হাফিজ কিদওয়াই ঃ
“তোমার স্মৃতির আলো আমার সঙ্গে থাকতে দাও,
জানি না জীবনের সন্ধ্যা কোন গলিতে নেমে আসে।”
খ্যাতনামা শায়ের ও পদ্মশ্রী ড. বশির বদরের প্রয়াণের পর তাঁর এই শের যেন গোটা দেশের মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। এটি আর শুধু একটি গজলের পংক্তি নয়, যেন তাঁর জীবনের শেষ ব্যাখ্যায় পরিণত হয়েছে। উর্দু সাহিত্যের সেই উজ্জ্বল নাম, যার কবিতা বইয়ের পাতার গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের অনুভূতির অংশ হয়ে উঠেছিল, তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। ৯১ বছর বয়সে ভোপালের নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে ডিমেনশিয়ায় ভুগছিলেন ড. বশির বদর। গত কয়েক বছর ধরে তিনি মুশায়েরা ও জনসমক্ষে উপস্থিতি থেকেও নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর সামাজিক মাধ্যমে জানান তাঁর স্ত্রী ড. রাহত বদর। ছোট্ট এক বার্তায় তিনি লেখেন, “বশির সাহেব আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন… দোয়া করবেন।” এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই সাহিত্যজগৎ, কবি-শায়ের এবং তাঁর অসংখ্য অনুরাগীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
১৯৩৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অযোধ্যার তৎকালীন ফৈজাবাদে জন্মগ্রহণ করেন বশির বদর। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। পরে তিনি মেরঠ কলেজে উর্দু বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে ভাগ্য তাঁকে নিয়ে আসে ভোপালে। এই শহরই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর সেখানেই তিনি দেখলেন জীবনের শেষ সকাল।
বশির বদর সেই সব শায়েরদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, যাঁরা উর্দু কবিতাকে কঠিন শব্দের গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের ভাষায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর গজল শুধু সাহিত্যসভা বা মুশায়েরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কলেজ জীবনের বন্ধুত্ব, প্রেমের শুরু, ভাঙা সম্পর্ক কিংবা একাকী সন্ধ্যার অনুভূতিতেও জায়গা করে নিয়েছিল তাঁর কবিতা। হয়তো সেই কারণেই তাঁর প্রতিটি শের মানুষের নিজের জীবনের কথাই মনে করিয়ে দিত।
তাঁর কবিতায় ছিল প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও বেদনার ছোঁয়া। একই সঙ্গে ছিল জীবনের গভীর বাস্তবতার উপলব্ধিও। সমাজের বদলে যাওয়া মানসিকতা এবং সম্পর্কের সূক্ষ্ম আবেগ তিনি অত্যন্ত সহজ ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বহু শের আজও মানুষের দৈনন্দিন কথোপকথনের অংশ হয়ে আছে।
তাঁর একটি বিখ্যাত শের—
“শত্রুতা করো মন ভরে, তবু এতটুকু সুযোগ রেখো,
যদি কোনওদিন আবার বন্ধু হয়ে যাই, তবে যেন লজ্জিত হতে না হয়।”
এই শের শুধু সম্পর্কের কথাই বলে না, এটি মানবতা ও সৌহার্দ্যের এক গভীর শিক্ষা দেয়। খুব কম শব্দে গভীর অনুভূতি প্রকাশ করাই ছিল বশির বদরের বিশেষত্ব।তাঁর কবিতায় সাধারণ মানুষের জীবন উঠে এসেছে বারবার। তিনি শুধু প্রেমের কবি ছিলেন না, সমাজের যন্ত্রণা ও অস্থিরতাকেও গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন। তাই দাঙ্গা ও হিংসার খবরের মাঝেও আজও তাঁর এই শের বারবার মনে পড়ে—
“একটা ঘর গড়তে গড়তেই মানুষ ভেঙে পড়ে,
আর তুমি বিন্দুমাত্র দয়া না করে গোটা বসতি জ্বালিয়ে দাও।”
বশির বদর তাঁর শব্দের মাধ্যমে সমাজকে আয়না দেখিয়েছিলেন। তিনি ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালোবাসার কথা বলেছেন, সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখার বার্তা দিয়েছেন। সম্ভবত সেই কারণেই তাঁর গজল প্রতিটি সময়েই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক থেকেছে।
১৯৯৯ সালে তিনি সাহিত্য একাডেমী পুরস্কারে সম্মানিত হন। পরে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্ৰী সম্মানেও ভূষিত করে। এই সম্মান শুধু একজন শায়েরকে নয়, সেই কণ্ঠস্বরকে দেওয়া হয়েছিল, যিনি উর্দু সাহিত্যকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
ভুপালের ফতেহগড় এলাকায় অবস্থিত তাঁর বাড়ি “বশির মঞ্জিল” বহু বছর ধরে সাহিত্য আড্ডা ও মুশায়েরার কেন্দ্র ছিল। দেশ-বিদেশ থেকে কবি, লেখক, সাংবাদিক ও সাহিত্যপ্রেমীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর কথা শুনতেন।কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব বদলাতে শুরু করে। ডিমেনশিয়া ধীরে ধীরে তাঁর স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে দেয়।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে পরিস্থিতি এমন হয়ে উঠেছিল যে, বশির বদর অনেক সময় নিজের লেখা শেরও ভুলে যেতেন। শব্দের সেই জাদুকরকেই তখন শব্দ খুঁজতে দেখা যেত। তবুও তাঁর পাশে ছায়ার মতো ছিলেন স্ত্রী ড. রাহত বদর ও ছেলে তাইয়্যব। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর যত্নে কোনও খামতি রাখা হয়নি। অনুরাগীরাও নিয়মিত তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। কেউ তাঁর বিখ্যাত শের শুনিয়ে দিতেন, আর কখনও কখনও তিনি মৃদু হেসে সাড়া দিতেন।
খ্যাতনামা শায়ের ওয়াসিম বেরেলভি তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “বশির বদরের চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ হওয়া অসম্ভব।” দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মুশায়েরায় তাঁদের একসঙ্গে পথচলা ছিল এবং নিজের কবিতা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষকে প্রভাবিত করেছিলেন।
অন্যদিকে অঞ্জুম বারাবাঙ্কভি, প্রখ্যাত উর্দু শায়ের ও গজলকার বলেন, “নতুন গজলের সবচেয়ে বড় নাম আজ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।” তাঁর মতে, বশির বদর গজলকে এক নতুন ভাষা ও নতুন ভঙ্গি দিয়েছিলেন, যা তাঁকে বিশ্বজুড়ে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ এই যে, তাঁর শের শুধু বইয়ের পাতায় আটকে থাকেনি। সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট থেকে রাজনৈতিক বক্তৃতা, প্রেমপত্র থেকে সাধারণ মানুষের কথোপকথন— সর্বত্রই শোনা গিয়েছে তাঁর শব্দের জাদু।
তাঁর আর একটি বিখ্যাত শের আজও বহু মানুষের চোখ ভিজিয়ে দেয়—
“খুঁজতে গেলে হয়তো কাউকে ঠিকই পাওয়া যাবে,
কিন্তু তোমার মতো করে আর কে আমাকে ভালোবাসবে?”
এই শের শুধু প্রেমের অনুভূতি নয়, তাঁর চলে যাওয়ার পর সাহিত্যজগতে তৈরি হওয়া গভীর শূন্যতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বশির বদর আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাঁর কবিতা, তাঁর শব্দ আর ভালোবাসার বার্তা চিরকাল বেঁচে থাকবে। উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নাম সর্বদা শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তাঁর গজল আগামী প্রজন্মকেও মানবতা, সংস্কৃতি ও ভালোবাসার পথ দেখাবে।
সত্যি বলতে, বশির বদর শুধু একজন শায়ের ছিলেন না। তিনি ছিলেন অনুভূতির এক অনন্ত নাম, এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। আর আজ যখন তাঁর জীবনের সন্ধ্যা নেমে এসেছে, তখন তাঁর স্মৃতির আলো বহুদিন ধরে মানুষের হৃদয়ে জ্বলতে থাকবে।