শতাব্দী প্রাচীন ক্লাবে আবারো ঘনিয়ে এসেছে কালো মেঘ, নতুন সচিবের দেয়া তিন কোটি টাকা বাউন্স, ঝরে পড়ছে কর্মকর্তাদের ক্ষোভ!
শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী
শতাব্দী প্রাচীন ক্লাব মহমেডান স্পোর্টিংয়ে আবারও ঘনিয়ে এসেছে কালো মেঘ। অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত শতাব্দী প্রাচীন ক্লাবটি ছয় জুন নতুন সভাপতি হুমায়ুন কবিরের আগমনে সদস্য সমর্থকরা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন, ক্লাব হয়তো এবার সুদিন দেখবে। অনেক প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছিলেন। তা থেকে সদস্য সমর্থকদের এই স্বপ্ন দেখাটা স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছে।
ঘটনাটা এরকম- সূত্রমতে জানা গেছে, কয়েকদিন আগে ক্লাবের নবনির্বাচিত সভাপতি হুমায়ুন কবিরের জমা দেওয়া মোট দেড় কোটি টাকার তিনটি চেক ব্যাংক কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব আবারো সেই একই জায়গায় চলে এসেছে।
হুমায়ুন কবির
জানা গেছে, কবির ১৭ জুলাই, ২০ জুলাই এবং ৩০ জুলাই ৫০ লক্ষ টাকা করে তিনটি চেক ইস্যু করেন। সেই তিনটি চেকই ব্যাংক থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় শতবর্ষী ক্লাবটি তার আর্থিক দায় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।সুতরাং আবার বিতর্কে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও মহমেডান ক্লাবের নতুন সভাপতি হুমায়ুন কবির।
ক্লাবের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট খেলোয়াড় আব্দুল কাদিরির বকেয়া মেটাতে সমস্যায় পড়েন। এমনকি ফিফা ট্রান্সফার বয়ানের আওতায় থাকায় কোনও নতুন খেলোয়াড় কিনতে পারেনি মহমেডান। শেষে কর্তারাই নিজেদের উদ্যোগে বকেয়া মিটিয়ে ক্লাবকে নির্বাসনের কাঁটা থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা করেন।
ক্লাবের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, অপ্রত্যাশিতভাবে চেকটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় আর্থিক পরিকল্পনা ব্যাহত হয়েছে এবং বর্তমান প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ক্লাব সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন ফুটবল মরসুমের প্রস্তুতির সময়ে এই ঘটনাটি ক্লাবের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আবার উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।সচিব ওয়াসিম আক্রমসহ অন্যান্য কর্তারা সভাপতির প্রতিশ্রুত অর্থ না পাওয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে হুমায়ুনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,“ক্লাবের প্রেসিডেন্ট আমি, তাই চেক হোল্ডারও আমিই। তাহলে কেউ নিজের সঙ্গে কীভাবে প্রতারণা করবে? আমি আমার ক্লাবের স্বার্থে চেক জমা দিয়েছি। আজ শেষ দিন হলেও ৩-৪ দিন পরে ক্লিয়ার করতে পারি। কে কী বলবে? কটা দিন এদিক-ওদিক হতে পারে। আমাদের ক্লাব সচিব ফিফার থেকে অতিরিক্ত সময় চেয়ে নিয়েছে। আমি প্রেসিডেন্ট, আমি যা বলব তাই হবে। কেউ আমার পারমিশন ছাড়া কেন আগে থেকে চেক জমা করতে গিয়েছে? ২-৪ দিনের মধ্যে এই সমস্যা মিটে যাবে। আমি কারও সঙ্গে কোনও দুর্নীতি করিনি।”
মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব
অন্যদিকে, ক্লাবের সহ-সভাপতি ওয়াসিম আক্রম দাবি করেন, সভাপতি যে তিনটি চেক দিয়েছিলেন, তিনটিই ব্যাঙ্ক থেকে ফেরত এসেছে। তাঁর কথায়, হুমায়ুন কবীর যে তারিখে চেক জমা দিতে বলেছিলেন, সেই দিনেই তা জমা দেওয়া হয়েছিল এবং তখনই ব্যাঙ্ক জানায় অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ নেই।
ক্লাবের সচিব এ ব্যাপারে বেশ ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, “যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে উনি সভাপতি হয়েছিলেন, তা এখনও মেটাতে পারেননি। আজ পর্যন্ত একটি টাকাও উনি দেননি। ১৩ কোটি টাকার বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার পর থেকে বিভিন্ন তারিখের কথা বলে যাচ্ছেন। কোনওটিই সঠিক হয়নি।”
মহমেডান ক্লাবের সভাপতি হওয়ার পর হুমায়ুন কবির আশ্বাস দিয়েছিলেন, যাবতীয় বকেয়া মিটিয়ে দেবেন। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগকারীও নিয়ে আসবেন। দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ হয়নি। এ বার প্রথম প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে গিয়েও ধাক্কা খেলেন নতুন সভাপতি হুমায়ুন কবীর। তাঁর দেওয়া দেড় কোটি টাকার চেক ‘বাউন্স’ হয়েছে বলে দাবি করেছে ক্লাব। ফলে ফুটবলারদের বেতন দিতে গিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। যদিও হুমায়ুনের আশ্বাস, সমস্যা মিটে যাবে ১০ অগস্টের মধ্যে। তবে ক্লাবকর্তারা ক্ষুব্ধ। তাঁদের দাবি, দায়িত্ব পূরণে নতুন সভাপতি ব্যর্থ হয়েছেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, তিনটি চেকই বাউন্স হওয়ার ফলে বকেয়া মেটানোর যে পরিকল্পনা ক্লাবকর্তারা নিয়েছিলেন, তা ধাক্কা খেয়েছে। এমনিতেই ফিফার ট্রান্সফার নির্বাসন থাকায় কোনও নতুন ফুটবলার গতবার কিনতে পারেনি মহমেডান। অনেক কষ্টে নির্বাসন ওঠানো গিয়েছে। এখন পুরনো বেতন মেটাতে না পারলে আবার নির্বাসিত হতে হবে ক্লাবকে।
সহ সচিব আক্রম এও বলছেন, “ক্লাবের বোর্ড অফ ট্রাস্টির সদস্য হিসাবে আমাকে জিজ্ঞাসা করতেই হবে কেন এমনটা হল? উনি সম্ভবত বিষয়টা হালকা ভাবে নিচ্ছেন। কিন্তু এ ভাবে চললে আমরা আবার নির্বাসিত হব। তখন মহমেডান ক্লাব শেষ হয়ে যাবে। উনি সেটা বুঝতেই পারছেন না। মহমেডান ক্লাব এখন দেনায় ডুবে আছে। ১ অগস্টের মধ্যে ফুটবলার এবং কর্মীদের বেতন দিতে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা লাগবে আমাদের। হয়তো দুই একটা দিন আরও অপেক্ষা করা যেতে পারে।কোথা থেকে দেব? তা ছাড়া উনি যে ভাবে একটা অভ্যন্তরীণ বিষয় প্রকাশ্যে এনে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কথা বলে বেড়াচ্ছেন, তাতে আমরা এটাকে ভালো মনে করি না।”
এই অচলাবস্থার মধ্যেই বারানসী ক্লাব বাঘপত এফসির বিরুদ্ধে জয় দিয়ে নিজেদের ডুরান্ড কাপ যাত্রা শুরু করেছে মেহরাজউদ্দিনের টিম। কিন্তু আর্থিক অচলাবস্থা না মিটলে আইএসএল-এর মতো খারাপ অবস্থা হবে ক্লাবের, এমনটাই আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তা থেকে সমর্থকরা।