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু গ্রামবাসীরা সাপের ভয়ে পিছিয়ে না এসে ভক্তিভরে মাথা নোয়ায়। 
 
মা ঝঙ্কেশ্বরী মন্দির
 
কারণ, তাঁদের কাছে এই সরীসৃপ সাক্ষাৎ দেবীসরূপ, ‘মা ঝঙ্কেশ্বরী’ নামে এই গ্রামে পরিচিতি। বৃহস্পতিবার মহা সমারোহে পলসোনা গ্রামে জাঁকজমক আয়োজনে জীবন্ত কেউটে সাপের পুজো করা হল। গ্রামজুড়ে অবাধে ঘুরে বেড়ানো মারাত্মক বিষধর সাপকে দেবী রূপে পুজো করার এই প্রাচীন ঐতিহ্য দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন দূর-দূরান্তের বহু জেলার মানুষজন।
 
এই গ্রামের মেয়ে প্রিয়া মুখোপাধ্যায়ের কথায় জীবন্ত হয়ে ওঠে সাপের সঙ্গে এই অলৌকিক সহাবস্থানের বিষয়টি। তিনি বলেন, ছোট থেকেই আমরা মায়ের সঙ্গেই বড় হয়েছি। উনি কখনও আমাদের গ্রামের কোন ক্ষতি করেননি। আমাদের ঘরের সর্বত্র উনি ঘুরে বেড়ালেও আমরা নিশ্চিন্ত। আর এইদিনের পুজোই আমাদের প্রধান উৎসব। 
 
গ্রামবাসীদের অটল বিশ্বাস, মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলা-লক্ষিন্দরের অলৌকিক আখ্যানেরই জীবন্ত রূপ এই ঝঙ্কেশ্বরী দেবী। এই গ্রামের খুব আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাপের দংশন এখানে বলা হয় না। তেমনটা কখনও ঘটলে দংশনের বদলে এখানকার মানুষ অনায়াসে বলেন ‘দেবীর প্রসাদ’।
 
পুজোর দিন সন্ধ্যায় গ্রাম পরিক্রমার পর মন্দিরের সামনে একটি মাটির কলস ভাঙা হয়। গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করেন, এদিনের এই ভাঙা কলসের টুকরো ঘরে রাখলে আর কোনও বিষধর সাপ সেই ভিটেয় পা রাখে না। এদিনে পুজোয় উপস্থিত নিয়ে মঙ্গলকোটের বিধায়ক শিশির ঘোষ বলেন, আমি এই মন্দিরে পুজো দিয়ে সর্বসাধারণের মঙ্গল ও মঙ্গলকোটের উন্নতির জন্য মা ঝঙ্কেশ্বরীর আশীর্বাদ নিলাম।
 

শুধু পলসোনা নয়, মঙ্গলকোট ও ভাতারের মোট সাতটি গ্রামে এই ঝঙ্কেশ্বরী পুজোর রেওয়াজ রয়েছে এমন করেই। মন্দিরে জ্যান্ত সাপের পুজোর এই দৃশ্য দেখে বিজ্ঞানীদের কাছেও এটি এক অপার কৌতূহলের বিষয়। সর্পবিশারদ ধীমান ভট্টাচার্য জানান, এই সাপের বিজ্ঞানসম্মত নাম Naja kaouthia বা ভারতীয় কেউটে। তিনি দাবি করলেন, এই সাপ অত্যন্ত বিষধর হলেও দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের কারণে সাপ ও মানুষের মধ্যে এক সূক্ষ্ম পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। গ্রামবাসীরা তাদের আঘাত বা অসুবিধের সৃষ্টি করে না, তাই গ্রামে ঘুরে বেড়ালেও সাপও তাঁদের আক্রমণ করে না। 
 
বলা ভালো, জ্যান্ত সাপকে দেবী বলে পুজো করার এই প্রথাই গড়ে তুলেছে গ্রামের অনন্য ঐতিহ্য। মঙ্গলকোট এলাকায় এলে দেখা মিলবে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়েও মানুষ ও প্রকৃতির এই আত্মিক বন্ধনকে।