সৈয়দা সাইয়্যিদিন হামিদ, নীতিনির্ধারণের শীর্ষে এক সংগ্রামী কণ্ঠ

Story by  Aasha Khosa | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
 সৈয়দা সাইয়্যিদিন হামিদ
সৈয়দা সাইয়্যিদিন হামিদ
 
আশা খোসা

ভারতের জনজীবনে এমন নারীর সংখ্যা খুবই কম, যাঁরা একদিকে সামাজিক ন্যায়, মানবাধিকার ও জনস্বার্থের প্রশ্নে নিরলসভাবে কাজ করেছেন, অন্যদিকে সরকারি নীতিনির্ধারণের সর্বোচ্চ স্তরেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মুসলিম সমাজের নারীদের মধ্যে সৈয়দা সাইয়্যিদিন হামিদ এই বিরল ব্যতিক্রমগুলির অন্যতম।লেখিকা, শিক্ষাবিদ এবং সমাজকর্মী হিসেবে সুপরিচিত সাইয়্যিদিন হামিদ ছিলেন ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের (বর্তমানে নীতি আয়োগ) প্রথম মুসলিম মহিলা সদস্য। এছাড়াও তিনি জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বহুমাত্রিক অবদানের জন্য তিনি আজও একজন প্রভাবশালী ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন।

আজও ৮২ বছর বয়সে সাইয়্যিদিন হামিদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। মানবাধিকার রক্ষায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং ভারতে বিভিন্ন নাগরিক সমাজভিত্তিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তিনি মোহিনী গিরি ও নির্মলা দেশপান্ডের সঙ্গে মুসলিম উইমেন্স ফোরাম এবং উইমেন্স ইনিশিয়েটিভ ফর পিস ইন সাউথ এশিয়া (WIPSA)-এর প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের পর মানবতার স্বার্থে এবং দুই দক্ষিণ এশীয় দেশের মধ্যে ট্র্যাক-টু কূটনীতি এগিয়ে নিয়ে যেতে পাকিস্তান সফরকারী WIPSA প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন তিনি।
 
সৈয়দা সাইয়্যিদিন হামিদ
 
সাইয়্যিদিন হামিদের পূর্বপুরুষরা প্রায় ৮০০ বছর আগে আফগানিস্তানের হেরাত থেকে তুর্কি সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের আমলে ভারতে আসেন। সুফি ইসলামের অনুসারী এবং খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ হওয়ায় পরিবারের প্রধানকে রাজ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সুলতান তাঁকে বর্তমান পানিপথ অঞ্চলে বসবাসের জন্য বিশাল উর্বর জমি উপহার দেন। মজার বিষয় হলো, দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির জামিয়া নগরে বসবাস করলেও সাইয়্যিদিন হামিদ এখনও পানিপথকেই তাঁর ‘ওয়াতান’ বা মাতৃভূমি বলে উল্লেখ করেন।
 
দেশভাগের আগে কাশ্মীরে তাঁর জন্ম। দিল্লিতে স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করার পর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়েছিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে তিনি কানাডার আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য যোগ দেন এবং ১৯৭২ সালে সেখানে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। একই সঙ্গে তিনি সেখানে শিক্ষকতাও করেন। পরে আলবার্টা সরকারের মিনিস্টার অব অ্যাডভান্সড এডুকেশন অ্যান্ড ম্যানপাওয়ার-এর নির্বাহী সহকারী হিসেবেও কাজ করেন।
 
সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় এবং পরবর্তীতে তিনি এস. এম. এ. হামিদ-কে বিয়ে করেন, যিনি ব্যবসা প্রশাসন ও বাণিজ্য অনুষদের অধ্যাপক ছিলেন। তবে ১৯৮৪ সালে এই দম্পতি ভারতে ফিরে আসেন। তিনি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুফিবাদ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, যে সুফি ঐতিহ্যের সূত্রেই তাঁর পূর্বপুরুষরা ভারতে এসেছিলেন। পাশাপাশি মুসলিম সমাজ-রাজনীতি এবং মওলানা আবুল কালাম আজাদ সম্পর্কেও গবেষণা চালিয়ে যান।
 
সৈয়দা সাইয়্যিদিন হামিদ
 
১৯৯৭ সালে ইন্দর কুমার গুজরাল সরকারের আমলে তিনি জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখানে তিনি ‘ভয়েস অব দ্য ভয়েসলেস’ এবং ‘মাই ভয়েস শ্যাল বি হার্ড’-এর মতো প্রতিবেদন তৈরি করেন, যা পরবর্তী আইন প্রণয়নে অন্তর্ভুক্ত হয়। সমাজে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের সময় তিনি আরও সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং একাধিক সংগঠন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা নেন। তিনি মুসলিম উইমেন্স ফোরামের দুই প্রতিষ্ঠাতা নারীর একজন ছিলেন।
 
২০০০ সালে জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য হিসেবে তিনি সারা ভারত সফর করে গণশুনানিতে মুসলিম নারীদের বক্তব্য শোনেন। তাঁর সুপারিশগুলি সরকার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের কাছে নীতি নির্ধারণের জন্য উপস্থাপন করা হয়। পরে তিনি আবারও বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে আরেকটি প্রতিবেদন জমা দেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ইউপিএ সরকার ভারতের মুসলমানদের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনার জন্য বিচারপতি রাজিন্দর সচার কমিটি গঠন করে।
 
তিনি ‘ইসলামিক সিল অন ইন্ডিয়াস ইন্ডিপেনডেন্স: আবুল কালাম আজাদ, এ ফ্রেশ লুক’ (১৯৯৮) এবং ‘ড. জাকির হুসেন: টিচার হু বিকেম প্রেসিডেন্ট’ (২০০০)-সহ একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এছাড়া উর্দু ভাষায় বহু বই লিখেছেন এবং ইংরেজি ও উর্দুতে বিভিন্ন গ্রন্থ অনুবাদ ও সংকলন করেছেন।
 
সমাজসেবায় অবদানের জন্য তিনি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। দিল্লিতে বসবাসের সময় সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বাড়ে। তিনি সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (SAHR) এবং সেন্টার ফর ডায়ালগ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন (CDR) প্রতিষ্ঠা করেন।
 
খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার খাজা আহমেদ আব্বাস, যিনি তাঁর মামা ছিলেন, তাঁর লেখাসংকলন নিয়ে সম্পাদিত বই ‘ব্রেড, বিউটি অ্যান্ড রেভলিউশন’ (তুলিকা বুকস) প্রকাশের একদিন পর দক্ষিণ দিল্লির জামিয়া নগরের বাড়ির লনে বসেছিলেন সৈয়দা সাইয়্যিদিন হামিদ। এটি তাঁর কৃতিত্বের ঝুলিতে থাকা ২০তম বই হলেও তাঁর হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের বই।
 
ড. মনমোহন সিং-এর সঙ্গে সাইয়্যিদিন হামিদ
 
জাতীয় মহিলা কমিশনে কর্মরত অবস্থায় পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় কন্যাভ্রূণ হত্যা রোধে তিনি গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন। তাঁর ‘ওয়াতান’ পানিপথে গিয়ে তিনি বিস্মিত হন দেখে যে, একসময় যেখানে নারীরা বিশাল কৃষিজমি ও সম্পত্তির মালিক ছিলেন এবং পুরুষেরা শিক্ষাবিদ হিসেবে দূর-দূরান্তে যেতেন, সেই অঞ্চলেই কন্যাভ্রূণ হত্যার কারণে নারী-পুরুষ অনুপাত দেশের মধ্যে অন্যতম নিম্ন।
 
তিনি একবার বলেছিলেন, জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্য হিসেবে ওই জেলায় গিয়ে পরিস্থিতি দেখে তিনি হতবাক হয়ে পড়েন। তাঁর ভাষায়, “আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে এটাই সেই স্থান, যেখানে আমার প্রপিতামহ আলতাফ হুসেন হালি ১৮৫৭ সালেই নারী মুক্তির পক্ষে তাঁর বিখ্যাত কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।”
 
দেশভাগের সময় তাঁর হালি পরিবারকে জোরপূর্বক পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল এই আশ্বাস দিয়ে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাঁদের ফিরিয়ে আনা হবে। বর্তমানে তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে আছেন, আর তিনি দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন।
 
সম্প্রতি অবৈধ বাংলাদেশিদের পক্ষে কথা বলার অভিযোগে তিনি ট্রোলের শিকার হন। তবে যারা তাঁকে চেনেন, তাঁদের মতে দক্ষিণ এশিয়ার ঐক্য প্রতিষ্ঠার গভীর আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি কাজ করেন। পাকিস্তান সময় নিলেও শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে একটি সাংস্কৃতিক ভ্রাতৃত্বে পরিণত করার ধারণার পক্ষে তিনি মত দেন।
 
 
২০০৪ সালের জুলাই মাসে, ড. মনমোহন সিং ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর, সাইয়্যিদিন হামিদকে ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ করা হয়। সেখানে তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু কল্যাণ, স্বেচ্ছাসেবী ক্ষেত্র, সংখ্যালঘু বিষয়ক কাজ এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প।
 
তিনি মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল উর্দু ইউনিভার্সিটি (MANUU), হায়দ্রাবাদ-এর আচার্য (চ্যান্সেলর) ছিলেন এবং ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সেই পদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি লেখালেখি এবং ভারতের মুসলমানদের অধিকার ও স্বার্থ নিয়ে জনমত গঠনের কাজে সময় ব্যয় করছেন।