অন্দরমহলের কান্না থেকে আত্মমর্যাদার জয়গান: প্রয়াণ দিবসে সাহিত্যসম্রাজ্ঞী আশাপূর্ণা দেবীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 12 h ago
অন্দরমহলের কান্না থেকে আত্মমর্যাদার জয়গান: প্রয়াণ দিবসে সাহিত্যসম্রাজ্ঞী আশাপূর্ণা দেবীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি
অন্দরমহলের কান্না থেকে আত্মমর্যাদার জয়গান: প্রয়াণ দিবসে সাহিত্যসম্রাজ্ঞী আশাপূর্ণা দেবীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

বাংলা কথাসাহিত্যের আকাশে কিছু নক্ষত্র কখনও ম্লান হয় না। সময়ের স্রোত বদলায়, সমাজ বদলায়, পাঠকের রুচি বদলায়—তবু তাঁদের সৃষ্টি চিরকাল সমান প্রাসঙ্গিক থেকে যায়। সাহিত্যসম্রাজ্ঞী আশাপূর্ণা দেবী সেই বিরল স্রষ্টাদের অন্যতম। তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং স্মরণ করা বাংলা সমাজজীবনের এক জীবন্ত ইতিহাসকে।
 
১৯০৯ সালের ৮ জানুয়ারি কলকাতার এক সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আশাপূর্ণা দেবী। সে সময় সামাজিক রীতিনীতির কারণে বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ তাঁর হয়নি। কিন্তু ঘরেই বই পড়ে, পরিবারে সাহিত্যচর্চার পরিবেশে বড় হয়ে তিনি নিজের শিক্ষার পথ নিজেই তৈরি করেন। অল্প বয়সেই লেখালেখি শুরু হয়। শিশুদের পত্রিকায় কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে সাহিত্যজীবনের সূচনা হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা কথাসাহিত্যের এক অনন্য উচ্চতা।
 
আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্যজগতের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনকে তুলে ধরা। মধ্যবিত্ত পরিবারের সুখ-দুঃখ, নারীর নীরব বেদনা, সামাজিক বৈষম্য, প্রজন্মের সংঘাত, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং মানুষের অন্তর্জগত তাঁর কলমে এমন স্বাভাবিকভাবে ফুটে উঠেছে যে পাঠক সহজেই নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান।
তাঁর অমর সৃষ্টি 'প্রথম প্রতিশ্রুতি', 'সুবর্ণলতা' এবং 'বকুল কথা' বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ত্রয়ী। সত্যবতী, সুবর্ণলতা এবং বকুল—এই তিন প্রজন্মের নারীর জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন নারীশিক্ষা, আত্মমর্যাদা, স্বাধীন চিন্তা এবং সামাজিক পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস। প্রথম প্রতিশ্রুতি উপন্যাসের জন্য তিনি ভারতীয় সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন। আজও এই ত্রয়ী নারীমুক্তির এক অনন্য সাহিত্যিক দলিল হিসেবে বিবেচিত।
 
এই ত্রয়ীর পাশাপাশি তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলির মধ্যে রয়েছে 'অগ্নিপরীক্ষা', 'যোগ-বিয়োগ', 'বলয়গ্রাস', 'ছায়াসূর্য', 'নেপথ্য নায়িকা', 'লোহারের খাঁচা', 'দোলনা', 'নবজন্ম', 'তপস্যা' এবং আরও বহু স্মরণীয় রচনা। প্রতিটি উপন্যাসে তিনি সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিকে প্রশ্ন করেছেন, তবে কখনও উচ্চকণ্ঠে নয়; গভীর মানবিকতা ও বাস্তবতার মধ্য দিয়ে।ছোটগল্পকার হিসেবেও আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন অসাধারণ। তাঁর গল্পে জীবনের ক্ষুদ্র ঘটনাই হয়ে উঠেছে বড় সত্যের প্রতীক। পরিবারের অবহেলিত মানুষ, গৃহবধূ, শিশু, বৃদ্ধ, কর্মজীবী নারী কিংবা মধ্যবিত্ত সংসারের নীরব মানুষদের তিনি এমন মমতায় এঁকেছেন, যা বাংলা ছোটগল্পকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর গল্পসংকলনগুলির মধ্যে 'গল্পপঞ্চাশৎ', 'সেরা গল্প', 'শ্রেষ্ঠ গল্প', 'কিশোর গল্প সমগ্র' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্যও তিনি অসংখ্য গল্প, উপন্যাস ও ছড়া লিখেছেন, যা বাংলা শিশুসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
 
শুধু উপন্যাস ও গল্প নয়, আশাপূর্ণা দেবীর প্রবন্ধেও ধরা পড়েছে সমাজ ও সময় সম্পর্কে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ। নারীজীবন, পারিবারিক মূল্যবোধ, সাহিত্যচিন্তা এবং সমকালীন সমাজ নিয়ে তাঁর লেখাগুলি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর ভাষা ছিল সহজ, স্বচ্ছ, অলংকারবর্জিত অথচ হৃদয়স্পর্শী। এ কারণেই তাঁর লেখা শিক্ষিত পাঠকের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
 
সাহিত্যজীবনে তিনি রচনা করেছেন দুই শতাধিক উপন্যাস, তিন হাজারেরও বেশি ছোটগল্প, অজস্র প্রবন্ধ, শিশু-কিশোর সাহিত্য এবং অসংখ্য স্মরণীয় রচনা। বাংলা সাহিত্যে এত বিপুল সৃষ্টিকর্মের নজির খুব কমই দেখা যায়। তাঁর সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, পদ্মশ্রী-সহ বহু সম্মানে ভূষিত হন।
১৯৯৫ সালের ১৩ জুলাই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু একজন সাহিত্যিকের মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু নয়। আশাপূর্ণা দেবী আজও বেঁচে আছেন সত্যবতীর প্রতিবাদে, সুবর্ণলতার স্বপ্নে, বকুলের আত্মবিশ্বাসে এবং তাঁর অগণিত চরিত্রের হাসি-কান্নায়। তাঁর প্রতিটি রচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সমাজ বদলায় মানুষের চিন্তায়, শিক্ষায় এবং আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে।
 
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই মহীয়সী সাহিত্যিককে, যিনি বাংলা সাহিত্যে নারীর কণ্ঠকে দিয়েছেন নতুন ভাষা, সাধারণ মানুষের জীবনকে দিয়েছেন অসাধারণ মর্যাদা এবং কলমকে করেছেন সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার। বাংলা সাহিত্য যতদিন বেঁচে থাকবে, আশাপূর্ণা দেবীর সৃষ্টি ততদিন আলো দেখাবে আগামী প্রজন্মকে।
 
শ্রদ্ধাঞ্জলি" শব্দের মৃত্যু হয় না। স্রষ্টা চলে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি হয়ে ওঠে সময়ের চিরন্তন সাক্ষী। আশাপূর্ণা দেবী সেই অমর স্রষ্টা, যাঁর কলম আজও আমাদের সমাজ, আমাদের বিবেক এবং আমাদের মানবিকতাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। প্রয়াণ দিবসে তাঁকে জানাই অন্তরের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।"


শেহতীয়া খবৰ