আওয়াজ–দ্য ভয়েস
কর্ণাটকের একটি দুর্গম গ্রামে এক মানুষের বইয়ের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তুলেছে এক চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার। তাঁর জীবনকাহিনি সবার জানা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের জন্য ভারতের ১৩১ জন পদ্ম সম্মানপ্রাপ্ত ব্যক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছেন ৭৫ বছর বয়সি প্রাক্তন বাস কন্ডাক্টর এংকে গৌড়া।
তিনি এই সম্মান পেয়েছেন না খ্যাতির জন্য, না সাহস কিংবা ক্ষমতার জন্য, বরং জীবনের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে বইয়ের জন্য একটি ঘর নির্মাণ করার অসামান্য উদ্যোগের জন্য। কর্ণাটকের মাণ্ডিয়া জেলার পাণ্ডবপুরা তালুকের হরলাহল্লি গ্রামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘পুস্তকা মানে’, যার অর্থ ‘গ্রন্থের ঘর’।
‘পুস্তকা মানে’কে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রন্থাগারগুলোর একটি বলা হয়, যেখানে প্রায় ২০ লক্ষ বই সংরক্ষিত রয়েছে। এটি শুধুই বইয়ের তাক নয়, বরং সম্পদের বদলে জ্ঞানকে বেছে নেওয়া এক মানুষের আজীবন স্বপ্নের প্রতিফলন।
চিনাকুরলীতে জন্ম নেওয়া এংকে গৌড়া জীবনের দীর্ঘ সময় বাস কন্ডাক্টর হিসেবে যাত্রীদের যাতায়াতের মাঝে, ধুলোভরা রাস্তায় টিকিট কাটতে কাটতেই কাটিয়েছেন। সন্ধ্যাবেলায় তিনি কলেজে পড়াশোনা করতেন এবং শিক্ষার প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে কানাড়া ভাষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কিছু সময় তিনি একটি চিনি কারখানায়ও কাজ করেছেন। সেই আয়, মাইসুরুতে নিজের জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ এবং অবসরকালীন সঞ্চয়ের টাকাই তিনি ব্যয় করেছেন বই কেনা ও নিজের গ্রন্থাগার গড়ে তোলার জন্য।
২০ বছর বয়স থেকেই তিনি বই সংগ্রহ শুরু করেন। বছরের পর বছর ধরে সেই সংগ্রহ ক্রমশ বেড়ে ওঠে। বর্তমানে এই গ্রন্থাগারে ২০টিরও বেশি ভাষার সাহিত্য, বিজ্ঞান, পুরাণ, দর্শনসহ নানা বিষয়ের বই রয়েছে। এখানে আছে ১৮৩২ সালের দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, প্রায় ৫,০০০টি অভিধান, ৩৫,০০০ আন্তর্জাতিক সাময়িকী, ২,৫০০টি মহাত্মা গান্ধী বিষয়ক গ্রন্থ, ২,৫০০টি ভাগবত, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাইবেল এবং অন্যান্য পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।
প্রায় পাঁচ লক্ষ দুর্লভ বিদেশি গ্রন্থ মূল্যবান কানাড়া সাহিত্যের পাশেই সংরক্ষিত রয়েছে। এই বিপুল বইয়ের ভাণ্ডার ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, গবেষক এবং বইপ্রেমী যে কোনো মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত।
এংকে গৌড়ার ২০ লক্ষ বইয়ের গ্রন্থাগারের একটি ছবি
গৌড়া কখনোই বইগুলো নিজের জন্য জমিয়ে রাখেননি। বরং তিনি সেগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন এবং এমন এক সমাজে পড়ার অভ্যাসকে উৎসাহিত করেছেন, যেখানে একসময় বইকে বিলাসিতা হিসেবে দেখা হতো। ২০১৬ সালে তাঁর এই বিশাল গ্রন্থসংগ্রহের জন্য তিনি লিমকা বুক অব রেকর্ডসে স্থান পান।
তিনি বলেন, “আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমি কখনোই এসব আশা করিনি। আমার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, বই যেন সব শিশুর কাছে পৌঁছে যায় এবং তারা নিজেদের পছন্দের বই পায়। গত ৫০ বছর ধরে আমি এই কাজ করে যাচ্ছি, খুব সাধারণ জীবনযাপন করে, কোনো পুরস্কারের প্রত্যাশা ছাড়াই। সরকার যে আমার এই প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাতে আমি সত্যিই সুখী।”
গণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ২০২৬ সালের পদ্ম সম্মানপ্রাপ্তদের আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ করেছে। এই সম্মানজনক অসামরিক পুরস্কারগুলো শিল্প, সাহিত্য, সমাজসেবা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জনসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখার জন্য প্রদান করা হয়।
ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্ম পুরস্কার’ তিনটি বিভাগে প্রদান করা হয়, ব্যতিক্রমী ও বিশিষ্ট সেবার জন্য পদ্ম বিভূষণ, উচ্চস্তরের বিশিষ্ট সেবার জন্য পদ্ম ভূষণ, এবং যে কোনো ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদানের জন্য পদ্মশ্রী।