ইসলামোফোবিয়ার ইতিহাস: ঘৃণার সময়ে বোঝাপড়ার সন্ধান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
সাকিব সেলিম

২০২২ সালে জাতিসংঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সংস্থাটি ১৫ মার্চকে ‘ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। আজ আমরা যে ‘ইসলামোফোবিয়া’ শব্দটি বারবার শুনি, তার ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরোনো। ১৯৯৭ সালে ব্রিটেনের চিন্তাকেন্দ্র 'রানিমেড ট্রাস্ট' (Runnymede Trust) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর থেকেই শব্দটি সাধারণ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
 
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ‘সভ্যতার সংঘর্ষ’ তত্ত্বের প্রসারের পর পশ্চিমা সমাজে মুসলমানদের প্রতি সন্দেহ ও ঘৃণার এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ৯/১১ হামলার পর সেই প্রবণতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। জাতিসংঘও স্বীকার করেছে যে ইসলামোফোবিয়া আজ এমন এক বৈশ্বিক সমস্যা, যা অনেক ক্ষেত্রে বর্ণবাদ ও ইহুদিবিদ্বেষ (অ্যান্টি-সেমিটিজম)-এর মতোই গুরুতর আকার ধারণ করেছে।
 

শব্দের উৎপত্তি ও প্রাচীন প্রেক্ষাপট
 
‘ইসলামোফোবিয়া’ শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯১০ সালে। ফ্রান্সের এক গবেষক আলেন কুইলিয়েন তাঁর ডক্টরেট থিসিসে এই শব্দটি ব্যবহার করেন। গবেষক জাফর ইকবাল তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সেই সময়ে ইউরোপীয় সমাজে ইসলামের প্রতি যে নেতিবাচক মনোভাব ছিল, কুইলিয়েন সেটিরই সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, ইসলামোফোবিয়া আসলে বর্ণবাদেরই এক রূপ, যেখানে ইসলামকে ইউরোপের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখানো হয় এবং পুরো একটি সভ্যতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়।
 
যদিও ১৯৯৭ সালের আগে এই শব্দটি খুব বেশি প্রচলিত ছিল না, কিন্তু রানিমেড ট্রাস্টের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় আসে। সেখানে ইসলামোফোবিয়াকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ইসলামের প্রতি অযৌক্তিক ভয় বা বিদ্বেষ হিসেবে, যার ফলস্বরূপ মুসলমান ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য তৈরি হয় এবং তাদের সমাজ ও রাজনীতির মূলধারা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।
 
বিরোধিতা ও বিতর্ক
 
তবে সেই সময়েও এই ধারণা নিয়ে বিতর্ক ছিল। আজও অনেকেই যুক্তি দেন যে ‘ইসলামোফোবিয়া’ শব্দটি নাকি ইসলামের বৈধ সমালোচনাকে দমন করার জন্য ব্যবহার করা হয়। কিছু সংবাদমাধ্যম রানিমেড ট্রাস্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে তারা মুসলিম সমাজের সমস্যা আড়াল করতে ‘রাজনৈতিকভাবে শুদ্ধ’ হওয়ার চেষ্টা করছে।
 
প্রতীকী ছবি
 
কিন্তু প্রতিবেদনটির লেখকদের যুক্তি ছিল ভিন্ন। তাদের মতে, ইউরোপে ইহুদিদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা ঘৃণাকে চিহ্নিত করার জন্য যেমন ‘অ্যান্টি-সেমিটিজম’ শব্দটির প্রয়োজন হয়েছে, তেমনই মুসলমানদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা পক্ষপাত ও বিদ্বেষ বোঝাতে ‘ইসলামোফোবিয়া’ শব্দটিরও প্রয়োজন রয়েছে। তারা স্পষ্ট করে বলেন, ইসলামী আইন বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নীতির সমালোচনা করা ইসলামোফোবিয়া নয়। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ইসলামের প্রতি একেবারে ‘বন্ধ মানসিকতা’ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।
 
বন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি বনাম উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি
 
রানিমেড ট্রাস্টের প্রতিবেদনে ইসলামোফোবিয়া বোঝাতে আটটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মূল বিষয় হলো, আমরা কি ইসলামকে একক ও একরকম সত্তা হিসেবে দেখি, নাকি বৈচিত্র্যময় একটি সম্প্রদায় হিসেবে দেখি।
 
ভারতের উদাহরণেই বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায়। এখানে অনেকেই মনে করেন সব মুসলমান একই ধরনের খাবার খান, একই পোশাক পরেন এবং তাদের চিন্তাধারাও একই। বাস্তবে কিন্তু তা নয়। ভারতীয় চলচ্চিত্র ও ফ্যাশন জগতে মুসলিম শিল্পীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া জন্নত জুবাইরও একজন মুসলিম। আবার অনেক মুসলমান নিরামিষভোজী, কেউ কেউ মদ্যপানও করেন। কেউ সংগীত ভালোবাসেন, কেউ তা পছন্দ করেন না। অর্থাৎ মুসলমানরা একরকম মানুষের সমষ্টি নয়, বরং এক বিশাল বৈচিত্র্যের প্রতিফলন। এই বৈচিত্র্যকে বোঝার মধ্য দিয়েই ধর্মনিরপেক্ষতা ও পারস্পরিক সম্মান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
 
আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, ইসলাম নাকি তার অনুসারীদের অন্য সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে রাখে। ভারতে প্রায়ই বলা হয় মুসলিম সংস্কৃতি নাকি হিন্দু বা শিখ সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই উল্টো। বিদেশের অনেক মুসলমান বরং ভারতীয় মুসলমানদের সমালোচনা করেন এই বলে যে তারা হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব অনেকটাই গ্রহণ করেছেন। ভারতের অনেক মুসলমানই তাদের অঞ্চলের সংস্কৃতি অনুযায়ী সিঁদুর বা খারু পরার মতো কিছু সামাজিক রীতিও পালন করেন। পৃথিবীর প্রায় সব সমাজেই মুসলমান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।
 
রাজনীতি ও ভয়ের পরিবেশ
 
ইসলামোফোবিয়ার আরেকটি দিক হলো ইসলামকে কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে দেখা। ফলে মুসলমানদের সাধারণ সামাজিক কর্মকাণ্ডও অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। প্রেমকে ‘লাভ জিহাদ’ বলা হয়, জমি কেনাকে বলা হয় ‘ভূমি জিহাদ’। অথচ উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ ইসলামকে একটি ধর্ম হিসেবেই দেখেন, যেখানে মানুষের মধ্যে ভালো ও খারাপ উভয় প্রবণতাই থাকতে পারে।
 
এই ঘৃণার পরিবেশ বৈষম্যকে ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের কারণে মুসলমানদের হাউজিং সোসাইটিতে বাড়ি ভাড়া বা কেনার অনুমতি দেওয়া হয় না। পোশাকের কারণে স্কুলের দরজাও বন্ধ হয়ে যায়। অথচ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইসলামের সঙ্গে মতাদর্শগত মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু বৈষম্যমূলক আচরণ কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
 
প্রতীকী ছবি
 
সমাজের উপর এর প্রভাব
 
ইসলামোফোবিয়া শুধু মুসলমানদের জন্যই বিপজ্জনক নয়; এটি পুরো সমাজের জন্যই ক্ষতিকর। এর কয়েকটি গুরুতর প্রভাব হলো-
 
অন্যায়: এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বহুত্ববাদী সমাজ গড়ে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করে।
 
যুবসমাজের উপর প্রভাব: সংবাদমাধ্যমে ধারাবাহিক নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরার ফলে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি হতে পারে। অনেক সময় এই হতাশা তাদের উগ্র গোষ্ঠীর দিকে ঠেলে দেয়, যারা ভুয়া পরিচয়ের এক মিথ্যা আশ্রয় দেয়।
 
সামাজিক অস্থিরতা: এই প্রবণতা সমাজে সংঘাত ও উত্তেজনা বাড়ায়।
 
মধ্যপন্থী কণ্ঠের দমন: ঘৃণার পরিবেশে মুসলিম সমাজের যুক্তিবাদী ও মধ্যপন্থী কণ্ঠস্বর অনেক সময় চাপা পড়ে যায়।
 
অর্থনৈতিক ক্ষতি: বৈষম্যের কারণে প্রতিভা ও সম্ভাবনার সঠিক ব্যবহার হয় না, যা শেষ পর্যন্ত একটি দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করে।
 
পারস্পরিক সহযোগিতার অভাব: বিশ্বাসের সংকট তৈরি হলে মুসলমান ও অমুসলমানরা একসঙ্গে কাজ করে দারিদ্র্য বা রোগের মতো সাধারণ সমস্যার সমাধান করতে পারে না।
 
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রভাব: ইসলামোফোবিয়া বাণিজ্য, কূটনীতি এবং বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
 
গবেষক জাফর ইকবাল মনে করেন, ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে মুসলমানদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে গভীরভাবে বোঝা জরুরি। ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, আঞ্চলিক পরিচয় বা ধর্মীয় চর্চার ক্ষেত্রে মুসলমানদের মধ্যে নানা ধরনের বৈচিত্র্য রয়েছে। আজ বিশ্বের মুসলমানদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই কুসংস্কার ও ভুল ধারণার মোকাবিলা করা।
 
মানুষকে যখন শুধুমাত্র তাদের ধর্মের পরিচয়ে নয়, বরং তাদের ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের আলোকে দেখা হবে, তখনই এই সমস্যা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে।  বর্ধমান ঘৃণা কমানোর একমাত্র পথ হলো আলোচনা, সংলাপ এবং পারস্পরিক উন্মুক্ততা। একে অপরের বৈচিত্র্যকে সম্মান করাই একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজের প্রকৃত ভিত্তি।
 
(লেখক একজন স্বাধীন সাংবাদিক ও গবেষক)