ইসলাম থেকে ভগবদ্গীতা, সম্প্রীতির সেতুবন্ধনে খলিফা আবদুল হাকিম! কেন বিস্মৃতির আড়ালে পাকিস্তানের এই প্রখ্যাত দার্শনিক?
আমির সুহেল ওয়ানি
দার্শনিক, গবেষক, অনুবাদক এবং ইসলামী চিন্তাধারার ব্যাখ্যাকার খলিফা আবদুল হাকিম আজ এক বিস্মৃতপ্রায় ব্যক্তিত্ব। ইসলামকে দর্শন, আধুনিক জ্ঞান, মানবতাবাদ এবং অন্যান্য চিন্তাধারার সঙ্গে অর্থবহ সংলাপে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ধর্মবিশ্বাস মানুষের প্রতি আমাদের উপলব্ধিকে আরও গভীর করে তুলবে। অথচ যে পাকিস্তানে তিনি বসবাস করতেন, সেখানে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা ও জনপরিসরের আলোচনায় তাঁর উত্তরাধিকার আজও প্রাপ্য মর্যাদা পায়নি।
১৮৯৩ সালে লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল হাকিম। দর্শনশাস্ত্রে পড়াশোনা করার পর জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। হায়দরাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, শ্রীনগরের অমর সিং কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে কাশ্মীরের শিক্ষা বিভাগের অধিকর্তা হন।
পরবর্তীকালে লাহোরে ফিরে ১৯৫০ সালে ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক কালচারের প্রতিষ্ঠাতা অধিকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। হাকিম কেবল ধর্মের ভাষ্যকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন কৃতী শিক্ষাবিদ, যিনি গবেষণা, তুলনামূলক অধ্যয়ন এবং দার্শনিক পর্যালোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন বৌদ্ধিক ঐতিহ্যকে অনুধাবন করতেন।
পরিবারসহ খলিফা আবদুল হাকিম
হাকিমের বিশেষ গুরুত্বের কারণ ছিল, ইসলামকে তিনি একটি জীবন্ত বৌদ্ধিক ও নৈতিক ঐতিহ্য হিসেবে দেখতেন। ধর্মকে তাঁর কাছে বারবার উচ্চারণ করার মতো কিছু স্লোগানের সমষ্টি কিংবা নিরন্তর সংঘাতের মাধ্যমে রক্ষা করার মতো কোনও সীমানা বলে মনে হয়নি।
তাঁর মতে, পরিবর্তনশীল সমাজ, অর্থনৈতিক অবিচার, মানুষের স্বাধীনতা এবং আধুনিক জীবনের চ্যালেঞ্জ থেকে উঠে আসা প্রশ্নগুলির মুখোমুখি হতে হবে ইসলামী চিন্তাধারাকে। তাঁর "Islamic Ideology: The Fundamental Beliefs and Principles of Islam and Their Application to Practical Life" গ্রন্থে ধর্মীয় নীতির সঙ্গে সমাজের বাস্তব চাহিদার সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
তাঁর "Islam and Communism" গ্রন্থে সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে। অন্যদিকে, রুমি ও ইকবালকে নিয়ে তাঁর লেখাগুলিতে মুসলিম বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের দার্শনিক গভীরতা ফুটে উঠেছে। মুসলমানরা কেবল কী বিশ্বাস করেন, তা নিয়েই তাঁর আগ্রহ সীমাবদ্ধ ছিল না; সেই বিশ্বাস মানবজীবনে কী অবদান রাখতে পারে, সেটিও ছিল তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সমকালীন ধর্মীয় পরিবেশের দিকে তাকালে হাকিমের কাজের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চকণ্ঠ হওয়াকে জ্ঞানের সমার্থক মনে করা হয়। ধর্মীয় আলোচনা কখনও কখনও তাৎক্ষণিক বিচার-বিশ্লেষণ এবং অন্যকে পথভ্রষ্ট ঘোষণা করার প্রবণতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সহমত না হওয়া মুসলমানদের ‘তাকফির’ বা অবিশ্বাসী ঘোষণা করার প্রবণতা ধর্মীয় মতপার্থক্যকে এমন এক লড়াইয়ে পরিণত করতে পারে, যেখানে কে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অধিকার রাখেন, তা নির্ধারণের কর্তৃত্ব নিয়ে সংঘাত তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে হাকিমের "Iqbal aur Mulla" গ্রন্থটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় আক্ষরিকতাবাদের প্রতি ইকবালের সমালোচনার সঙ্গে হাকিমের সংলাপের মধ্যে একটি বৃহত্তর উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়েছিল। তাঁর আশঙ্কা ছিল, ধর্মকে অনমনীয় সূত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেললে তার সৃজনশীলতা ও নৈতিক চেতনা হারিয়ে যেতে পারে। ইকবাল নিজেও জীবন্ত ধর্মীয় চিন্তাধারা এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ব্যাখ্যার স্থবিরতার মধ্যেকার টানাপোড়েন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন। হাকিম উপলব্ধি করেছিলেন, অতীতের সাফল্যের কথা বারবার স্মরণ করলেই কোনও সভ্যতার অগ্রগতি সম্ভব নয়।
হাকিমের বৌদ্ধিক সাহসিকতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সম্ভবত তাঁর উর্দু ভাষায় ভগবদ্গীতা অনুবাদ। ইসলামী চিন্তাধারায় গভীরভাবে আগ্রহী একজন মুসলিম দার্শনিক হিন্দু ধর্মের অন্যতম মৌলিক ধর্মগ্রন্থের জগতে প্রবেশ করেছিলেন এবং উর্দুভাষী পাঠকদের কাছে সেই গ্রন্থকে সহজলভ্য করে তুলেছিলেন। এমন উদ্যোগের জন্য কেবল ভাষাগত দক্ষতাই যথেষ্ট নয়।
ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক কালচার, লাহোর
তাঁর এই অনুবাদ সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়, যেখানে মনে করা হয় ধর্মীয় নিষ্ঠা বজায় রাখতে হলে অন্য সংস্কৃতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা অপরিহার্য। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বৌদ্ধিক আদান-প্রদান এবং ধর্মতাত্ত্বিক মতৈক্য এক বিষয় নয়। কোনও মুসলিম পণ্ডিত হিন্দু হয়ে না উঠেও ভগবদ্গীতা অধ্যয়ন করতে পারেন, ঠিক যেমন কোনও হিন্দু পণ্ডিত হিন্দুধর্ম ত্যাগ না করেও কোরান অধ্যয়ন করতে পারেন। তুলনামূলক অধ্যয়নের উদ্দেশ্য সব পার্থক্য মুছে ফেলা নয়; বরং আরও সততা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই পার্থক্যগুলিকে বোঝা। হাকিমের কাজ এই সম্ভাবনাকেই তুলে ধরেছিল, এমন এক সর্বজনীনতাবাদ, যার শিকড় ধর্মীয় বিশ্বাসের গভীরে প্রোথিত, যেখানে মানুষ নিজেদের বিশ্বাস বিসর্জন না দিয়েও পরস্পরের কাছ থেকে শিখতে পারে।
এই জায়গাতেই তাঁর উত্তরাধিকার ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ ব্যাখ্যাগুলির সামনে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরে। যখন ধর্মীয় পরিচয়কে অন্য ধর্ম বা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নিরন্তর বিরোধিতার উপর দাঁড় করানো হয়, তখন সেতুবন্ধন গড়ে তোলা কোনও পণ্ডিতকে সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে। দেশপ্রেমকে যখন সাংস্কৃতিক একরূপতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, তখন বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে অনুবাদ ও ভাবের আদান-প্রদানকে গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার ধর্মীয় পরিচয়কে যখন স্থায়ী আত্মরক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরা হয়, তখন সর্বজনীন মানবিক উদ্বেগগুলি আড়ালে চলে যায়। হাকিমের বৌদ্ধিক জীবন এই প্রবণতাগুলির বিকল্প পথ দেখিয়েছিল। তাঁর কাজের অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল, নিজের ধর্মের প্রতি আস্থা অন্যের ধর্মগ্রন্থ, দর্শন কিংবা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সম্পর্কে ভয় তৈরি করার কারণ হতে পারে না।
পাকিস্তানের বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন চিন্তাবিদদের প্রান্তিক হয়ে পড়ার কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এই অবহেলার সম্পূর্ণ দায় ধর্মীয় আলেমদের উপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মতাদর্শগত চাপ এবং মানবিক বিদ্যা ও কলাচর্চার প্রতি জনসাধারণের সীমিত আগ্রহ, সবই স্বাধীন বৌদ্ধিক চর্চার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রভাবিত করেছে। বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকীর্ণ ব্যাখ্যাকে উৎসাহিত করেছে। একটি বৈচিত্র্যময় বৌদ্ধিক ঐতিহ্যকে ঘিরে কঠিন ও গভীর আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে মুসলিম পরিচয়ের নির্বাচিত কিছু প্রতীককে উদ্যাপন করা রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে অনেক সময় সহজতর হয়েছে।
সমকালীন ধর্মীয় আলোচনায় ব্যক্তিগত আচরণ, প্রতীকী পরিচয় এবং ধর্মীয় সীমানা পাহারা দেওয়ার প্রশ্নে বিপুল শক্তি ব্যয় করা হয়। এসব বিষয়ের নিজস্ব গুরুত্ব থাকতে পারে, কিন্তু এগুলি দারিদ্র্য, বৈষম্য, শিক্ষা, অর্থনৈতিক শোষণ এবং ক্ষমতার নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে গভীর আলোচনার বিকল্প হতে পারে না। হাকিমের কাজ মুসলমানদের নিজেদের ধর্মীয় নীতিগুলি কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলিকে পরিচালিত করতে পারে এবং মানুষের বস্তুগত জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটাতে পারে, তা খতিয়ে দেখতে আহ্বান জানিয়েছিল। তাঁর ধর্মীয় জীবনদর্শন অনুযায়ী, প্রকাশ্যে ধর্মবিশ্বাসের ঘোষণা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; সাধারণ মানুষ কোন পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করছেন, তার প্রতিও গভীর দায়বদ্ধতা থাকা প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ায় আজ ঠিক এই ধরনের বৌদ্ধিক অবদানকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এই অঞ্চল অর্থনৈতিক দুরবস্থা, সামাজিক মেরুকরণ, সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস এবং মতপার্থক্যকে শত্রুতার চোখে দেখার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার মুখোমুখি। এর সমাধান ধর্মকে পরিত্যাগ করার মধ্যে নেই, আবার ধর্মকে বর্জনের হাতিয়ারে পরিণত করার মধ্যেও নেই। প্রয়োজন ধর্মীয় ঐতিহ্যের আরও গভীর ও সমৃদ্ধ উপলব্ধি—যেখানে আধ্যাত্মিক গভীরতা, যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান, নৈতিক দায়িত্ব এবং মানবিক পরিস্থিতির প্রতি সহমর্মিতা একসঙ্গে স্থান পাবে। হাকিমের রচনাগুলি এমন উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার উপাদান জোগায়।
তাঁর জীবন আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়, মুসলিম চিন্তাধারার ইতিহাস সমকালীন বিতর্কে যতটা কখনও কখনও তুলে ধরা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। মুসলিম বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের মধ্যে দার্শনিক, বিজ্ঞানী, কবি, আইনজ্ঞ, সুফি সাধক এবং বিভিন্ন সভ্যতার চিন্তাধারার সঙ্গে সংলাপে যুক্ত অনুবাদকদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। রুমি মানুষের অর্থ ও জীবনের উদ্দেশ্য খোঁজার আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা দিয়েছেন; ইকবাল আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন; আর হাকিম তাঁর সময়ের বাস্তব প্রশ্নগুলির সঙ্গে দার্শনিক অনুসন্ধানের সংযোগ ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। কে কাকে মুসলমান বলার অধিকার রাখেন, তা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এই সমৃদ্ধ উত্তরাধিকারকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা মানে সেই ঐতিহ্যকেই দরিদ্র করে তোলা, যাকে রক্ষা করার দাবি করা হয়।
অতএব, ট্র্যাজেডি কেবল এই নয় যে পাকিস্তান একজন গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিককে ভুলে গিয়েছে। বরং হাকিমের মতো চিন্তাবিদদের অবহেলা বৃহত্তর এক সমস্যার প্রতিফলন, ধর্মীয় জনজীবনের মধ্যে স্বাধীন বৌদ্ধিক চর্চার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি করতে না পারা। এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক পণ্ডিতকে তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে হবে। সমালোচনা, বিতর্ক ও মতপার্থক্যের মধ্য দিয়েই গুরুতর বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের বিকাশ ঘটে। প্রকৃত সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন গঠনমূলক মতবিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশের জায়গা দখল করে নেয় নিন্দা ও আক্রমণ; গবেষণার বদলে প্রাধান্য পায় বাগাড়ম্বর; আর ধৈর্য ধরে বোঝার প্রচেষ্টার চেয়ে ধর্মীয় নিশ্চয়তার প্রকাশ্য প্রদর্শন বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।