আওয়াজ – দ্য ভয়েস / গুয়াহাটি
ফুটবলের জগতে অনুশীলন চলে ঘড়ির কাঁটার মতোই নিরবচ্ছিন্নভাবে। মাঠে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই খেলোয়াড়দের মেনে চলতে হয় কঠোর ও নির্দিষ্ট নিয়ম, প্রথমে ওয়ার্ম-আপ, তারপর দোয়া (প্রার্থনা), আর তারপর শুরু হয় কঠিন পরিশ্রম। গত ৮ মার্চ, পাঞ্জাব এফসির বিরুদ্ধে ম্যাচের একদিন আগে নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি দলও ঠিক তেমনভাবেই অনুশীলনে ব্যস্ত ছিল। সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই দলের ছন্দ কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল।
অনুশীলন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দলের এক কর্মীর মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোনটি ছিল মহারাষ্ট্রের পেশাদার ফুটবলার এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আশীর আখতারের জন্য। দলের প্রধান কোচ হুয়ান পেদ্রো বেনালি আগেই পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারলেন ফোনটির তাৎপর্য। স্পষ্ট হয়ে গেল, আশীর আর দলের সঙ্গে নির্ধারিত ফ্লাইটে দিল্লি যেতে পারবেন না।
আবেগাপ্লুত হয়ে কোচ বেনালি আশীরকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আশীর, আমাদের জন্য দোয়া করো এবং যাও।” কয়েক মিনিটের মধ্যেই আশীর হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এল সেই আনন্দের খবর, আশীর এবং তাঁর স্ত্রীর কোল আলো করে জন্ম নিল তাদের দ্বিতীয় পুত্রসন্তান। মা ও শিশু দুজনেই সম্পূর্ণ সুস্থ।
একদিকে পরিবার নতুন সদস্যকে বরণ করে আনন্দে মেতে উঠেছে, অন্যদিকে দলের ম্যানেজমেন্ট শুরু করেছে তৎপরতা। দলের ম্যানেজার দিল্লি যাওয়ার পরবর্তী সম্ভাব্য ফ্লাইটের খোঁজ নিতে লাগলেন। কারণ ছিল আশীরের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, যাই হোক না কেন, তিনি এই ম্যাচটি কোনোভাবেই মিস করতে চান না।
পুত্রের জন্মের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আশীর বিমানে উঠে দিল্লিতে দলের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ফুটবল এবং দলের প্রতি তাঁর গভীর একাগ্রতা ও নিষ্ঠার উজ্জ্বল প্রমাণ। আনন্দে আপ্লুত হয়ে আশীর বলেন, “পুত্রের আগমনে আমি ভীষণ খুশি। আমার বড় ছেলে এখন একটি ছোট ভাই পেল।”
তিনি আরও বলেন, “আমার স্ত্রী সবসময় আমাকে সমর্থন করেছেন। এবারও তিনিই আমাকে বলেছেন, সন্তানের জন্মের পর দলের কাছে ফিরে যাওয়াই উচিত। তাঁর এই কথাতেই আমার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছে। দলের অধিনায়ক হিসেবে আমি জানতাম, আমার দ্বিতীয় পরিবারও আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
সোমবার পাঞ্জাব এফসির বিরুদ্ধে ম্যাচে আশীর প্রথম একাদশে ছিলেন। ম্যাচে নর্থইস্ট ইউনাইটেড যখন প্রথম গোলটি করে, তখন গোলদাতা পার্থিব গগৈ সেই গোলটি উৎসর্গ করেন আশীরের নবজাতক পুত্রকে, যা সতীর্থের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন। মাঠের এই আবেগঘন মুহূর্ত প্রমাণ করে, দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কতটা গভীর বন্ধন রয়েছে।
এই ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে আশীর বলেন, “পার্থিব এবং দলের এই আচরণ সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। আমাদের সন্তানের আগমন আমাদের এই মরশুমের প্রথম জয় এনে দেওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে।”
উল্লেখযোগ্য যে, এই রবিবার গুয়াহাটিতে নিজেদের ঘরের মাঠে নর্থইস্ট ইউনাইটেড মুখোমুখি হবে জামশেদপুর এফসির। আশীর বরাবরের মতোই দলে থাকবেন। সাধারণত তাঁর পরিবার গুয়াহাটিতেই থাকে এবং প্রতিটি ম্যাচে স্ট্যান্ডে উপস্থিত থেকে তাঁকে উৎসাহ দেয়। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা, স্ট্যান্ডে কেবল আশীরের পিতাকেই দেখা যাবে। তাঁর মা, স্ত্রী এবং বড় ছেলে বাড়িতেই থেকে নবজাতককে যত্ন করবে এবং টেলিভিশনের পর্দায় ম্যাচ দেখে আশীরকে উৎসাহ জানাবে।