নরেশ চন্দ্র দেববর্মা রাষ্ট্রপতি দ্রপদী মুর্মুর থেকে পদ্মশ্রী সম্মান গ্রহণের মুহুর্তে
নূরুল হক / আগরতলা
ত্রিপুরার ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে যুক্ত হলো আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ককবরক ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক নরেশ চন্দ্র দেববর্মা। ২৩ জুন মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি ভবনে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেন।
২০২৪ সালে তিনি ত্রিপুরা সরকারের সর্বোচ্চ অসামরিক নাগরিক সম্মান ত্রিপুরা ভাষণে সম্মানিত হয়েছিলেন। এবার এই পদ্মশ্রী সম্মান শুধু একজন সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং সমগ্র ককবরক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। কারণ, যে ভাষা একসময় মূলত জনজাতিদের কথার মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেই ভাষাকে সমৃদ্ধ লিখিত ঐতিহ্যের পথে এগিয়ে নিতে আজীবন কাজ করেছেন নরেশ চন্দ্র দেববর্মা।
১৯৪৪ সালের ৩১ অক্টোবর মদন মোহন দেববর্মা এবং শুভ লক্ষ্মী দেববর্মার ঘরে জন্ম নিন ত্রিপুরার কৃতি সন্তান নরেশ চন্দ্র দেববর্মা। নরেশ চন্দ্র দেববর্মা বাংলা ভাষায় শিক্ষালাভ করলেও পরবর্তীকালে উপলব্ধি করেন যে নিজের মাতৃভাষা ককবরকের বিকাশে কাজ করা সময়ের দাবি। সেই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা। ১৯৮০ সালের পর থেকে তিনি নিয়মিত ককবরক ভাষায় লেখালেখি শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন ককবরক সাহিত্যের শক্ত ভিত।
গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে তিনি ৩৪টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। পাশাপাশি অসংখ্য প্রবন্ধ, গবেষণামূলক রচনা ও ভাষা বিষয়ক কাজের মাধ্যমে ককবরক ভাষাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর প্রচেষ্টার ফলেই আজ ককবরক শতাধিক বিদ্যালয় ও বিভিন্ন কলেজে পাঠ্য বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তৈরি হয়েছে নতুন প্রজন্মের লেখক, গবেষক ও শিক্ষকদের একটি শক্তিশালী পরিমণ্ডল।
পদ্মশ্রী প্রাপ্তির এই গর্বের মুহূর্তকে সামাজিক মাধ্যমে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁরা সকলেই নরেশ চন্দ্র দেববর্মার অবদানকে ত্রিপুরার গর্ব এবং আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ার পর নিজের প্রতিক্রিয়ায় নরেশ চন্দ্র দেববর্মা জানান, এই সম্মান শুধু তাঁর একার নয়, বরং ককবরক ভাষার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি মানুষের। ভাষার উন্নয়ন ও সংরক্ষণের কাজে ভবিষ্যতেও তিনি নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নরেশ চন্দ্র দেববর্মা
একসময় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকা একটি ভাষা আজ নতুন প্রাণশক্তি নিয়ে এগিয়ে চলেছে। আর সেই যাত্রাপথের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ নরেশ চন্দ্র দেববর্মার নাম ককবরকের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পদ্মশ্রীর এই সম্মান শুধু একজন মানুষের স্বীকৃতি নয়, এটি ত্রিপুরার ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়েরও এক অনন্য বিজয়গাথা।