বই পোড়ে, না গণতন্ত্র? তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে বাংলার বিবেকের নতুন পরীক্ষা

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 14 h ago
বই পোড়ে, না গণতন্ত্র? তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে বাংলার বিবেকের নতুন পরীক্ষা
বই পোড়ে, না গণতন্ত্র? তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে বাংলার বিবেকের নতুন পরীক্ষা
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

ইতিহাসের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে। সে বারবার ফিরে আসে, তবে কখনও একই রূপে নয়। কখনও একটি বইকে কেন্দ্র করে, কখনও একটি কবিতাকে ঘিরে, কখনও বা একজন লেখকের নামকে সামনে এনে সে সমাজকে প্রশ্ন করে—আমরা কি সত্যিই মুক্ত? নাকি স্বাধীনতার দাবি করি, অথচ ভিন্নমতকে সহ্য করার সাহস এখনও পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি?সাম্প্রতিক সময়ে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলা ভাষার অন্যতম বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের নাম।
 
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর প্রকাশ্য আহ্বানের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তসলিমা কি আবার কলকাতায় ফিরতে পারেন? এখনও এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নিশ্চিত ঘোষণা নেই। ফলে বিষয়টি আপাতত সম্ভাবনার স্তরেই রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাই বাংলার সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক চেতনা নিয়ে একটি পুরনো বিতর্ককে আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।আসলে বিষয়টি কোনও একক ব্যক্তির প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়। এটি বাক্‌স্বাধীনতা, নাগরিক নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক সহিষ্ণুতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের নতুন পর্ব।
 
তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে মতভেদ নতুন নয়। তাঁর সাহিত্যকে কেউ দেখেছেন নারীমুক্তির প্রতিবাদী ভাষা হিসেবে, কেউ আবার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা অতিরঞ্জিত অবস্থান হিসেবে সমালোচনা করেছেন। এই মূল্যায়ন সাহিত্য ও সমাজচিন্তার বিষয়। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রশ্নটি অন্যত্র। কোনও লেখকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার উত্তর কী হবে? পাল্টা যুক্তি, নাকি তাঁকে জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া?
 
বাংলার ইতিহাস বলছে, সাহিত্য ও মতাদর্শের সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। বিদ্যাসাগর সমাজের বিরোধিতা সহ্য করেছেন, রবীন্দ্রনাথ কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন, নজরুলের লেখা নিষিদ্ধ হয়েছে, জীবনানন্দ দাশ জীবদ্দশায় যথাযথ স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু তাঁদের স্থান নির্ধারণ করেছে সময়, কোনও রাজনৈতিক নির্দেশ বা জনরোষ নয়। এটাই বাংলার বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের শক্তি—এখানে তর্ক আছে, মতভেদ আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচার হয়েছে চিন্তা ও সৃষ্টির ভিত্তিতে।
 
এই কারণেই ২০০৭ সালের কলকাতার ঘটনাগুলি এখনও প্রাসঙ্গিক। সহিংস বিক্ষোভ, প্রশাসনিক উদ্বেগ এবং আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নের মধ্যে তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে যেমন যুক্তি রয়েছে, তেমনি তার সমালোচনাও আজও সমানভাবে উচ্চারিত হয়। এক পক্ষ মনে করে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন বাধ্য হয়েছিল। অন্য পক্ষের মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব কোনও লেখককে সরিয়ে দেওয়া নয়; তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
 
এই বিতর্কের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরও বড় প্রশ্ন। গণতন্ত্র কি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের নাম? নাকি এমন এক ব্যবস্থার নাম, যেখানে অপছন্দের মতও নিরাপদে উচ্চারিত হতে পারে?ভারতের সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ নয়। কিন্তু সেই কঠিন কাজটিই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত পরীক্ষা। কারণ রাষ্ট্র যদি ভিন্নমতকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে শুধু একজন লেখক নন, সমগ্র সমাজই ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারায়।
 
সভ্য সমাজের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো—চিন্তার উত্তর চিন্তা, যুক্তির উত্তর যুক্তি। একটি বইয়ের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার সমালোচনা লেখা যায়, পাল্টা বই লেখা যায়, গবেষণা করা যায়, প্রকাশ্য বিতর্কে অংশ নেওয়া যায়। কিন্তু কোনও লেখককে ভয় দেখিয়ে, নির্বাসনে ঠেলে বা নীরব করে দিয়ে কোনও সমাজ কখনও প্রকৃত অর্থে মুক্তচিন্তার সমাজ হতে পারে না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, নিষিদ্ধ বইয়ের প্রতি কৌতূহলই বরং আরও বেড়ে যায়।
 
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য বা একটি বই মুহূর্তের মধ্যে প্রবল জনমত সৃষ্টি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা আরও সংবেদনশীল। প্রশাসনের কাজ উত্তেজনার কাছে নতি স্বীকার করা নয়; আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। জনপ্রিয় মতকে রক্ষা করা যেমন রাষ্ট্রের কর্তব্য, তেমনি অজনপ্রিয় মতকেও নিরাপদ রাখার দায়িত্ব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
 
কলকাতা দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে মুক্তচিন্তা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই শহরের গৌরব কেবল তার ঐতিহ্যে নয়; মতের ভিন্নতাকে ধারণ করার ক্ষমতায়। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রকৃত শক্তি কোনও একরৈখিক চিন্তায় নয়, বরং বহুস্বরের সহাবস্থানে।তসলিমা নাসরিন ফিরবেন কি ফিরবেন না, সেই সিদ্ধান্ত সময়, আইন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু তাঁর নামকে ঘিরে যে প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে, সেটি আমাদের সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা কি এখনও সেই উদার সাংস্কৃতিক পরিসর ধরে রাখতে পেরেছে, যেখানে মতের অমিলকে শত্রুতা নয়, আলোচনার উপাদান হিসেবে দেখা হয়?
 
এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আগামী দিনের বাংলার আত্মপরিচয় নির্ধারণ করবে।কারণ গণতন্ত্রের শক্তি বিরোধিতা দমনে নয়, বিরোধিতাকে সহ্য করার ক্ষমতায়। একটি সভ্য সমাজে কোনও বইয়ের প্রকৃত উত্তর কখনও নিষেধাজ্ঞা নয়, আরও একটি বই; কোনও মতের উত্তর নীরবতা নয়, আরও শক্তিশালী যুক্তি। আর সেই কারণেই তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে বিতর্ক শেষ পর্যন্ত একজন লেখকের ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়—এটি বাংলার গণতান্ত্রিক বিবেকেরও এক চলমান পরীক্ষা।


শেহতীয়া খবৰ