ভুক্তভোগী নয়, নিজের ভাগ্যের নির্মাতা হও: প্রসাশক নাহিদা জাম জামের বার্তা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 14 h ago
নাহিদা জাম জাম
নাহিদা জাম জাম
 
এম শ্রীলতা 

জনবান্ধব প্রশাসক, অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তা এবং নারীশক্তির অকুতোভয় কণ্ঠস্বর, নাহিদা জাম জাম তাঁর প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি সমাজে সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার জন্যও সমানভাবে পরিচিত। শিক্ষা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে এক বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছে।
 
নারী দিবসের এক অনুষ্ঠানে তুমকুরের সহকারী কমিশনার নাহিদা জাম জাম নারীদের উদ্দেশে এক ব্যতিক্রমী বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, নারীদের একে অপরের শক্তি হয়ে উঠতে হবে, পরস্পরের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সমাজে নারীদের সাধারণত হয় অসহায় ভুক্তভোগী, নয়তো খলনায়িকা হিসেবে দেখা হয় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একবার ভুক্তভোগী, সবসময় ভুক্তভোগী”, এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। তাঁর মতে, নারীদের এমনভাবে শক্তিশালী হতে হবে, যাতে প্রয়োজনে তারা প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, ইতিবাচক অর্থে ‘খলনায়িকা’ হয়ে উঠতে পারে।
 
নাহিদা জাম জাম
 
এই কথার মাধ্যমে তিনি নারীদের উদ্দেশে বার্তা দেন যে, শুধু ভালো মেয়ে হয়ে চুপচাপ সব সহ্য করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হতে হবে। জীবনের সব বোঝা নীরবে বহন করে চলা নয়, বরং নিজের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়াই জরুরি।
 
২০১৬ ব্যাচের কর্ণাটক প্রশাসনিক পরিষেবা (কেএএস)-এর এই আধিকারিকের কাছে জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো তাঁর বক্তৃতা। আর একের পর এক বক্তৃতায় তিনি ফিরে আসেন নারীদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার কথায়। তিনি উল্লেখ করেন, আজ মানুষ যখন চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে পৌঁছানোর কথা বলছে, তখনও একজন কর্মজীবী নারীকে ভোরে উঠে পুরো পরিবারের রান্নাবান্না সেরে তবেই কর্মস্থলে যেতে হয়। এই পরিস্থিতিকে প্রায়শই নারীর “সুপারপাওয়ার” হিসেবে প্রশংসা করা হয়। কিন্তু নাহিদা জাম জাম একমত নন। তাঁর মতে, এটি ক্ষমতায়ন নয়, বরং শোষণ, একটি পুরোনো মানসিকতার ধারাবাহিকতা, যা আর টেকসই নয়।
 
“সুপারউইম্যান”-এর বন্দনা করার পরিবর্তে তিনি সমাজকে আহ্বান জানান, নারীদের স্বাধীনভাবে বাঁচতে দেওয়া হোক, যাতে তারা অদৃশ্য প্রত্যাশার বোঝা না বয়ে নিজেদের লক্ষ্য পূরণের পথে এগিয়ে যেতে পারে।নারীদের প্রতি তাঁর বার্তা স্পষ্ট, নিজেদের প্রাপ্য স্থান ফিরে পাও। তাঁর মতে, নিরাপত্তার অজুহাতে নারীদের বারবার পিছিয়ে রাখা হয়। সব সময় কোনো না কোনো বিপদের কথা বলে তাদের থামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ঝুঁকি তো সর্বত্রই রয়েছে। রাস্তায় বেরোনো কিংবা বাসে ওঠার মধ্যেও ঝুঁকি আছে। তাই ভয়ের ভিত্তিতে নারীদের জীবন সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়।
 
তাঁর ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণার সূত্রও খুবই সহজ, “জিতলে নেতৃত্ব দেবে, হারলে শিক্ষা পাবে।” আরও একটি কথা তিনি বলেন, যা হয়তো লিঙ্গসমতার প্রচলিত ধারণাকে কিছুটা নাড়া দিতে পারে। পুরুষদের সাধারণত নেতা হিসেবে দেখা হলেও, তাঁর মতে অনেক সময় নারীরাই হন সেই কৌশলবিদ, যারা পরিকল্পনা করেন, দিকনির্দেশ দেন এবং পুরো ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখেন। এখন সময় এসেছে সেই অদৃশ্য ভূমিকাকে দৃশ্যমান করার।
 
নাহিদা জাম জাম
 
নাহিদা জাম জাম ইতিমধ্যেই একজন জনবান্ধব প্রশাসক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তাঁর কাজ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। সন্তানসম্ভবা অবস্থাতেও তিনি নিজের তালুকে নিয়মিত তদারকি এবং মাঠপর্যায়ের কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তাঁকে তুমাকুরু জেলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়।
 
কোভিডের সময় গর্ভবতী অবস্থায় গ্রাম ও বাড়ি বাড়ি ঘুরে মানুষের খোঁজ নেওয়া সেই কেএএস আধিকারিক ধীরে ধীরে গ্রাম ও শহর উভয় ক্ষেত্রেই এক বিশ্বাসযোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা শুধু নীতিনির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনি প্রায়ই দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সমাধানের অপেক্ষায় থাকা প্রবীণ মানুষদের খোঁজখবর নেন। তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেন। ছোট একটি বিষয় হলেও, এটি তাঁর কাজের ধরনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
 
তুমকুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে তিনি তাঁর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন শিক্ষার্থীদের দিকে। এখানে তাঁর বার্তা শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে। তাঁর মতে, একজন ভালো নেতা হতে হলে প্রথমে একজন ভালো পাঠক হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অবিরাম বিভ্রান্তির এই যুগে তিনি শিক্ষার্থীদের রিলস থেকে দূরে সরে বইয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বিশ্বাস, উপার্জনের ক্ষমতা শেখার ক্ষমতার সঙ্গেই গভীরভাবে যুক্ত।
 
তিনি নারীদের অদৃশ্য শ্রম নিয়েও কথা বলেন। তাঁর মতে, মা ও স্ত্রীর কাজকে “কেয়ার ইকোনমি”-র অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত এবং জিডিপি নিয়ে আলোচনার সময়ও তার মূল্যায়ন হওয়া দরকার। যে শ্রমকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়, সেটিকেও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
 
নাহিদা জাম জাম
 
তাঁর প্রায় সব বক্তৃতার মধ্যেই শুধু সাধারণ নারীদের নয়, বিশেষভাবে মুসলিম নারীদের নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন জনসভায় তিনি ধর্মীয় ব্যাখ্যার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব দাবি করা ব্যক্তিদের সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, যাকে ব্যক্তিগত আইন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তা সবসময় ঈশ্বরপ্রদত্ত নির্দেশের সরাসরি প্রতিফলন নয়; বরং কিছু মানুষের সীমিত ব্যাখ্যার ফল।
 
এই প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান বেশ দৃঢ়। তিনি হিজাব নিয়েও কথা বলতে দ্বিধা করেন না। তাঁর মতে, কোনো নারী যদি নিজের ইচ্ছায় হিজাব পরেন, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু সেটি যদি তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
 
তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এই ধরনের ব্যাখ্যাগুলিকে চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নেওয়া হবে এবং কেন সেগুলিকে পুনর্বিবেচনা করা যাবে না, বিশেষত যখন সেগুলি নারীদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। নারীদের নিয়ে বক্তৃতার শেষে তিনি কখনও কখনও উচ্চারণ করেন, “যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা” কিংবা “বুদ্ধিরূপেণ সংস্থিতা”, “শান্তিরূপেণ সংস্থিতা”... “নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।” মনে হয় ভাষা বা ধর্মের কোনো সীমারেখাই তাঁকে আটকে রাখতে পারে না।
 
তিনি সেই স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশেরই প্রতীক, যার পক্ষে তিনি সওয়াল করেন। তিনি চান না তাঁর ভাবনা কোনো প্রথা বা ধর্মের সংকীর্ণ সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকুক। তিনি কন্নড় ভাষায় কথা বলুন কিংবা মুসলিমদের মধ্যে থাকলে মাঝেমধ্যে উর্দুতে চলে যান, শিক্ষার্থী, অভিভাবক বা সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য রাখুন, তাঁর মূল বার্তা একই থাকে: শিক্ষা, সচেতনতা এবং স্বাধীনতা। অজ্ঞতা থেকে স্বাধীনতা। নির্ভরশীলতা থেকে স্বাধীনতা। চিন্তা ও কথা বলার স্বাধীনতা।
 

কখনও কখনও তাঁর কণ্ঠে অধৈর্যের সুরও শোনা যায়, বিশেষত যখন তিনি সেইসব অভিভাবকদের উদ্দেশে কথা বলেন, যারা মেয়েদের শিক্ষার চেয়ে পণের জন্য সঞ্চয় করাকে বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বিয়ের জন্য অর্থ জমিয়ে রাখার পরিবর্তে মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করুন। তাঁদের প্রশাসন, পুলিশ বা নিজেদের পছন্দের যেকোনো পেশায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিন।
 
তিনি যে বহু সমস্যার সমাধান দেখেন, তা খুবই সরাসরি এবং আত্মসমালোচনামূলক, অন্যকে দোষারোপ করে শুরু করবেন না। পরিবর্তন শুরু করুন নিজের ভেতর থেকে। প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, জনসম্পৃক্ততা এবং আত্মসমালোচনার ওপর জোর, এই তিনের সমন্বয়ই নাহিদা জাম জামের কণ্ঠস্বরকে স্বতন্ত্র করে তোলে। তাঁর বক্তৃতাগুলি নিছক পরিশীলিত উপস্থাপনা নয়; বরং সাহসী ও অনুপ্রেরণামূলক হস্তক্ষেপ, যা মানুষকে ভাবতে এবং সম্ভব হলে কাজ করতেও উদ্বুদ্ধ করে।