পুরনো দিল্লির গলিতে এখনও বেঁচে আছে বলিউড পোস্টার শিল্পের শেষ প্রহরী পেইন্টার কাফিল
আশহার আলম / নয়াদিল্লি
পুরনো দিল্লির জামা মসজিদের আশপাশের সরু গলিগুলো এখনও অতীতের অসংখ্য স্মৃতি বয়ে বেড়ায়। সেই ইতিহাসেরই এক নীরব সাক্ষী ৭০ বছরের শিল্পী কাফিল, যিনি আজও হাতে আঁকা বলিউড পোস্টার ও হোর্ডিং তৈরির প্রায় বিলুপ্তপ্রায় শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির দাপটে যখন এই ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে গেছে, তখনও তাঁর তুলির প্রতিটি আঁচড় যেন ফিরিয়ে আনে ভারতীয় সিনেমার সোনালি দিনের স্মৃতি।
মতিয়া মহলের একটি সাধারণ স্টুডিওতেই তাঁর কর্মক্ষেত্র। তবে সেটি যেন কোনও দোকান নয়, বরং এক জীবন্ত জাদুঘর। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া পোস্টার, অর্ধসমাপ্ত হোর্ডিং, রঙে দাগ পড়া দেয়াল এবং বহু ব্যবহারে জীর্ণ তুলি যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকা এক যুগের গল্প শোনায়।
নিজের কর্মস্থলে পেইন্টার কাফিল
ডিজিটাল স্ক্রিন ও ফ্লেক্স ব্যানারে শহরের চেহারা বদলে যাওয়ার অনেক আগেই কাফিল আহমেদ আনসারির তুলির আঁচড়ে বিশালাকার হোর্ডিংয়ে জীবন্ত হয়ে উঠতেন বলিউডের কিংবদন্তিরা। তিনি 'দেওয়ার', 'পাকিজা', 'মুঘল-ই-আজম' এবং 'রাম অউর শ্যাম'-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রের পোস্টার এঁকেছেন। তাঁর শিল্প শহরের রাস্তাকে পরিণত করেছিল খোলা আকাশের নিচের সিনেমা হলে, আর দেওয়ালগুলো হয়ে উঠেছিল আবেগময় গল্প বলার ক্যানভাস।
উত্তরপ্রদেশের বেরেলি জেলার আওনলায় জন্মগ্রহণ করেন কাফিল। 'পেইন্টার কাফিল' নামেই তিনি বেশি পরিচিত। স্কুলজীবনেই শিল্পকলার প্রতি তাঁর ভালোবাসার শুরু। সেখানে শিক্ষক নিয়ামতুল্লাহ আনসারির কাছে তিনি ক্যালিগ্রাফি শেখেন। পরবর্তীতে স্থানীয় শিল্পী শবির রজা খানের নিখুঁত ও শান্তভাবে ছবি আঁকার কাজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করে নিজের দক্ষতা আরও শানিত করেন। তখন থেকেই তিনি শুধু ছবি আঁকায় নয়, রঙের মাধ্যমে গল্প বলার শিল্পের প্রতিও গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
তাঁর জীবনের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ১৯৮০ সালে বাবার মৃত্যু এবং পারিবারিক ব্যবসা ভেঙে পড়ার পর জীবন এক কঠিন মোড় নেয়। পকেটে মাত্র এক হাজার টাকা এবং সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে জীবিকা ও নতুন সম্ভাবনার খোঁজে তিনি নিজের শহর ছেড়ে দিল্লিতে চলে আসেন।
দিল্লি ছিল যেমন ভীতিকর, তেমনই সম্ভাবনায় ভরপুর। পূর্ব দিল্লিতে আত্মীয়দের বাড়িতে থেকে তিনি একটি সাইকেলে করে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতেন। সঙ্গে থাকত তুলি, রঙের কৌটো এবং নিজের সামর্থ্যের চেয়েও বড় স্বপ্ন। কাজের খোঁজে একের পর এক দরজায় কড়া নেড়েছেন এবং ধীরে ধীরে রাজধানীর শিল্পজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন। প্রকৃত শিক্ষা তিনি লাভ করেন প্রখ্যাত শিল্পী ফৈজ সিদ্দিকির কাছে। প্রায় ১৯ বছর তাঁর তত্ত্বাবধানে কাজ করে তিনি শৃঙ্খলা, কৌশল এবং ছোট স্কেচকে কীভাবে বিশাল সিনেমার ভিজ্যুয়ালে রূপান্তর করতে হয়, তা আয়ত্ত করেন।
বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন পেইন্টার কাফিল
অবশেষে ১৯৯৯ সালে জামা মসজিদের কাছে মতিয়া মহলে তিনি নিজের স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন। খুব দ্রুতই তাঁর কাজ দিল্লির দৃশ্যমান সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রের প্রচার, বাণিজ্যিক সাইনবোর্ড, থিয়েটারের হোর্ডিং এবং হাতে আঁকা বিজ্ঞাপন, সব ক্ষেত্রেই তাঁর শিল্প রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তায় নজর কাড়তে শুরু করে।
এরপর আসে বড় পরিবর্তন। ২০০০ সালের শুরুর দিকে প্রযুক্তির ঢেউ সবকিছু বদলে দেয়। ফ্লেক্স প্রিন্টিং মেশিন, ডিজিটাল ইঙ্কজেট ব্যানার এবং কম্পিউটারনির্ভর ডিজাইন দ্রুত হাতে আঁকা পোস্টারের জায়গা দখল করে নেয়। একে একে অসংখ্য শিল্পী এই পেশা ছেড়ে দেন। বন্ধ হয়ে যায় বহু স্টুডিও। ভারতীয় সিনেমার জনপরিসরের পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক এই শিল্পধারা ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সেই সময়ের কথা স্মরণ করে কাফিল শান্ত কণ্ঠে বলেন, "অনেক শিল্পী শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। অনেকেই কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন। মেশিনের আগমনে তুলির মূল্য কমে গিয়েছিল। যারা নিজেদের বদলাতে পেরেছিল, শুধু তারাই টিকে ছিল।" তাঁর প্রজন্মের বহু শিল্পীর কাছে এটি শুধু পেশাগত পরিবর্তন ছিল না, বরং আজীবনের পরিচয়ের অবসানও ছিল।
পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে কাফিল কিছুদিন ডিজিটাল প্রযুক্তিরও ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মনে হয়েছিল, সেখানে যেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অনুপস্থিত। তুলির স্পর্শ, ক্যানভাসে ধীরে ধীরে একটি ছবির জন্ম নেওয়ার অনুভূতি, এসব ডিজিটাল মাধ্যমে পাওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত তিনি আবার ফিরে আসেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পরিচয়, হাতে আঁকার শিল্পে।
আজও প্রতিটি তুলির আঁচড়ে তিনি নতুন অর্থ খুঁজে পান। তাঁর বিশ্বাস, হাতে আঁকা বলিউড শিল্পের এমন এক আত্মা রয়েছে, যা কোনও যন্ত্র কখনও সৃষ্টি করতে পারে না। তাঁর মতে, বিশেষ করে বিদেশের মানুষ এই শিল্পের স্বকীয়তাকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দেন। কাফিল বলেন, "বিদেশের মানুষ হাতে আঁকা কাজের গভীরতা অনুভব করেন। তাঁদের কাছে এটি জীবন্ত মনে হয়। এর নিজস্ব টেক্সচার আছে, নিজস্ব উপস্থিতি আছে।"
মিনার ক্যাফের ছাদে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন পেইন্টার কাফিল
কাফিলের কাছে এই শিল্প শুধুই অতীতের স্মৃতি নয়, এটি একটি দর্শন। তাঁর মতে, উজ্জ্বল ও নাটকীয় রঙ ভারতের বৈচিত্র্যের প্রতীক। বহুস্তরীয় অক্ষরশৈলী দেশের জটিলতাকে তুলে ধরে। আর তাঁর বিশাল ক্যানভাস সেইসব চলচ্চিত্রের মহিমাকেই প্রতিফলিত করে, যেগুলোর প্রচারের জন্য একসময় এই হোর্ডিং তৈরি হতো। এখনও ট্রাকের গায়ে, কিছু পুরনো সিনেমা হলের বোর্ডে কিংবা মাঝেমধ্যে জনসাধারণের দেয়ালচিত্রে এই ঐতিহ্যের কিছু চিহ্ন দেখা যায়, তবে তা ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে, অতীতের ক্ষীণ প্রতিধ্বনির মতো।
সম্মান ও স্বীকৃতি পেলেও তাঁর একটি ইচ্ছা এখনও অপূর্ণ। কাফিল চান এমন একজন তরুণ শিক্ষানবিশ, যিনি এই বিলুপ্তপ্রায় শিল্পকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবেন, ধৈর্য নিয়ে শিখবেন এবং কল্পনাশক্তির মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখবেন।
এখনও পর্যন্ত পুরনো দিল্লির সেই ব্যস্ত অথচ নিরিবিলি গলিতে তাঁর স্টুডিও আলোকিত থাকে না নিয়ন আলো বা ডিজিটাল স্ক্রিনে, বরং রঙের কৌটো, বহু ব্যবহারে জীর্ণ তুলি এবং তাঁর অটল নিষ্ঠার আলোয়। আর যতদিন তাঁর হাতে তুলি চলবে, ততদিন বলিউডের হাতে আঁকা পোস্টারের সেই সোনালি যুগ পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না; প্রতিটি তুলির আঁচড়ে তা নিঃশব্দে বেঁচে থাকবে।