শেষ সন্ধ্যায় ফের ভেসে উঠবে সুধাকণ্ঠের সুর, কলকাতার বাড়িতে আজ ভূপেন হাজারিকাকে শেষ শ্রদ্ধা

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 h ago
শেষ সন্ধ্যায় ফের ভেসে উঠবে সুধাকণ্ঠের সুর, কলকাতার বাড়িতে আজ ভূপেন হাজারিকাকে শেষ শ্রদ্ধা
শেষ সন্ধ্যায় ফের ভেসে উঠবে সুধাকণ্ঠের সুর, কলকাতার বাড়িতে আজ ভূপেন হাজারিকাকে শেষ শ্রদ্ধা
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী
 
কোনও কোনও শিল্পী চলে গেলেও তাঁদের কণ্ঠ থেমে যায় না। সময় পেরিয়ে যায়, প্রজন্ম বদলায়, শহরের চেহারা বদলে যায়—তবু তাঁদের গান মানুষের স্মৃতির ভিতর থেকে বারবার ফিরে আসে। ভূপেন হাজারিকা তেমনই এক শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে শুধু সুর ছিল না, ছিল মানুষের কথা, মাটির কথা, নদীর কথা, ভালোবাসার কথা এবং একতার বার্তা। তাই তাঁকে ঘিরে কোনও আয়োজন কখনও নিছক অনুষ্ঠান হয়ে থাকতে পারে না। তার সঙ্গে মিশে থাকে অগণিত মানুষের আবেগ, স্মৃতি এবং ভালোবাসা।
 
আজ ৮ সেপ্টেম্বর। কলকাতার টালিগঞ্জে ভূপেন হাজারিকার স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়িতেই বসছে তাঁর জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনের শেষ পর্ব। অসম সরকারের সাংস্কৃতিক বিষয়ক দফতরের উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাতে একত্রিত হবেন সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। আয়োজনের সঙ্গে রয়েছে কলকাতা অসমীয়া সাংস্কৃতিক সংস্থা।
 
তিন দিনের এই বিশেষ শ্রদ্ধার আয়োজনের শেষ সন্ধ্যাটি তাই অন্যরকম আবেগের। কারণ, আজকের অনুষ্ঠান হচ্ছে কোনও সাধারণ মঞ্চে নয়—ভূপেন হাজারিকার নিজের কলকাতার বাসভবনে। যে বাড়ি একসময় তাঁর উপস্থিতি, সৃষ্টিশীলতা ও অসংখ্য স্মৃতির সাক্ষী ছিল, জন্মশতবর্ষে সেই বাড়িতেই আবার তাঁর গান ও স্মৃতিকে ঘিরে তৈরি হবে আবেগের আবহ।
 

তিন দিনের যাত্রার আজ শেষ অধ্যায়

 
ভূপেন হাজারিকার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কলকাতায় আয়োজিত অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল ৫ সেপ্টেম্বর। সেদিন গ্যালাক্সি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জীবন ও সৃষ্টিকে ঘিরে তথ্যচিত্র প্রদর্শন। পরদিন, ৬ সেপ্টেম্বর, সল্টলেকের অসম ভবনে আয়োজিত হয় বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আর আজ, ৮ সেপ্টেম্বর, সেই আয়োজনের শেষ পর্ব—Tribute Programme।
 
পোস্টারে ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকে টালিগঞ্জে ভূপেন হাজারিকার বাসভবনে এই শ্রদ্ধা অনুষ্ঠান শুরু হবে।
তিন দিনের এই আয়োজন যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসেছে এক শিল্পীর জীবন, সৃষ্টি এবং স্মৃতির তিনটি আলাদা অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে। প্রথম দিনে তাঁর জীবন ও কর্মকে পর্দায় ফিরে দেখা, দ্বিতীয় দিনে তাঁর সৃষ্টিকে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় স্মরণ করা এবং শেষ দিনে তাঁর নিজের বাড়িতে দাঁড়িয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো—এই বিন্যাসের মধ্যেই রয়েছে গভীর এক আবেগ।
 

ভূপেন হাজারিকা মানেই সীমান্তহীন এক সুর

 
ভূপেন হাজারিকাকে শুধুমাত্র অসমের শিল্পী হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপ্তি বোঝা সম্ভব নয়। তাঁর গান অসমের মাটি থেকে উঠে এসে পৌঁছে গিয়েছিল বাংলায়, হিন্দিতে এবং দেশের নানা প্রান্তের মানুষের হৃদয়ে। তাঁর কণ্ঠে ব্রহ্মপুত্র যেমন কথা বলেছে, তেমনই কথা বলেছে সাধারণ মানুষের জীবন ও যন্ত্রণা।
কলকাতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল দীর্ঘ এবং গভীর। এই শহরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলা ভাষায় তাঁর গান এবং বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ তাঁকে বাঙালির কাছেও অত্যন্ত আপন করে তুলেছিল।
তাঁর গান কোনও বিভাজনের কথা বলেনি। বরং মানুষকে মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার কথা বলেছে। সেই কারণেই আজ তাঁর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে অসম সরকার কলকাতার মাটিতে যে শ্রদ্ধার আয়োজন করেছে, তা দুই সংস্কৃতির এক সুন্দর মিলনের প্রতীক বলেও মনে করছেন অনেকে।
 

আজকের সন্ধ্যায় ফিরবে পুরনো স্মৃতি

 
টালিগঞ্জের সেই বাড়ি আজ যেন আবার ফিরে পাবে অতীতের দিনগুলির কিছুটা ছোঁয়া। হয়তো কোনও গানে মনে পড়বে শিল্পীর কণ্ঠ, কোনও স্মৃতিচারণে ফিরে আসবে তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দিনগুলি। হয়তো উপস্থিত মানুষের চোখের সামনে ভেসে উঠবে সেই মানুষটি—যিনি গানকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, মানুষের কাছে পৌঁছনোর ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
একজন শিল্পীর জন্মশতবর্ষ মানে শুধু তাঁর জন্মের একশো বছর পূর্ণ হওয়া নয়। বরং এই প্রশ্নও ফিরে আসে—একশো বছর পরেও তাঁর সৃষ্টি কতটা জীবন্ত?
 
ভূপেন হাজারিকার ক্ষেত্রে উত্তরটি স্পষ্ট। তাঁর গান এখনও শোনা হয়, তাঁর কণ্ঠ এখনও নতুন প্রজন্মকে টানে, তাঁর সৃষ্টির মানবিক বার্তা এখনও প্রাসঙ্গিক। তাই শতবর্ষ পেরিয়েও তিনি শুধুমাত্র অতীতের শিল্পী নন; তিনি বর্তমানেরও শিল্পী।আজকের সন্ধ্যার শেষ পর্ব সেই জীবন্ত উত্তরটিকেই যেন আরও একবার সামনে আনবে।
 
অসম সরকারের সাংস্কৃতিক বিষয়ক দফতরের এই উদ্যোগ তাই নিছক জন্মশতবর্ষ পালন নয়। এটি এক শিল্পীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রয়াস। সেই শিল্পী, যিনি অসমের পরিচয়কে সারা দেশে পৌঁছে দিয়েছিলেন, আবার বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গেও তৈরি করেছিলেন গভীর সেতুবন্ধন।আজ সন্ধ্যা ৬টায় টালিগঞ্জের সেই বাড়িতে যখন শ্রদ্ধার আলো জ্বলবে, তখন হয়তো মনে হবে—সময় তাঁকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর কণ্ঠকে নয়।
 
 

ভূপেন হাজারিকা নেই, কিন্তু তাঁর গান আছে।

তাঁর স্মৃতি আছে।

তাঁর মানবিকতার বার্তা আছে।

আর সেই কারণেই আজকের এই শেষ পর্ব আসলে কোনও সমাপ্তি নয়।

বরং সুধাকণ্ঠকে আরও একবার হৃদয়ের গভীরে ফিরিয়ে নেওয়ার এক আবেগঘন সন্ধ্যা।