ক্যালিগ্রাফির বিশ্বমঞ্চে ভারতের উজ্জ্বল নক্ষত্র, ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফি

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 3 d ago
 ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফি
ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফি
ফারহান ইসরাইলি / টঙ্ক (রাজস্থান)

রাজস্থানের টঙ্ক শহরের ক্যালিগ্রাফার ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফি নিউ ইয়র্কে ইসলামিক আর্ট সোসাইটি আয়োজিত আন্তর্জাতিক ইসলামী ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। ডিজিটাল ফন্ট ও কৃত্রিম নকশার এই যুগে তাঁর এই সাফল্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ৪,০০০-এরও বেশি শিল্পীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ওয়াসিফি এই সম্মান অর্জন করেন। তাঁর কথায়, এটি হঠাৎ প্রাপ্ত সাফল্য নয়। গত চার বছর ধরে এই প্রতিযোগিতায় ভারতের অংশগ্রহণ নজরকাড়া, এবং প্রতিবারই ওয়াসিফি পরিবার শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে।

২০২২ সালে ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফি প্রথম পুরস্কার পান। পরের বছর তাঁর ছেলে হারিস ওয়াসিফি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। আর ২০২৪ সালে হারিস প্রথম পুরস্কার জয় করে। এই বছর প্রথম পুরস্কার পায় মির, দ্বিতীয় ভারত, তৃতীয় পাকিস্তান এবং চতুর্থ তুরস্ক। পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে একটি সনদপত্র, স্মারক ও আর্থিক পুরস্কার। তবে ওয়াসিফি পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় সম্মান হলো, ভারতকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করার গর্ব।
 
ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফি
 
ওয়াসিফির শৈল্পিক যাত্রা: বাড়ির উঠোন থেকেই শুরু
 
ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফির শিল্পের পথচলা কোনো আর্ট কলেজ থেকে শুরু হয়নি, শুরু হয়েছিল তাঁর নিজের ঘরে। তাঁর প্রয়াত বাবা ক্বারি সালিমউল্লাহ ওয়াসিফ ফুরকানি ছিলেন প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার, কোরআন তিলাওয়াতকারী এবং বহু ভাষায় জ্ঞানী এক আলিম। আরবি, ফারসি ও উর্দুতে তাঁর দখল ছিল অসাধারণ।কোরআনের ক্যালিগ্রাফি ছিল তাঁর বিশেষ দক্ষতা। ছোটবেলায় মুতিউল্লাহ দেখতেন, বাবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে লিখছেন। কলমের ধার, অক্ষরের বাঁক, কালি ব্যবহারের মাপ, এসব তাঁর কাছে নিছক আঁকা নয়, বরং শৃঙ্খলার শিক্ষা।
 
আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য তিনি রাজস্থানের টঙ্কে অবস্থিত মৌলানা আবুল কালাম আজাদ আরবি–ফারসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন, যেখানে তিনি চার বছরের ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। জাতীয় উর্দু ভাষা প্রনোদনা পরিষদ (NCPUL), দিল্লি, এই ডিপ্লোমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানই টঙ্ককে আরবি ও ফারসি শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
 
টঙ্ক: ক্যালিগ্রাফির ঐতিহ্যবাহী শহর
 
টঙ্ক শহর সাধারণত মাদ্রাসা, বইপত্র ও ইসলামি শিক্ষার জন্য পরিচিত। তবে এই শহরে ক্যালিগ্রাফির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। নবাব আমলে ইরান ও মধ্য এশিয়া থেকে আগত ক্যালিগ্রাফাররা স্থানীয়দের এই শিল্পে শিক্ষিত করেছিলেন। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ আরবি-ফারসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (APRI) এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে আসছে। এখান থেকে বহু দক্ষ ক্যালিগ্রাফার বের হয়েছেন, যারা দেশ-বিদেশে নাম কুড়িয়েছেন। সেই ধারারই এক উজ্জ্বল নাম, ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফি।
 
একজন প্রতিযোগীর সাথে ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফি 
 
ওয়াসিফি 'আওয়াজ দ্যা ভয়েস'-কে জানান, তাঁর কাছে ক্যালিগ্রাফি শুধুই শোভা বর্ধনের মাধ্যম নয়, এটি ইবাদতেরই এক অংশ। তিনি আজ পর্যন্ত নিজের হাতে ২৭টি কোরআন শরিফ লিখেছেন। এর কিছু অত্যন্ত সূক্ষ্ম অক্ষরে লেখা, আর কিছু সাজানো হয়েছে সোনা ও রুপার অলংকরণে।
 
এক বিশাল কীর্তি: এক পাতায় পুরো কোরআন
 
তিনি অসাধারণ কিছু প্রকল্পও হাতে নিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে, একই বিশাল কাগজে পুরো কোরআন লিখে ফেলা। এমন কাজের জন্য দরকার বছরের পর বছর অনুশীলন, ধৈর্য ও মনসংযোগ। একটি অক্ষরের ভুল মানে পুরো কাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি।
 
ওয়াসিফির অন্যতম বড় অবদান, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি পুনরুদ্ধার। তিনি অর্ধলিখিত কোরআন ও আরবি, ফারসি এবং উর্দুর বিরল গ্রন্থ সম্পূর্ণ করে দেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৫০০ অসমাপ্ত কোরআন এবং শত শত প্রাচীন বই সম্পূর্ণ করেছেন। তিনি ব্যক্তিগত সংগ্রাহক, গ্রন্থাগার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্যও কাজ করেন। এতে বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি নতুন জীবন পায়, যা অন্যথায় হারিয়ে যেতে পারত।
 
এক ব্যাক্তির সঙ্গে ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফি
 
কাগজের সীমা ছাড়িয়ে শিল্প
 
ওয়াসিফির শিল্প কাগজে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি কাপড়, চামড়া, কাঠ, ধাতু, চালের দানা, ডাল, মার্বেল, চুল, এমনকি বোতলের ভেতরেও ক্যালিগ্রাফি করেছেন। এই শিল্পে শুধু হাতের দক্ষতা নয়, প্রয়োজন গভীর মনোযোগ ও নিখুঁত ভারসাম্য।
 
২০২২ সালে তিনি তুরস্কের ইস্তানবুলে আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। দু’বছর অন্তর আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের নামকরা ক্যালিগ্রাফাররা অংশ নেন। ২০২৩ সালে তিনি দুবাইয়ের ফুজাইরা কোম্পানির আয়োজিত আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এটির বিচারকমণ্ডলী ও অংশগ্রহণ, দু’দিকেই উচ্চমান বজায় রাখা হয়।
 
ওয়াসিফি জানান, কর্মশালা, প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা মিলিয়ে দেশের ভেতর ও বাইরে মিলিয়ে তিনি প্রায় ৩০টি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এ সাফল্য ব্যক্তিগত নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতীয় ক্যালিগ্রাফির ঐতিহ্য তুলে ধরার একটি সুযোগ। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের মঞ্চ শিল্পীদের শেখার, নিজেদের যাচাই করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্যালিগ্রাফারদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। তিনি জাতীয় পর্যায়েও বহু সম্মান পেয়েছেন।
এক পরিবারের শিল্পসাধনা
 
ওয়াসিফি পরিবারে ক্যালিগ্রাফির ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত। তাঁর বড় ছেলে হারিস ওয়াসিফি একজন আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্যালিগ্রাফার। দ্বিতীয় ছেলে আব্বাস ওয়াসিফি হাফিজ ও ক্বারি এবং বর্তমানে লখনৌর নদওয়াতুল উলামায় অধ্যয়নরত। মেয়ে সিদরা ওয়াসিফি একজন আলিমা এবং মেয়েদের ক্যালিগ্রাফি শেখান। এই পরিবার শুধু শিল্পই নয় শৃঙ্খলা, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধও সংরক্ষণ করছে।
 
স্বপ্ন: টঙ্কে একটি ক্যালিগ্রাফি লাইব্রেরি ও জাদুঘর
 
ক্বারি মুতিউল্লাহ ওয়াসিফি তাঁর বাবার স্মৃতিতে ‘বাজমে ওয়াসিফ’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর স্বপ্ন, টঙ্কে একটি বিশেষ ক্যালিগ্রাফি লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম গড়ে তোলা, যেখানে তাঁর এবং তাঁর বাবার সব পাণ্ডুলিপি নিরাপদে সংরক্ষিত থাকবে। তিনি বলেন, “সীমিত সম্পদের মধ্যেও আমার সংকল্প অটুট। আমি চাই, টঙ্কের এই ক্যালিগ্রাফিক ঐতিহ্য যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে যায়।”