চুরুলিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বিদ্রোহী কবির স্মৃতি

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 h ago
চুরুলিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বিদ্রোহী কবির স্মৃতি
চুরুলিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বিদ্রোহী কবির স্মৃতি
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার ছোট্ট গ্রাম চুরুলিয়া শুধু একটি জনপদ নয়, এটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক স্মৃতিভূমি। এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক উদাসীনতা, খনি সম্প্রসারণ এবং আধুনিক নির্মাণের চাপে একে একে হারিয়ে যাচ্ছে কবির জীবনের বহু মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন।
 
 
১৯৬২ সালের ৩০ জুন মারা যান নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা দেবী। তাঁর মরদেহ সমাহিত করার জন্য আনা হয়েছিল চুরুলিয়ায়, কবির প্রিয় পীর হাজি পালোয়ান সাহেবের দরগার কাছে। সেই সময় অসুস্থ ও নির্বাক কবিকেও জন্মভূমিতে আনা হয়। কিন্তু তখনকার ছোট্ট নজরুল একাডেমিতে বিপুল জনসমাগম সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে গ্রামের শতবর্ষ প্রাচীন নবকৃষ্ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে কবিকে রাখা হয়েছিল। আজও সেই কক্ষটি স্কুল কর্তৃপক্ষ সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছে। সেখানে রয়েছে কবির ব্যবহৃত চায়ের কাপ, খাবারের থালা, বসার চেয়ার, একটি টিনের বাক্স এবং একটি হারমোনিয়াম—যেটি বাজিয়ে সেই সময় কবিকে গান শোনানো হয়েছিল।
 
কিন্তু এখন সেই ঐতিহাসিক নবকৃষ্ণ উচ্চ বিদ্যালয়টিকেই ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড (ইসিএল)-এর খনি সম্প্রসারণ প্রকল্পের কারণে এই স্কুলটি ওপেনকাস্ট খনির আওতায় পড়ে গেছে। শুধু এই স্কুল নয়, গ্রামের শৈলবালা বালিকা বিদ্যালয় ও আরও কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও একই সংকটের মুখে।এটাই প্রথম নয়। কবির আসল জন্মভিটা ১৯৫০-এর দশকেই ভেঙে ফেলা হয়েছিল। পরে সেখানে গড়ে ওঠে নজরুল একাডেমি। কিন্তু কয়েক মাস আগেই সেই একাডেমিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানে কবির জন্মকালের আটচালা মাটির বাড়ির আদলে নতুন পাকা স্থাপনা নির্মাণ করছে রাজ্য সরকারের পর্যটন দপ্তর। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ঐতিহ্য সংরক্ষণের বদলে স্মৃতির আসল চিহ্ন মুছে দিয়ে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম প্রতিরূপ।
 
১৯৬৭ সালে  নজরুল শেষবার চুরুলিয়ায় এসেছিলেন। সেই সময় তিনি নজরুল একাডেমির বাড়িতে সপ্তাহখানেক ছিলেন 
। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেই মসজিদেও, যেখানে ছোটবেলায় তিনি ইমামতি করতেন ও আজান দিতেন। কিন্তু সেই মাটির দেয়াল ও খড়ের চালের মসজিদ আজ আর নেই। তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বিশাল গম্বুজওয়ালা পাকা দালান। কবির শৈশবের মক্তবঘরও বিলীন হয়ে গেছে বহু আগেই।চুরুলিয়ায় এখনও টিকে আছে পীর হাজি পালোয়ান সাহেবের মাজার, যার সঙ্গে নজরুলের আত্মিক সম্পর্ক ছিল গভীর। ছোটবেলায় এই দরগাতেই সময় কাটাতেন তিনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এই মাজারে আজও সরকারি সংরক্ষণের তেমন কোনো ছাপ নেই।
 
একসময় কয়লার মান ও সুড়ঙ্গের গভীরতার জন্য বিখ্যাত ছিল চুরুলিয়ার তারা কোলিয়ারি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নতুন করে ওপেনকাস্ট খনি চালু হয়েছে এলাকায়। সেই খনির বিস্তার এখন গ্রাস করছে নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলোকেও। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন—উন্নয়নের নামে কি ধীরে ধীরে মুছে ফেলা হচ্ছে বিদ্রোহী কবির জীবনের বাস্তব ইতিহাস?
 
চুরুলিয়া আজ শুধু একটি গ্রামের সংকটের গল্প নয়, এটি বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার এক বড় প্রশ্নও বটে।