পদ্মশ্রীতে ভূষিত ভাপাং শিল্পী গাফরুদ্দিন

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 4 d ago
পদ্মশ্রীতে ভূষিত ভাপাং শিল্পী গাফরুদ্দিন
পদ্মশ্রীতে ভূষিত ভাপাং শিল্পী গাফরুদ্দিন
 
ইউনুস আলভি / আলওয়ার

“আমার আনন্দ সেই শ্রমিকের মতো, যে ভোরে কাজে যায় আর সন্ধ্যায় নিজের মজুরি হাতে পায়”, এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে গাফরুদ্দিন যোগী মেওয়াতির জীবনের সারকথা। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে চলতি বছরের পদ্মশ্রী সম্মানের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর এই কথাই উঠে আসে তাঁর কণ্ঠে।
 
৬৮ বছর বয়সি গাফরুদ্দিন অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নিজের লোকশিল্পকে বহন করে চলেছেন, মেওয়াতের ধুলোভরা গ্রামপথ থেকে শুরু করে বিশ্বের নানা প্রান্তে। পদ্মশ্রী প্রাপ্তির খবর পৌঁছাতেই আলওয়ারের এই শিল্পী আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।
মুহূর্তের মধ্যে তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে শৈশব ও যৌবনের সেই কঠিন দিনগুলো। খালি পায়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো, হাতে ভাপাং, একটি ঐতিহ্যবাহী একতারাযুক্ত বাদ্যযন্ত্র, আর পরিবারের পেট চালাতে আটা ও শস্য ভিক্ষা করা। আজ তাঁর মনে হয়, লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে কঠোর পরিশ্রম তিনি করেছেন, তারই ন্যায্য পারিশ্রমিক পেলেন তিনি।
 
গাফরুদ্দিনের কাছে পদ্মশ্রী কোনো ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি শতাব্দীপ্রাচীন মেওয়াতি সংস্কৃতি, যোগী সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার এবং বিলুপ্তির মুখে থাকা ভাপাংয়ের সুরের প্রতি এক সম্মান। হরিয়ানা ও রাজস্থানের সীমান্তে বিস্তৃত মেওয়াত অঞ্চল এক অনন্য সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের উদাহরণ। এখানে মুসলিম যোগী সম্প্রদায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মহাভারত ও বিভিন্ন লোককথা গেয়ে এসেছে। এই ধারার অন্যতম শক্তিশালী ধারক গাফরুদ্দিন যোগী মেওয়াতি।
 
গাফরুদ্দিন  মেওয়াতি যোগী 
 
তিনি বিশ্বাস করেন, “ভাষা, সংস্কৃতি ও লোকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকাই আমাদের আসল পরিচয়।” তাঁর কাছে এই সম্মান মেওয়াতের সেই মাটির প্রতি কৃতজ্ঞতা, যে মাটি সংগ্রামের দিনগুলোতে তাঁকে আগলে রেখেছিল।
রাজস্থানের দীগ জেলার কৈথওয়ারা গ্রামে জন্ম তাঁর। শৈশব থেকেই জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। তাঁর বাবা, প্রয়াত বুধ সিং যোগী, ছিলেন একজন দক্ষ শিল্পী। মাত্র চার বছর বয়সেই তিনি ছেলের হাতে তুলে দেন ভাপাং, যে বয়সে শিশুরা সাধারণত খেলনায় মেতে থাকে।
 
ভাপাং দেখতে ছোট ঢোলের মতো হলেও এতে থাকে একটি মাত্র তার। একে শিবের ডমরুর বিবর্তিত রূপ বলেও মনে করা হয়। এই বাদ্যযন্ত্র বাজাতে প্রয়োজন পেটের পেশি, আঙুল ও কণ্ঠস্বরের নিখুঁত সমন্বয়। বাবার সঙ্গে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে, চৌপালে বসে লোককথা শুনে শুনেই তিনি এই শিল্পে দীক্ষা নেন। জীবিকার জন্য গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করতে হতো। দিনগুলো কঠিন ছিল, কিন্তু ভাপাংয়ের সুর কখনো তাঁকে হতাশ হতে দেয়নি।
 
গাফরুদ্দিন  মেওয়াতি যোগী
 
গাফরুদ্দিন যোগী মেওয়াতির শিল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক তাঁর মহাভারত পরিবেশন। এক মুসলিম শিল্পী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও পাণ্ডবদের কাহিনি এমন নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে গেয়ে ওঠেন যে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শোনেন। আলওয়ার ও আশপাশের অঞ্চল ঐতিহাসিক বিরাটনগরের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে পাণ্ডবরা নির্বাসনকাল কাটিয়েছিলেন। মেওয়াতি উপভাষায় তাঁর কণ্ঠে এই কাহিনিগুলো যেন ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে। তাঁর সংগীত প্রমাণ করে, সংস্কৃতি ও সুরের কোনো ধর্মীয় সীমানা নেই।
 
১৯৯২ সাল তাঁর জীবনে এক বড় মোড় এনে দেয়। সেই বছর প্রথমবার বিদেশে গিয়ে তিনি পরিবেশন করেন। এরপর ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, দুবাইসহ ৬০টিরও বেশি দেশে ভাপাংয়ের সুর ছড়িয়ে দেন। লন্ডনে রানী এলিজাবেথের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর মেওয়াতি লোকসুর বিদেশি শ্রোতাদেরও মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল।
 
গাফরুদ্দিন  মেওয়াতি যোগী রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে
 
পদ্মশ্রী পাওয়ার খবর যখন মোবাইলে আসে, প্রথমে তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি। পরে খবর নিশ্চিত হতেই আবেগে ভেঙে পড়েন। এই সম্মান তিনি উৎসর্গ করেন মেওয়াত অঞ্চল ও যোগী সম্প্রদায়ের প্রতি। আজ তাঁর পরিবারের অষ্টম প্রজন্ম এই শিল্পকে বহন করে চলেছে। তাঁর ছেলে ড. শাহরুখ খান মেওয়াতি যোগী সংগীতে পারদর্শী হওয়ার পাশাপাশি মেওয়াতের সংস্কৃতি নিয়ে পিএইচডি করেছেন। বহু লোকশিল্প যখন হারিয়ে যাচ্ছে, তখন এই পরিবার সেই উত্তরাধিকার আগলে রেখেছে।
 
গাফরুদ্দিন যোগী মেওয়াতির স্বপ্ন একটি লোকশিল্প বিদ্যালয় গড়ে তোলা। তিনি চান সরকার তাঁকে জমি দিক, যাতে তিনি নতুন প্রজন্মকে ভাপাং বাজানো, মেওয়াতি লোকগান ও ঐতিহ্যবাহী কাহিনি শেখাতে পারেন। তাঁর বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম যদি নিজের শিকড় ভুলে যায়, তবে পরিচয়ও হারিয়ে যাবে। তাঁর কাছে পদ্মশ্রী কোনো শেষ অধ্যায় নয়, বরং এক নতুন যাত্রার সূচনা, যা তিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চালিয়ে যেতে চান।