বাউল সম্রাট লালন ফকির: মানবতাবাদ ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য প্রতীক

Story by  Nikunja Nath | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
নিকুঞ্জ নাথ

লালন ফকির বা লালন শাহ ছিলেন অবিভক্ত বাংলার একজন বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক সাধক, বাউল গুরু, গীতিকার, সমাজসংস্কারক এবং দার্শনিক। তাঁকে ‘বাউল সম্রাট’ বলেও অভিহিত করা হয়। ধর্ম, বর্ণ ও জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল মানবতাকেই শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে মনে করা লালন ফকিরের জীবন ও দর্শন আজও সমগ্র বিশ্বের কাছে এক অনন্য আদর্শ।
 
লালন ফকিরের জন্মস্থান ও পরিচয় নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, ১৭৭৪ সালের আশেপাশে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত ভাড়ারা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জনশ্রুতি অনুসারে, যৌবনকালে তীর্থযাত্রায় যাওয়ার সময় তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে মৃত ভেবে দেহটি নদীতে ভাসিয়ে দেয়। পরে মলম শাহ নামে এক মুসলিম তাঁতি তাঁকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন এবং তাঁর স্ত্রী মতিজানের সঙ্গে মিলে সযত্নে সুস্থ করে তোলেন। এভাবে মুসলিম সমাজের মধ্যে আশ্রয় লাভের পর লালনের মনে জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সমাজের কঠোর নিয়মকানুনের প্রতি গভীর বিরাগ জন্ম নেয়। পরবর্তীকালে আধ্যাত্মিক পথের সন্ধানে তিনি কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামের একটি আশ্রমে এক বাউল গুরুর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন।
 

লালন ফকিরের দর্শনের মূল ভিত্তিই ছিল মানবতাবাদ। তাঁর দর্শনের প্রধান মন্ত্র ছিল, “যা আছে ভাণ্ডে, তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে” (অর্থাৎ যা মানুষের শরীরে রয়েছে, তা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডেও বিরাজমান)। ঈশ্বর বা পরমাত্মা কোনো নির্দিষ্ট মন্দির বা মসজিদে বাস করেন না, বরং প্রতিটি মানুষের অন্তরেই তাঁর অবস্থান, এ কথা লালন গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। তাঁর মতে, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ‘মনের মানুষ’ বা পরমাত্মার অবস্থান, যাঁকে কেবল গভীর আত্মসাধনার মাধ্যমেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
 
তৎকালীন বঙ্গসমাজে প্রচলিত ধর্ম ও জাতপাতের বিভেদের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়ে তিনি এক সীমাহীন, সমতাভিত্তিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন। হিন্দু ও ইসলাম, এই দুই ধর্মের গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি তাঁর গানে বিশ্বজনীন সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, যার ফলে উভয় ধর্মের মানুষই তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
 
লালন ফকিরের জীবদ্দশায় অঙ্কিত একমাত্র প্রতিকৃতি
 
তাঁর গানগুলিতে বারবার ‘মনের মানুষ’ শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়, যা মানুষের অন্তরাত্মা বা ঈশ্বরকে নির্দেশ করে। আত্মশুদ্ধি ও নিঃস্বার্থ প্রেমের মাধ্যমেই এই ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধান পাওয়া যায় বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। লালন হিন্দু ও ইসলাম, উভয় ধর্মের গোঁড়ামি, বর্ণবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর সৃষ্টিতে একটি শ্রেণিহীন ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন প্রতিফলিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, লালন ফকির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি এবং তাঁর গানগুলির কোনো প্রাথমিক লিখিত রূপও ছিল না। তিনি কেবল গান গাইতেন এবং তাঁর শিষ্যরা সেগুলি মুখে মুখে মনে রেখে প্রচার করতেন।
 
ধারণা করা হয়, তিনি প্রায় দুই হাজারেরও বেশি বাউল গান রচনা করেছিলেন। এর মধ্যে “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়”, “সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে”, “মিলন হবে কত দিনে” প্রভৃতি কালজয়ী গান আজও শ্রোতাদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
 
বাংলাদেশে অবস্থিত বাউল সম্রাট লালন ফকিরের পবিত্র মাজার
 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সম্পর্ক
 
লালন ফকির কেবল একজন আধ্যাত্মিক গুরুই ছিলেন না, তিনি স্থানীয় জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধেও ছিলেন এক সক্রিয় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সমাজের এই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে তাঁর একটি অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন ফকিরের দর্শন ও গানের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। শিলাইদহের জমিদারি পরিচালনার সময় রবীন্দ্রনাথ লালনের বহু গান সংগ্রহ করেছিলেন এবং পরে সেগুলি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশ করে লালনের সৃষ্টিকে শিক্ষিত সমাজের সামনে তুলে ধরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৯ সালে লালন ফকিরের জীবদ্দশায় তাঁর একটি পেন্সিল স্কেচ এঁকেছিলেন, যা আজও লালনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিকৃতি হিসেবে ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম-এ সংরক্ষিত রয়েছে।
 
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (১ কার্তিক, ১২৯৭ বঙ্গাব্দ) ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামের নিজ আশ্রমেই লালন ফকির শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বর্তমানে সেই স্থানেই তাঁর মাজার অবস্থিত এবং সেখানে প্রতি বছর ‘লালন মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত হাজার হাজার বাউল সাধক ও অনুরাগীর বিশাল সমাবেশ ঘটে।
 
লালনের গীতের সাধনায় নিমগ্ন তাঁর শিষ্যরা
 
লালন ফকিরের জীবনের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র
 
লালন ফকিরের বর্ণাঢ্য জীবনকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত লালন বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত একটি গভীর অর্থবহ সঙ্গীতনির্ভর নাট্যধর্মী চলচ্চিত্র। ১৪০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রে বাউল সম্রাট ও সমাজসংস্কারক লালন ফকিরের জীবন, দর্শন এবং তাঁর অমর সৃষ্টিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ব্যতিক্রমী দৃশ্যসজ্জা ও চমৎকার উপস্থাপনার জন্য চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশনার বিভাগে সম্মানজনক ২৯তম বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল, যা এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র-নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
 
পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল লালনের গভীর আধ্যাত্মিকতা ও সম্প্রীতির দর্শনকে রূপালি পর্দায় সফলভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই চলচ্চিত্রটি হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের এক জীবন্ত দলিল। হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও লালন তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় মুসলিম সমাজের মধ্যেই অতিবাহিত করেছিলেন এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন; এমনকি একজন মুসলিম কিশোরীকেও তিনি নিজের সন্তান হিসেবে স্নেহে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর আশ্রম এমন এক পবিত্র স্থানে পরিণত হয়েছিল, যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমানভাবে একত্রিত হতেন।