ঘৃণার বিরুদ্ধে গজল: বশীর বদরের প্রাসঙ্গিকতা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
ঘৃণার বিরুদ্ধে গজল: বশীর বদরের প্রাসঙ্গিকতা
ঘৃণার বিরুদ্ধে গজল: বশীর বদরের প্রাসঙ্গিকতা
 
মীর আলতাফ

সাম্প্রদায়িক হিংসার ভয়াবহতায় যখন তাঁর ঘরবাড়ি, ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার এবং অমূল্য পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, তখন বশীর বদরের সামনে তিক্ততা ও প্রতিশোধের পথ বেছে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু তিনি সেই পথে হাঁটেননি। বরং নিজের যন্ত্রণা ও ক্ষতকে মানবতা, সম্প্রীতি এবং সহাবস্থানের বার্তায় রূপান্তরিত করেছিলেন। হিন্দি ও উর্দুভাষী মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন গড়ে তুলে তিনি সমকালীন ভারতের কাছে মিলন ও সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে ওঠেন।
 
জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং অপ্রয়োজনীয় আবেগের বোঝা নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, 
 
"উজালে আপনি ইয়াদোঁ কে হামারে সাথ রহনে দো,
না জানে কিস গলি মে জিন্দেগি কি শাম হো যায়ে।"
 
(তোমার স্মৃতির আলো আমার সঙ্গে থাকতে দাও; কে জানে জীবনের সন্ধ্যা কোন গলিতে নেমে আসে।)
 
বশীর বদর
 
২৮ মে বশীর বদরের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে ভারত উর্দু গজলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠস্বরকে হারায়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর কবিতা সাহিত্যজগতের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। তাঁর শের পৌঁছে গিয়েছিল মুশায়েরা, শ্রেণিকক্ষ, সংবাদপত্র, শুভেচ্ছা কার্ড, ড্রয়িংরুম, টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ, যারা কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে উর্দু শেখেননি, তাঁর কবিতার পঙ্‌ক্তি অনায়াসে উদ্ধৃত করতে পারতেন।
 
তবে বশীর বদরের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব শুধু সাহিত্যিক নয়। স্বাধীনোত্তর ভারতের অন্যতম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তিনি তিক্ততার পরিবর্তে মানবতাকে, অভিযোগের পরিবর্তে সম্প্রীতিকে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর জীবন ও কবিতা দেখিয়েছে যে সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস, সহমর্মিতা ও সহাবস্থান ক্ষোভ ও বিভেদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
 
উর্দু গজল দীর্ঘদিন ধরে তার সৌন্দর্য, পরিশীলিত রূপ এবং বহুমাত্রিক অর্থের জন্য সমাদৃত। কিন্তু কখনও কখনও এই ধারা সাধারণ পাঠক ও কবিতার মধ্যে দূরত্বও তৈরি করেছিল। বশীর বদর সেই দূরত্ব কমিয়ে আনেন।
 
তিনি গজলে সহজ কথোপকথনের সুর এনে দেন। তাঁর কবিতা প্রেম, বন্ধুত্ব, একাকীত্ব, স্মৃতি, হতাশা, আশা এবং মানবিক সম্পর্কের কথা এমন ভাষায় বলত, যা ছিল অন্তরঙ্গ ও সহজবোধ্য। সাহিত্য সমালোচক যেমন তাঁর কবিতা উপভোগ করতে পারতেন, তেমনই সাধারণ পাঠকরাও সহজে তা বুঝতে পারতেন। তাঁর কবিতা মুশায়েরা থেকে কলেজ ক্যাম্পাসে, বইয়ের তাক থেকে বসার ঘরে এবং পরে ডিজিটাল যুগেও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে অসংখ্য মানুষ উর্দু সাহিত্য সমালোচনার জটিলতা না জেনেও তাঁর শের উদ্ধৃত করে চলেছেন।
 
উত্তর প্রদেশের গভর্নর লালজি টন্ডন লখনউতে তাঁর বাসভবনে বশীর বদরকে পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রদান করছেন
 
এই অর্থে বশীর বদর কবিতাকে আবার জনপরিসরে ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে মহান সাহিত্যকে দুর্বোধ্য হওয়ার প্রয়োজন নেই।
 
"ইয়াহাঁ এক বাচ্চে কে খুন সে যা লিখা হুয়া হ্যায় উসে পড়ো,
তেরা কীর্তন অভি পাপ হ্যায়, অভি মেরা সজদা হারাম হ্যায়।"
 
(এখানে একটি শিশুর রক্ত দিয়ে যা লেখা হয়েছে, তা পড়ো; এখন তোমার কীর্তন পাপ, আর আমার সিজদাও নিষিদ্ধ।)
 
তাঁর শের ভাষার সীমানা অতিক্রম করেছিল বিস্ময়কর সহজতায়। হিন্দি সাহিত্যসভায় সেগুলি উদ্ধৃত হয়েছে, মূলধারার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, শুভেচ্ছা কার্ডে ছাপা হয়েছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। যখন ভাষাকে প্রায়ই বিভেদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো, তখন বশীর বদর ভাষার মাধ্যমে মিলনের কথা বলেছেন।
 
"লোগ টুট জাতে হ্যায় এক ঘর বানানে মে,
তুম তরস নেহি খাতে বস্তিয়াঁ জলানে মে।"
 
(একটি ঘর গড়তে মানুষের জীবন কেটে যায়, অথচ তুমি পুরো বসতি পুড়িয়ে দিতে একটুও করুণা অনুভব করো না।)
 
১৯৮৭ সালে মিরাটে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় তাঁর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর বাড়ি, ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার এবং অমূল্য অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলি ছাই হয়ে যায়। তিনি মিরাট ছেড়ে চলে যান, কিন্তু সেই ক্ষত কখনও পুরোপুরি শুকায়নি। এরপর যা ঘটেছিল, তা আধুনিক ভারতীয় সাহিত্য ইতিহাসে নৈতিক দৃঢ়তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ। বশীর বদর কখনও সহিংসতাকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করতে দেননি কিংবা মানুষকে সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করেননি। এমনকি ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকেও তিনি সামষ্টিক ঘৃণায় রূপান্তরিত হতে দেননি।
 
বরং তিনি নিজের কষ্টকে শান্তির আহ্বানে রূপ দিয়েছিলেন। উপরের শেরটির স্থায়ী শক্তি তার সার্বজনীনতায় নিহিত। এটি কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়ের কথা বলে না, কাউকে দোষারোপ করে না কিংবা ক্ষোভকে দীর্ঘস্থায়ী করে না। এটি মানবিক ক্ষতির জন্য শোক প্রকাশ করে এবং প্রতিটি বাড়ির মর্যাদা ও প্রতিটি ধ্বংসযজ্ঞের ট্র্যাজেডিকে স্বীকৃতি দেয়।
 
"কুছ তো মজবুরিয়াঁ রহি হুঁ গি,
ইউঁ কোই বেওফা নেহি হোতা।"
 
(নিশ্চয়ই কোনো না কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল; এমনিই কেউ অবিশ্বস্ত হয়ে যায় না।)
 
বশীর বদর ও তাঁর পিএইচডি ডিগ্রির একটি ছবি
 
আধুনিক উর্দু কবিতায় সহাবস্থানের দর্শনকে এত শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করতে পেরেছে, এমন শের খুব কমই আছে। বশীর বদর কখনও কবিতাকে মতাদর্শের বন্দি হতে দেননি। তিনি কোনো সম্প্রদায়ের মুখপাত্র কিংবা কোনো উদ্দেশ্যের প্রচারক হিসেবে লেখেননি। তিনি লিখেছেন মানবজীবনের একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে, প্রেম, বিচ্ছেদ, বন্ধুত্ব, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমা, বার্ধক্য ও আশার গল্প।
 
বশীর বদরের অসাধারণত্ব ছিল এই যে, তিনি মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, পরিচয়, রাজনীতি ও পরিস্থিতির নানা স্তরের নিচে মানুষ আসলে অভিন্ন অনুভূতি ও স্বপ্নের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
 
জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি
 
"ওহ চিরাগ খুদ নেহি জলতা জিসে হাওয়া না মিলি,
ইয়ে অউর বাত কি আঁধি মে ভি জলা হুঁ ম্যায়।"
 
(যে প্রদীপ বাতাস পায় না, সে নিজে জ্বলে উঠতে পারে না; তবে আমি সেই প্রদীপ, যে ঝড়ের মধ্যেও জ্বলতে থেকেছি।)
 
তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। এই সম্মানগুলি ভারতের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর উদ্যোগের সময়ও বশীর বদর সাংস্কৃতিক সংলাপ ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বৈরিতার চেয়ে সংলাপ শক্তিশালী এবং সংঘাতের চেয়ে সংস্কৃতি অধিক স্থায়ী।
 
সমকালীন ভারতের জন্য শিক্ষা
 
"দুশমনি জম কর করো লেকিন ইয়ে গুঞ্জাইশ রহে,
যব কভি হাম দোস্ত হো যায়েঁ তো শরমিন্দা না হোঁ।"
 
(আমাকে প্রাণভরে বিরোধিতা করো, কিন্তু এমন সীমা অতিক্রম কোরো না, যাতে কোনোদিন আবার বন্ধু হলে লজ্জিত হতে হয়।)
 
উর্দু সংস্কৃতি ও মুসলিম সামাজিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত হয়েও বশীর বদর সমগ্র দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর জীবন এক নীরব আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, নিজের পরিচয়কে রক্ষা করো, কিন্তু সেতুবন্ধন গড়ো; নিজের কষ্টকে মনে রাখো, কিন্তু তার বন্দি হয়ে থেকো না; উৎকর্ষের জন্য চেষ্টা করো এবং তোমার কাজকে সম্প্রদায়ের সীমানার বাইরে কথা বলতে দাও।
 

অনেক দিক থেকেই বশীর বদর দেখিয়েছেন যে সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং জাতীয় পরিচয় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তারা একে অপরকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তিনি উর্দু গজলকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি সহমর্মিতাকেও গণমানুষের সম্পদে পরিণত করেছিলেন।
 
ঘৃণার পরিবর্তে মানবতাকে বেছে নিয়ে বশীর বদর শুধু এক বিশাল কাব্যভাণ্ডারই রেখে যাননি, সমকালীন ভারতের জন্য রেখে গেছেন একটি নৈতিক দিশারি। তাঁর জীবন ও সাহিত্য আমাদের শেখায় যে বিভাজন নয়, সংলাপ; প্রতিহিংসা নয়, সহমর্মিতা; এবং বিদ্বেষ নয়, মানবতাই একটি সুস্থ ও শক্তিশালী সমাজ গঠনের ভিত্তি হতে পারে। তাঁর উত্তরাধিকার তাই কেবল উর্দু সাহিত্যের সম্পদ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রেরণা।