বাংলা ভাগের বেদনা, স্বাধীনতার স্বপ্ন আর এক শতায়ু সাক্ষীর স্মৃতিতে শ্যামাপ্রসাদ

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 12 h ago
বীরভূমের বোলপুরের শতায়ু প্রবীণ কৃষ্ণদাস দাস
বীরভূমের বোলপুরের শতায়ু প্রবীণ কৃষ্ণদাস দাস
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

দেশভাগের আট দশক পরেও সেই ক্ষত আজও অনেকের মনে অমলিন। স্বাধীনতার আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকা বিভাজনের যন্ত্রণা যেন এখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেইসব মানুষের স্মৃতিচারণে, যারা ইতিহাসকে শুধু পড়েননি, নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। বীরভূমের বোলপুরের শতায়ু প্রবীণ কৃষ্ণদাস দাস তেমনই এক জীবন্ত ইতিহাস, যাঁর স্মৃতিতে আজও জেগে আছেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
 
১৯২১ সালে জন্ম নেওয়া কৃষ্ণদাস দাস স্বাধীন ভারতের প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকদের অন্যতম। ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে তাঁর পুলিশ প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যখন ভারত স্বাধীনতা অর্জন করছে, তখন তিনি রাজশাহির একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে ছিলেন। স্বাধীনতার সংবাদ পৌঁছতেই চারদিকে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। তরুণ কৃষ্ণদাসও সেই উচ্ছ্বাসের অংশীদার হন, যদিও তখনও স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ তাঁর কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না।
 
স্বাধীনতার কিছুদিন পর তিনি ব্যারাকপুর পুলিশ ব্যারাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট দারোগা হিসেবে কাজে যোগ দেন। পরে তাঁকে দিল্লিতে পাঠানো হয় সংসদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য। সেখানেই তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম সারির নেতাদের, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে।
 
কৃষ্ণদাস দাসের স্মৃতিতে বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে আছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর এক সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতা। সংসদ ভবনের প্রবেশদ্বারে কর্তব্যরত অবস্থায় তরুণ পুলিশকর্মীকে ডেকে তাঁর পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। বাড়ি শান্তিনিকেতন শুনে তিনি খুশি হয়েছিলেন। এরপর স্বাধীনতা সম্পর্কে তাঁর অনুভূতি জানতে চান। উত্তরে কৃষ্ণদাস বলেছিলেন, স্বাধীনতা পেয়ে তিনি আনন্দিত। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের কথায় ফুটে উঠেছিল অন্য এক উদ্বেগ।
 
প্রবীণ এই পুলিশ আধিকারিকের দাবি, শ্যামাপ্রসাদ তাঁকে বলেছিলেন যে স্বাধীনতা এলেও দেশ প্রকৃত অর্থে এখনও সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। দেশভাগের সিদ্ধান্ত এবং বাংলার বিভাজন তাঁর মনে গভীর আঘাত দিয়েছিল। অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐক্য ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তাঁকে ব্যথিত করেছিল। একজন বাঙালি হিসেবে বাংলাকে বিভক্ত হতে দেখা তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, এমন কথাই নাকি তিনি সেই তরুণ পুলিশকর্মীকে বলেছিলেন।
 
কৃষ্ণদাস দাসের নিজের মনেও দেশভাগের স্মৃতি গভীর বেদনা হয়ে রয়ে গেছে। তাঁর কথায়, তখন পশ্চিমবঙ্গ বা পূর্ববঙ্গ বলে কিছু ছিল না, ছিল শুধু বাংলা। নদী, মাঠ, মানুষ আর সংস্কৃতির এক অখণ্ড ভূখণ্ড। সেই বাংলাকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত তিনি কোনওদিন মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। আজও সেই স্মৃতি তাঁর কণ্ঠে আক্ষেপ হয়ে ফিরে আসে।
 
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন ও ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা মত থাকলেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে স্বাধীনতার উত্তাল সময়ে তিনি ছিলেন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। স্বাধীন ভারতের প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তিনি শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে নীতিগত মতভেদের কারণে মন্ত্রিসভা ত্যাগ করেন এবং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করেন।
 
১৯৫৩ সালে কাশ্মীরে গ্রেফতার অবস্থায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কৃষ্ণদাস দাসও সেই সময়ের নানা আলোচনা ও বিতর্কের সাক্ষী ছিলেন। সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর শুনে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন। তাঁর মতে, সেই ঘটনার অভিঘাত এতটাই প্রবল ছিল যে পরবর্তীকালে চাকরিজীবনের প্রতি তাঁর অনীহা জন্মায়। অবশেষে ১৯৫৪ সালে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায় তাঁকে সিদ্ধান্ত বদলানোর পরামর্শ দিলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
 
আজ ১০৫ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণদাস দাস যেন এক জীবন্ত ইতিহাসের ভাণ্ডার। তাঁর স্মৃতিতে স্বাধীনতার আনন্দ আছে, দেশভাগের বেদনা আছে, আছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। সময়ের স্রোতে অনেক মানুষ হারিয়ে গেছেন, অনেক ঘটনা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেয়েছে। কিন্তু শতবর্ষ পেরিয়ে আসা এই মানুষটির স্মৃতিতে সেই দিনগুলোর আবেগ এখনও ততটাই জীবন্ত, যতটা ছিল স্বাধীনতার প্রথম প্রভাতে।