বিদ্যার সাগরে মিলেছিল ভাবের সাগর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
বিদ্যার সাগরে মিলেছিল ভাবের সাগর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ
বিদ্যার সাগরে মিলেছিল ভাবের সাগর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী

বাংলার ইতিহাসে কিছু কিছু সাক্ষাৎ থাকে, যেগুলি কেবল দুজন মানুষের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা নয়, দুটি চিন্তার জগতের, দুটি জীবনদর্শনের, দুটি আলোর ধারার মিলন। ১৮৮২ সালের ৫ আগস্ট তেমনই এক স্মরণীয় দিন। কলকাতার বাদুড়বাগানে সেদিন মুখোমুখি হয়েছিলেন উনিশ শতকের বাংলার দুই অনন্য ব্যক্তিত্ব, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ।
 
একজনের হাতে ছিল বই, যুক্তি, শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের অস্ত্র। অন্যজনের হৃদয়ে ছিল ঈশ্বরসন্ধান, ভক্তি ও মানুষের অন্তর্জগতকে স্পর্শ করার সাধনা। একজন সারাজীবন লড়েছেন সমাজের অন্ধকারের বিরুদ্ধে, অন্যজন মানুষের হৃদয়ের অন্ধকারে আলো জ্বালানোর কথা বলেছেন। পথ আলাদা, ভাষা আলাদা, জীবনযাত্রা আলাদা, তবু কোথাও যেন তাঁদের হৃদয়ের ঠিকানা ছিল একই: মানুষ।
 
সেদিন বিকেল প্রায় চারটে। দক্ষিণেশ্বর থেকে ঘোড়ার গাড়িতে কলকাতার বাদুড়বাগানের উদ্দেশে রওনা হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। সঙ্গে ছিলেন মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, পরবর্তীকালে যিনি ‘শ্রীম’ নামে পরিচিত হন এবং তাঁর অমর গ্রন্থ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত-এ এই সাক্ষাতের বহু মূল্যবান বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। সঙ্গে ছিলেন ভবনাথ চট্টোপাধ্যায় ও প্রতাপচন্দ্র হাজরা।
 
বিদ্যাসাগরের নাম শ্রীরামকৃষ্ণ আগেই শুনেছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্য তাঁকে যেমন আকৃষ্ট করেছিল, তার চেয়েও বেশি টেনেছিল মানুষের জন্য তাঁর অসীম মমতা। দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষার প্রসার, বিধবা বিবাহের পক্ষে সংগ্রাম, নারীশিক্ষার বিস্তার, বিদ্যাসাগরের জীবন যেন ছিল মানুষের দুঃখ মোচনের এক নিরন্তর সাধনা।
 
 
মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের সূত্রেই একদিন শ্রীরামকৃষ্ণের মনে ইচ্ছা জাগে, এই মানুষটিকে একবার নিজের চোখে দেখবেন। সেই ইচ্ছার কথা বিদ্যাসাগরের কাছে পৌঁছলে তিনিও সাক্ষাতে সম্মতি দেন। তবে বিদ্যাসাগরের কৌতূহলও কম ছিল না। এই ‘পরমহংস’ কেমন মানুষ? তাঁর বেশভূষা কেমন? তিনি কি প্রচলিত সাধুদের মতো গেরুয়া পরেন? উত্তর ছিল, না। লালপাড় সাদা কাপড়, জামা এবং বার্নিশ করা চটি। বাহ্যিক আড়ম্বর নেই। যেন সাধুত্ব তাঁর পোশাকে নয়, তাঁর অন্তরে। 
 
অবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত এল। এক ঘরে মুখোমুখি বসলেন বিদ্যার সাগর ও ভাবের সাগর। শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরকে দেখেই তাঁর স্বভাবসুলভ রসিকতায় বললেন, তিনি এতদিন খাল-বিল, নদী দেখেছেন; আজ এসে সাগরে মিলেছেন। বিদ্যাসাগরও মৃদু হাসিতে উত্তর দিলেন, তবে সাগর থেকে নোনা জল নিয়ে যেতে পারেন।
 
শ্রীরামকৃষ্ণের উত্তর যেন মুহূর্তটিকে আরও মধুর করে দিল, নোনা জল নয়, তিনি তো ‘বিদ্যার সাগর’; বরং ‘ক্ষীরসমুদ্র’। কয়েকটি রসিক বাক্যের আড়ালে তখন যেন তৈরি হয়ে গিয়েছিল গভীর শ্রদ্ধার এক সেতু। সেখানে কে বড়, কে ছোট, তার কোনও প্রশ্ন ছিল না। ছিল একে অপরকে অনুভব করার চেষ্টা।
 
এরপর কথোপকথন ক্রমে পৌঁছে গেল গভীরতর প্রসঙ্গে। ঈশ্বর, জ্ঞান, ভক্তি, বিদ্যা-অবিদ্যা, মানুষের কামনা-বাসনা, জীবন ও জগতের নানা প্রশ্ন নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তাঁর ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু তার মধ্যে ছিল গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির ছাপ।
 
বিদ্যাসাগর শুনছিলেন মন দিয়ে। তিনি ছিলেন যুক্তি ও কর্মের মানুষ। আর তাঁর সামনে বসেছিলেন এমন এক সাধক, যিনি যুক্তির সীমা পেরিয়ে অনুভবের জগৎ থেকে কথা বলছিলেন। তবু তাঁদের কথোপকথনে কোনও সংঘাতের চিহ্ন নেই। বরং ছিল পারস্পরিক সম্মান।
 
বিদ্যাসাগরের ঘরের পরিবেশও যেন সেই দিনের সাক্ষাতের আরেকটি নীরব সাক্ষী। টেবিলের উপর পড়ে থাকা অসংখ্য চিঠির মধ্যে ছিল মানুষের সাহায্যের আবেদন। কত মানুষের কত দুঃখ, কত অভাব, কত অসহায়তার কথা এসে জমা হত তাঁর কাছে! বিদ্যাসাগরের জীবন ছিল সেইসব মানুষের জন্যই নিবেদিত।
 
তাঁর কাছে বিদ্যা ছিল কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার উপায় নয়; বিদ্যা মানুষের জীবন বদলানোর শক্তি। সমাজসংস্কার তাঁর কাছে কেবল বক্তৃতার বিষয় নয়; তা ছিল নিজের জীবন দিয়ে বহন করা দায়িত্ব। অন্যদিকে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে ধর্ম ছিল কেবল আচার নয়। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং ঈশ্বরের অনুভবের মধ্যেই তিনি ধর্মের প্রাণ খুঁজে পেতেন।
 
তাই তাঁদের কথোপকথনের গভীরে যেন অদৃশ্যভাবে একটি মিলন ঘটেছিল, মানুষকে ভালোবাসার মিলন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে সেই আলাপচারিতা। সময় তখন রাতের দিকে গড়িয়েছে। রাত ন’টার দিকে শ্রীরামকৃষ্ণ বিদায় নিলেন। বিদ্যাসাগর নিজে তাঁকে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই দৃশ্য যেন আজও কল্পনার চোখে দেখা যায়, একজন সমাজসংস্কারক তাঁর অতিথি সাধককে সস্নেহে বিদায় জানাচ্ছেন।
 
এই সাক্ষাৎ তাই নিছক একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। এটি উনিশ শতকের বাংলার এক অসাধারণ মানসিক পরিসরের প্রতিচ্ছবি। একদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব, যুক্তিবোধ, সামাজিক সংস্কার ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা; অন্যদিকে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার নতুন উপলব্ধি, এই দুই ধারার দুই প্রতিনিধি সেদিন মুখোমুখি হয়েছিলেন।
 
বিদ্যাসাগর মানুষের বাইরের জীবনকে বদলাতে চেয়েছিলেন, শিক্ষার আলোয়, যুক্তির শক্তিতে, সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে। শ্রীরামকৃষ্ণ মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন, ভক্তি, প্রেম ও ঈশ্বরচেতনার মাধ্যমে। কিন্তু দুই পথের শেষ প্রান্তে যেন একই মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন, অসহায়, দরিদ্র, দুঃখী, ভালোবাসার প্রত্যাশী সেই মানুষ।
 
আজ, ২৬ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিনের প্রাক্কালে, ১৮৮২ সালের সেই সাক্ষাৎ আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন রেখে যায়, বিদ্যা যদি মানুষের কাজে না আসে, তবে সেই বিদ্যার সার্থকতা কোথায়? আর ধর্ম যদি মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা জাগাতে না পারে, তবে সেই ধর্মের পূর্ণতাই বা কোথায়?
 
বিদ্যাসাগর ছিলেন মানুষের দুঃখের পাশে দাঁড়ানো এক জ্বলন্ত প্রদীপ। শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন মানুষের অন্তরে আলো খোঁজা এক সাধক। একজন সমাজের অন্ধকার সরাতে চেয়েছিলেন, অন্যজন আত্মার অন্ধকারে আলো জ্বালাতে চেয়েছিলেন।
 
১৮৮২ সালের সেই আগস্ট বিকেলে বাদুড়বাগানের একটি ঘরে তাই শুধু দুজন মানুষ বসে কথা বলেননি। মুখোমুখি হয়েছিল বাংলার দুই মহান স্রোত, বিদ্যার স্রোত ও ভাবের স্রোত।
 
আর আশ্চর্যের বিষয়, শেষ পর্যন্ত তারা একে অপরের বিপরীত হয়ে থাকেনি। মানুষের প্রতি ভালোবাসার বিশাল সমুদ্রে এসে দুটির জলই যেন এক হয়ে গিয়েছিল। সেই কারণেই আজও সেই সাক্ষাৎ ইতিহাসের পাতায় শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির মননে মানবতা, বিদ্যা ও আধ্যাত্মিকতার এক বিরল মিলনের প্রতীক।


শেহতীয়া খবৰ