ভূপেন হাজারিকার জন্মশতবর্ষে ১০০ প্রদীপে শ্রদ্ধার্ঘ্য, ৭৭বি গল্ফ ক্লাব রোড সংরক্ষণের উদ্যোগে আরও দৃশ্যমান অসম-বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন।
দেবকিশোর চক্রবর্তী,কলকাতা:
অসমের সুর ও বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরের মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগসূত্রের অন্যতম প্রধান নাম ড. ভূপেন হাজারিকা। তাঁর জন্মশতবর্ষে কলকাতায় আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠান সেই সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে ফের সামনে নিয়ে এল। মঙ্গলবার টালিগঞ্জের ৭৭বি গল্ফ ক্লাব রোডের ঐতিহাসিক বাসভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১০০টি মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে সুধাকণ্ঠের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
তিন দিনব্যাপী জন্মশতবর্ষ উদযাপনের শেষ পর্বে এই বাসভবন ঘিরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উঠে আসে ভূপেন হাজারিকার শিল্পীজীবন, কলকাতার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক এবং অসম ও পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানে তাঁর ভূমিকা।
কলকাতার সঙ্গে ভূপেন হাজারিকার দীর্ঘ সম্পর্ক
অসমের মাটিতে জন্ম নেওয়া ভূপেন হাজারিকার শিল্পীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় জুড়ে রয়েছে কলকাতা। সংগীত, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সূত্রে এই শহরের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল।
কলকাতা তাঁর সৃষ্টিকে বৃহত্তর শ্রোতৃসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পী, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের ক্ষেত্রও তৈরি করেছিল। ৭৭বি গল্ফ ক্লাব রোডের বাসভবন সেই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে সেই বাড়িতে ১০০ প্রদীপ প্রজ্বলন তাই নিছক আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন নয়; এটি ভূপেন হাজারিকার কলকাতা-জীবনের সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিক স্মৃতিকে পুনরায় সামনে আনার একটি উদ্যোগ।
অসম ও পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক সেতু
ভূপেন হাজারিকার সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর গানে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবন, সামাজিক বৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বার্তা।
বাংলা ভাষায় তাঁর একাধিক জনপ্রিয় গান তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ঘরের শিল্পীতে পরিণত করে। একই সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলার শ্রোতাদের কাছে অসমের প্রকৃতি, নদী ও মানুষের জীবনও পরিচিত হয়ে ওঠে।
এই কারণে ভূপেন হাজারিকার সাংস্কৃতিক অবদানকে শুধু অসম বা পশ্চিমবঙ্গের পরিসরে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। তাঁর শিল্পকর্ম দুই অঞ্চলের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে অসম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র এবং ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
১০০ প্রদীপে শতবর্ষের শ্রদ্ধা
জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে ১০০টি মাটির প্রদীপ প্রজ্বলন ছিল দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ভূপেন হাজারিকার জীবনের ১০০ বছরের প্রতীক হিসেবে প্রদীপগুলি সাজানো হয়।
অনুষ্ঠানের আয়োজকদের বক্তব্যে উঠে আসে, শিল্পীর মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির পরিসমাপ্তি ঘটায়নি। তাঁর গান এখনও বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সেই সৃষ্টির উত্তরাধিকার সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই জন্মশতবর্ষ উদযাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য।উপস্থিত ছিলেন প্রশাসন ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজনেরা।জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কলকাতায় আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রশাসন ও সংস্কৃতি জগতের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি অংশ নেন।
৬ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী ড. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, অসম সরকারের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব ড. বি. কল্যাণ চক্রবর্তী, পশ্চিমবঙ্গের তথ্য অধিকর্তা অবনীত পুনিয়া, অসমের সাংস্কৃতিক বিষয়ক অধিকর্তা রাহুল চন্দ্র দাস, কলকাতার অসম ভবনের যুগ্ম আবাসিক কমিশনার রণদীপ দাম এবং কলকাতা অসমীয়া সাংস্কৃতিক সংস্থার সভাপতি ড. খানিন্দ্র পাঠক।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন মোনা বন্দ্যোপাধ্যায়, কানুশ্রী বড়ুয়া এবং জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী তারালি শর্মা। কলকাতায় ভূপেন হাজারিকার জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক স্মরণ করেন গায়ক মিথুন ধর।
এর আগের পর্বে উপস্থিত ছিলেন সংগীতশিল্পী বিক্রম ঘোষ, অভিনেত্রী জয়া শীল, লেখক নবমালতী নেওগ, পরিচালক ববিতা শর্মা এবং প্রযোজক চিন্ময় শর্মা। ওই অনুষ্ঠানে ভূপেন হাজারিকার জীবন ও কর্ম নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘Bhupen Da Uncut’ প্রদর্শিত হয়।
.webp)
ঐতিহাসিক বাড়ি সংরক্ষণের উদ্যোগের সম্ভাবনা
জন্মশতবর্ষের আবহে ৭৭বি গল্ফ ক্লাব রোডের বাসভবনটি সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। অসম সরকারের প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যে বাড়িটি পরিদর্শন করেছেন বলে জানা গিয়েছে। ভবিষ্যতে বাড়িটির একটি অংশ সংরক্ষণ করে স্মৃতিসৌধ অথবা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এই বাড়ি ভূপেন হাজারিকার ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি অসম ও পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হয়ে উঠতে পারে।এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংগীত, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও বাড়িটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
জন্মশতবর্ষে নতুন করে আলোচনায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
ভূপেন হাজারিকার শতবর্ষ উদযাপন একটি বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এনেছে—দুই রাজ্যের যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়।অসম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ইতিহাস রয়েছে। সংগীত, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র এবং লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন ধারায় এই সম্পর্কের বহু নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। ভূপেন হাজারিকার জীবন ও কর্ম সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তাঁর জন্মশতবর্ষে কলকাতার ঐতিহাসিক বাসভবনে ১০০ প্রদীপের প্রজ্বলন সেই ঐতিহ্যকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
ভূপেন হাজারিকার ক্ষেত্রে তাই শতবর্ষ শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পীকে স্মরণ করার উপলক্ষ নয়। এটি অসম ও পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।