আসগর হাশমি / নয়া দিল্লি
ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিকে ঘিরে বহুদিন ধরেই মুসলমানদের মধ্যে এই ধারণা বিরাজ করছিল যে বিজেপি সরকার নাকি তাদের প্রান্তিক করে দিচ্ছে এবং সংখ্যালঘু উন্নয়ন-সম্পর্কিত সম্পদে ধীরে ধীরে কাটছাঁট করা হচ্ছে। তবে রবিবার সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬–২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট সেই ধারণাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বৃদ্ধি শুধু প্রতীকী বার্তা নয়, এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন এখনও সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তাতে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে প্রায় ৩,৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে বরাদ্দ ছিল ৩,৩৯৫.৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ সামান্য হলেও অর্থবহ বৃদ্ধি ঘটেছে, যা স্পষ্ট করে যে বরাদ্দ কমানো হয়নি, বরং বাড়ানো হয়েছে। বাজেটকে ঘিরে যখন বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে তীব্র আলোচনা চলছে, তখন এই বৃদ্ধি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
মোটের ওপর, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য কেন্দ্র সরকার সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য ৫০ লাখ কোটি টাকার বেশি বাজেট পেশ করেছে। বরাদ্দের দিক দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ ভাগ পেয়েছে, যেখানে শুধু সুদ পরিশোধেই প্রায় ১৯.৭২ লাখ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট বাজেটের ৩৬.৯ শতাংশ, ব্যয় হবে। এরপর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে বরাদ্দ করা হয়েছে ৭.৮ লাখ কোটি টাকা (প্রায় ১৪.৭ শতাংশ)। এই বিপুল অঙ্কের মধ্যেও সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়ের বাজেটে ধারাবাহিকতা ও বৃদ্ধি সরকারের নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন বাজেটে স্পষ্ট করা হয়েছে, যে খাতগুলো দীর্ঘদিন ধরে সমর্থনের অপেক্ষায় ছিল, সেগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ শুধু অপরিবর্তিত রাখা হয়নি, কেন্দ্রীয় প্রকল্প ও কর্মসূচির বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে। বাজেট নথি অনুযায়ী, ৩,৪০০ কোটি টাকার মধ্যে ১৮৪.৪৫ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় খাতের প্রকল্পের জন্য রাখা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের ১৮০.০৭ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৪.৮ কোটি বেশি।
সরকারের দাবি, এই বৃদ্ধি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর বাস্তব প্রভাবও দেখা যাবে। সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রকল্পগুলির জন্য প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘প্রধানমন্ত্রী জন বিকাশ কর্মসূচি’ (PMJVK), যার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১,১৯৭.৯৭ কোটি টাকা। এই কর্মসূচির আওতায় সংখ্যালঘু-প্রধান অঞ্চলে স্কুল, ছাত্রাবাস, স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং কমিউনিটি হল নির্মাণ ও উন্নয়নের কাজ করা হচ্ছে।
PMJVK–র মাধ্যমে শিক্ষা ও অবকাঠামোতে জোর দেওয়া সরাসরি দুর্বল ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাচ্ছে। মুসলিমপ্রধান এলাকায় নতুন স্কুল ও ছাত্রাবাস নির্মাণে শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে; স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও কমিউনিটি ভবন স্থানীয় সুবিধাকে সুদৃঢ় করেছে। পাশাপাশি, নারী-কেন্দ্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে মহিলাদের নেতৃত্বগুণ, আর্থিক সাক্ষরতা ও আত্মনির্ভরতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যার সুফল মুসলিম নারীরাও পাচ্ছেন।
গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোদি সরকারের আমলে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়ের বাজেটে ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে বৃদ্ধির ধারাই স্পষ্ট। ২০২৪ সালে বরাদ্দ ছিল ৩,১৮৩.২৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩-২৪ বাজেটে প্রস্তাবিত বরাদ্দ ছিল ৩,০৯৭ কোটি, যদিও সংশোধিত হিসাবে তা কমে দাঁড়ায় ২,৬০৮.৯৩ কোটি। পরে ২০২৪-২৫ সালে ৫৭৪ কোটি টাকার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি করা হয়।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার সময় আশঙ্কা ছিল, সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব কমে যাবে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, দ্বিতীয় মেয়াদ নাগাদ এসে এই মন্ত্রণালয়ের বাজেট কেবল টিকে থাকেনি, বরং বেড়েছেও। এমনকি ইউপিএ সরকারের সময়ের তুলনায় মোট মিলিয়ে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার বৃদ্ধি হয়েছে।
সরকারপন্থী বিশ্লেষকদের মতে, এই বাজেট সংখ্যা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে কেন্দ্র সরকার নাকি সংখ্যালঘুদের উপেক্ষা করছে। তাঁদের দাবি, শিক্ষা, অবকাঠামো, নারী–সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ মুসলিম জাতিসহ সব সংখ্যালঘুর জীবনমান উন্নত করবে। যদিও সমালোচকদের মত, বরাদ্দের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর যথাযথ বাস্তবায়ন। তবুও ২০২৬-২৭ বাজেটে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়ের জন্য বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল বরাদ্দ এমন একটি বাস্তবতা যা উপেক্ষা করা যায় না।
সব মিলিয়ে, কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষত মুসলমানদের ঘিরে তৈরি হওয়া অনেক আশঙ্কা কমানোর চেষ্টা করেছে। শিক্ষা, নারী–সক্ষমতা ও অবকাঠামো-কেন্দ্রিক প্রকল্পগুলির মাধ্যমে বাজেট ইঙ্গিত দেয়, উন্নয়নের ধারায় সংখ্যালঘুদেরও শামিল রাখার দাবি সরকার পুনর্ব্যক্ত করছে। এখন দেখার বিষয়, এই ঘোষণা এবং বরাদ্দ বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনে এবং তা কি সত্যিই সম্প্রদায়ের উন্নয়নে মাইলফলক হয়ে ওঠে।