মানবিকতা, আদর্শ ও উত্তরাধিকারের আবেগকে কেন্দ্র করে মানবসেবার ব্রত নিয়ে বাবার দেখানো পথেই হাঁটছেন ডঃ শ্রুতি গুপ্ত

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
ডঃ শ্রুতি গুপ্ত
ডঃ শ্রুতি গুপ্ত
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত আন্দারথোল গ্রামে সন্ধ্যা নামলে আজও চারপাশে নেমে আসে অন্ধকার। আধুনিকতার আলো সেখানে এখনও পুরোপুরি পৌঁছয়নি। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেই প্রতি সপ্তাহে জ্বলে ওঠে এক অন্য আলো, মানবসেবার আলো। যে আলো একদিন জ্বালিয়েছিলেন প্রয়াত চিকিৎসক ডঃ দীপক গুপ্ত, আজ সেই আলোই বহন করে চলেছেন তাঁর মেয়ে ডঃ শ্রুতি গুপ্ত।
 
মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে যিনি চিকিৎসার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করতেন, সেই ডঃ দীপক গুপ্ত বছরের পর বছর ধরে আন্দারথোল গ্রামের অসহায় মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে গিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। কিন্তু পেশাগত পরিচয়ের চেয়েও বড় ছিল তাঁর মানবিক পরিচয়।
 
বাঁকুড়ার কেন্দুয়াডিহিতে ছিল তাঁর চেম্বার। পাশাপাশি সপ্তাহে তিনদিন কমলপুর ও গোবিন্দধাম এলাকায় রোগী দেখতেন। ব্যস্ততার মধ্যেও সপ্তাহে একটি দিন তিনি নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন আন্দারথোল গ্রামের মানুষের জন্য। সেখানে পৌঁছে বিদ্যুৎবিহীন পরিবেশে কখনও টর্চের আলোয়, কখনও মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে চিকিৎসা করেছেন অসংখ্য দরিদ্র মানুষকে।
 

শুধু চিকিৎসা নয়, প্রয়োজনে রোগীদের হাতে তুলে দিয়েছেন বিনামূল্যে ওষুধ। অনেকের রক্তপরীক্ষার খরচ বহন করেছেন নিজের উদ্যোগে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সামাজিক উদ্যোগ ‘আলোর দিশা কর্মযোগ’-এর মাধ্যমে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার কর্মযোগ দর্শনকে বাস্তব জীবনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। মানুষের সেবা যে ঈশ্বরসেবারই সমান, সেই বিশ্বাস নিয়েই চলত তাঁর কাজ।
 
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে থেমে যায় তাঁর জীবন। ছাতনা থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এই জনপ্রিয় চিকিৎসক। খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে আন্দারথোল-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায়। যাঁরা তাঁকে শুধু ডাক্তার হিসেবে নয়, পরিবারের সদস্যের মতো দেখতেন, তাঁদের অনেকেই ভেবেছিলেন এবার হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে সেই বিনামূল্যের চিকিৎসা পরিষেবা। কিন্তু সেই আশঙ্কাকে সত্যি হতে দেননি তাঁর মেয়ে ডঃ শ্রুতি গুপ্ত।
 
বাবার মৃত্যুর পর অনেকেই যখন শোকাহত, তখন শ্রুতি সিদ্ধান্ত নেন বাবার অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। যে চেয়ারে বসে তাঁর বাবা রোগী দেখতেন, আজ সেই একই চেয়ারে বসেন তিনি। যে গ্রামে বাবার পদচিহ্ন রয়েছে, সেই গ্রামেই পৌঁছে যান নিয়মিত। যে টর্চের আলোয় একদিন চিকিৎসা চলত, সেই আলোয়ই আবার শুরু হয়েছে বিনামূল্যের চিকিৎসা পরিষেবা।
 
বর্তমানে নতুনগ্রাম ও নিজ বাড়িতে চেম্বার করেন ডঃ শ্রুতি গুপ্ত। মেদিনীপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করা এই তরুণ চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা প্রায় আট বছর। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠের পাশাপাশি মানবসেবার সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি তিনি পেয়েছেন তাঁর বাবার কাছ থেকেই।
 
শ্রুতি জানান, “আট বছর বাবার সঙ্গে কাজ করেছি। চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষের জন্য কীভাবে কাজ করতে হয়, সেটা বাবার কাছ থেকেই শিখেছি। তাই তাঁর দেখানো পথেই হাঁটার চেষ্টা করছি।”
 
ডঃ শ্রুতি গুপ্ত
 
এই পথ অবশ্য সহজ নয়। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছনো, সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যে চিকিৎসা পরিষেবা চালিয়ে যাওয়া কিংবা আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের পাশে দাঁড়ানো, সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেসবের কথা না ভেবে বাবার আদর্শকেই নিজের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছেন তিনি।
 
আন্দারথোল গ্রামের বাসিন্দাদের কাছেও বিষয়টি শুধুমাত্র একজন চিকিৎসকের পরিবর্তে আরেকজন চিকিৎসকের আসা নয়। তাঁদের কাছে এটি এক আদর্শের উত্তরাধিকার। এক মানবিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা। তাই গ্রামের অনেকেই আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “ডাক্তারবাবু নেই, কিন্তু তাঁর আলো এখনও জ্বলছে মেয়ের হাত ধরে।”
 
আজকের সময়ে যখন চিকিৎসাকে অনেক ক্ষেত্রেই পেশাগত সাফল্য ও আর্থিক প্রাপ্তির নিরিখে বিচার করা হয়, তখন ডঃ শ্রুতি গুপ্তের এই উদ্যোগ এক অন্য বার্তা দেয়। এটি কেবল একজন মেয়ের বাবার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প নয়; এটি মানবিকতার উত্তরাধিকার বহন করার গল্প। এটি এমন এক তরুণ চিকিৎসকের গল্প, যিনি চাকচিক্য বা প্রচারের আলো নয়, বেছে নিয়েছেন প্রত্যন্ত গ্রামের অন্ধকারে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর পথ।
 
ডঃ দীপক গুপ্ত হয়তো আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, তাঁর আদর্শ এবং মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছা আজও বেঁচে আছে। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে চলেছেন তাঁরই মেয়ে ডঃ শ্রুতি গুপ্ত। অন্ধকার গ্রামে টর্চের আলোয় বসা সেই ছোট্ট চিকিৎসা শিবির তাই আজ শুধু স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র নয়, মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।