শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী ঃ
১৩৫ বছরের ঐতিহ্য, লক্ষ লক্ষ সমর্থকের আবেগ, আর তার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকা গভীর আর্থিক সংকট। এই কঠিন সময়েই কলকাতার ঐতিহ্যবাহী মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হাল ধরলেন নওদার বিধায়ক এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবীর। শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি ক্লাবের নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রাক্তন সভাপতি আমিরুদ্দিন ববির পদত্যাগের পর ট্রাস্টি বোর্ড ও কার্যকরী কমিটির আলোচনায় সর্বসম্মতিক্রমে হুমায়ুন কবীরকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত কয়েকদিন ধরেই তাঁর সভাপতি হওয়ার জল্পনা চলছিল। অবশেষে ৬ জুন দুপুরে সেই জল্পনায় সিলমোহর পড়ে।দায়িত্ব গ্রহণের পরই নতুন সভাপতি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন— মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবে তিনি রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটতে দেবেন না।"এই ক্লাবের পরিচয় ফুটবল ও ক্রীড়া ঐতিহ্য। এখানে রাজনৈতিক বিভাজনের কোনও জায়গা নেই। সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করেই মহমেডানকে আবার সাফল্যের পথে ফেরাতে হবে," সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন তিনি।
তবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ক্লাবের ভয়াবহ আর্থিক সংকট। সূত্রের খবর, বর্তমানে মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মাথায় প্রায় ১৩ কোটি টাকার দেনা রয়েছে। খেলোয়াড়দের বেতন বকেয়া, বিভিন্ন প্রশাসনিক খরচ, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে জটিলতা— সব মিলিয়ে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রতিষ্ঠান।
বিধায়ক এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবীর
নতুন সভাপতি জানিয়েছেন, তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার হবে ফুটবলারদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ করা।"যাঁদের বেতন বকেয়া রয়েছে, তাঁদের অন্তত ৫০ শতাংশ পাওনা দ্রুত মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। ফুটবলারদের সম্মান রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব," বলেন হুমায়ুন কবীর।তিনি আরও বলেন, "১৩৫ বছরের এই ক্লাব কোনও এক ব্যক্তির পক্ষে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রাক্তন ফুটবলার, সমর্থক, প্রশাসক, ব্যবসায়ী— সকলকে নিয়ে সম্মিলিত উদ্যোগে কাজ করতে হবে।"
ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান মহমেডান স্পোর্টিং ১৮৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতার তিন প্রধানের অন্যতম এই ক্লাব বহু ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। ১৯৩৪ সালে প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে ক্যালকাটা ফুটবল লিগ জয়ের নজির গড়েছিল মহমেডান। পরবর্তী সময়ে টানা পাঁচবার লিগ জিতে ভারতীয় ফুটবলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল সাদা-কালো ব্রিগেড।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই গৌরব অনেকটাই ম্লান হয়ে গিয়েছে। আইএসএলে সুযোগ পেয়েও আর্থিক অনিশ্চয়তা ও দুর্বল দলগঠনের কারণে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি মহমেডান। গত মরশুমের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের জেরে দলকে দ্বিতীয় ডিভিশনে নেমে যেতে হয়েছে।নতুন সভাপতি এই পরিস্থিতিকে "লজ্জাজনক" বলে উল্লেখ করেছেন।"মহমেডানের মতো ক্লাবের দ্বিতীয় ডিভিশনে খেলা সমর্থকদের কাছে অত্যন্ত কষ্টের। আগামী মরশুমে শক্তিশালী দল গঠন করে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে হবে," তাঁর মন্তব্য।
এই আর্থিক বিপর্যয়ের জন্য প্রাক্তন সভাপতি আমিরুদ্দিন ববি বিনিয়োগকারী সংস্থা বাঙ্কারহিল এবং শ্রাচী গ্রুপের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে দায়ী করেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন হুমায়ুন কবীরও।তিনি জানান, "সরকারি স্তরেও আলোচনা প্রয়োজন। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হবে। মহমেডান শুধু একটি ক্লাব নয়, এটি বাংলার ক্রীড়া ঐতিহ্যের অংশ।"
এদিকে সামনে কলকাতা ফুটবল লিগ। কিন্তু দলগঠন নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে প্রতিযোগিতামূলক দল তৈরি করাই কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা।তবে সংকটের মধ্যেও আশাবাদী নতুন সভাপতি।"বর্তমান পরিস্থিতি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। আমরা দ্রুত আর্থিক সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজব। সমর্থকদের মুখে হাসি ফেরানোই আমাদের লক্ষ্য," বলেন তিনি।
মহমেডানের নতুন সভাপতি হুমায়ুন কবীর
মহমেডানের ইতিহাস বলছে, এই ক্লাব বহুবার প্রতিকূলতা কাটিয়ে ফিরে এসেছে। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীনোত্তর ভারত— নানা সময়ে সামাজিক ও ক্রীড়া আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছে সাদা-কালো শিবির। তাই আবারও কি সেই লড়াকু মানসিকতা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে মহমেডান?এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। তবে কোটি কোটি টাকার দেনার বোঝা মাথায় নিয়েও নতুন সভাপতি হুমায়ুন কবীর যে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন, তাতে আশার আলো দেখছেন ক্লাবের লক্ষ লক্ষ সমর্থক। হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
মহমেডানের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। এখন দেখার, এই অধ্যায় ইতিহাসের নতুন সাফল্যের গল্প লেখে, নাকি সংকটের অন্ধকার আরও গভীর হয়।